ঘরের বারান্দায় বসে শীতলপাটি তৈরি করছিলেন বীরেশ দাস। তার নিপুণ হাতে পাটিতে উঠছিল বাহারি রঙের নকশা। পাটিতে বাহারি নকশা তুললেও বীরেশ দাসের মনে নেই সেই রঙের ছিটেফোঁটাও। রাত-দিন পরিশ্রম করে আর্থিক সচ্ছলতা না আসায় মনে আনন্দ নেই। অর্থনৈতিক সংকট আর টানাপড়েনের মধ্যে চলছে তার সংসার। তার বাড়ি উপজেলার তালিমপুর ইউনিয়নের হাকালুকি হাওর সংলগ্ন পশ্চিম গগড়ায়।
বেতের শীতলপাটি তৈরি কেবল বীরেশ দাসের পারিবারিক পেশাই নয়, বাংলার ঐতিহ্যবাহী ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের অংশও এটি। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের এই শীতলপাটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা করে জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো। তবে এ ঘোষণা সত্ত্বেও ভাগ্য ফিরেনি শীতলপাটির শিল্পীদের। কাঁচামাল সংকট ও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন তারা। যুগ যুগ ধরে পাটি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে অনেকে এই পেশা ছেড়েছেন। তবে ঐতিহ্য হিসেবে বীরেশের মতো হাতেগোনা কিছু পরিবারে এখনো ঠিকে আছে পাটি শিল্পে। টানাপড়েন যাদের যাপিত জীবনের সঙ্গী।
সরেজমিনে কথা হয় বীরেশ দাসের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘প্রায় ২৫ বছর ধরে পাটি বানাইলাম। কিন্তু এখন আর আগের মতো লাভ নাই, বেতও পাওয়া যায় না। বেতের দাম দিয়া পাটি বানাইয়া সংসার চালানি যায় না। অন্য কোনো কাজ জানি না, তাই এই কাজ করি। যারা কাজ পারেন, লেখাপড়া শিখেছেন তারা চাকরি করছেন। বিদেশে গেছেন। তাদের সচ্ছলতা এসেছে।’
গগড়া গ্রামের পাটিশিল্পী মানিক দাস বলেন, আগে ১৬ আনা মানুষই পাটি তৈরি করত, এখন আছে দুই আনা। অন্য কাম পাইলে আমিও পাটি তৈরি করা ছেড়ে দিতাম। সরকারি সহযোগিতা পেলে কিছু স্বচ্ছলভাবে আমরা কাজ করতে পারতাম।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার দাসেরবাজার পূর্ব ও দক্ষিণ লঘাটি, পানিশাওয়া, গুলুয়া, গোবিন্দপুর, ওহির কুঞ্জি, বাগিরপার, টুকা, মহানারী, কান্দিগ্রাম, মালিশ্রী, বর্ণি ইউনিয়নের মিহারী, কান্দিগ্রাম, উজিরপুর, তালিমপুর ইউনিয়নের গগড়া, বড়ময়দান, দ্বিতীয়ারদেহীসহ অধিকাংশ গ্রামের হিন্দু পরিবার এই শিল্পের সঙ্গে একসময় জড়িত ছিলেন। একসময় দাসেরবাজারের তৈরি রূপালী বেতের শীতল পাটি নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ সম্রাট আওরঙ্গজেবকে উপহার দিয়েছিলেন। এসব পাটি ধনী-গরিব সবাই স্বাচ্ছন্দে্য ব্যবহার করতেন, যা স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব। আধুনিক প্লাস্টিকের তৈরি মাদুর স্বাস্থ্যসম্মত না হলেও পাটির বিকল্প হিসেবে বাজার এটি সয়লাব হয়েছে। এতে পাটিরও কদর কমেছে।
বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার মুদাচ্ছির বিন আলী বলেন, ‘পাটি শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে এর সঙ্গে জড়িতদের প্রশিক্ষণের দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যাতে তাদের আধুনিক বিপণন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা ও বাজার ধরে রাখা যায়। সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এক্সপোর্ট মার্কেটে যাতে যেতে পারে সে লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে শিল্পটাকে ধরে রাখে। তাই তরুণদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।’