অন্যপ্রকাশের সামনে সেদিন পাঠক সমাগম এত বেশি যে, একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল যে কোনো মুহূর্তে স্টলটি ভেঙে পড়তে পারে। কারণ দুপুর থেকেই জানাজানি হয়ে গেছে হুমায়ূন আহমেদ আজ মেলায় আসছেন।
একসময় একঝাঁক ভক্ত-পাঠকবেষ্টিত অবস্হায় স্টলের সামনে এসে দাঁড়ালেন হুমায়ূন আহমেদ। স্টলের সাজসজ্জা দেখে ভেতরে প্রবেশ করে তাঁর জন্য নির্ধারিত চেয়ারটিতে বসলেন। মুহূর্তের মধ্যে শত শত পাঠক বই হাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ল অটোগ্রাফের জন্য।স্টল ভেঙে পড়ার উপক্রম। সবাইকে লাইন করে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
এর মধ্যে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকেরাও ভিড় করেছেন। সবাই স্টলের ভেতর প্রবেশ করতে চাইছেন। হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে একটু কথা বলতে চান তারা। ২০১১ সালের একুশে গ্রন্থমেলা ঘটনা।
আঠারো ফুট লম্বা স্টলটির ভেতরে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। হইচই শোরগোলে কেউ কারো কথা শুনছে না। এক পর্যায়ে পুরুষ ও নারীদের দুটি পৃথক লাইন করতে সক্ষম হলো পুলিশ ও র্যাব বাহিনীর সদস্যরা। দেখতে দেখতে লাইন দীর্ঘতর হতে লাগল। হুমায়ূন আহমেদ মাথা নিচু করে একটার পর একটা অটোগ্রাফ দিয়ে যাচ্ছেন। ছোট ছোট অক্ষরে লিখছেন তিনটি লাইন। প্রথম লাইনে অটোগ্রাফগ্রহীতার নাম, দ্বিতীয় লাইনে ‘একুশের শুভেচ্ছা’, এরপর নিচে লেখা ‘হুমায়ূন আহমেদ, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১১’। কেউ কেউ শুধু ‘একুশের শুভেচ্ছা’তে সন্তুষ্ট নয়, আরো দু-চার কথা লিখে দিতে অনুরোধ করছেন প্রিয় লেখককে। তিনি তা লিখছেন। কেউ আবার বায়না ধরছেন—লেখকের হাতটা ছুঁয়ে দেখতে চান। তিনি হাত মেলাচ্ছেন তার সঙ্গে।
এটি ছিল কিংবদন্তি এই লেখকের একুশে বইমেলায় শেষবারের মতো আসা। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ আমাদের সবার জানা।
২. ১৯৮৭ সালে আমি প্রথম বইমেলায় অংশগ্রহণ করি। তবে প্রকাশক হিসেবে নয়, খাবারের দোকানদার হিসেবে। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। বর্ধমান হাউজ-সংলগ্ন চত্বরের চারদিক ঘিরে তৈরি করা হতো খাবারের স্টল। আমরা কয়েক জন বন্ধু মিলে সেই বছর একটি খাবারের দোকান দিয়েছিলাম। নাম ছিল চৌরঙ্গি।
একদিন সন্ধ্যায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তত্কালীন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা এলেন বইমেলা দেখতে। একপর্যায়ে তিনি দলবলসহ আমাদের খাবারের স্টলে এসে বসলেন। চটপটি, ফুচকা খেয়ে চলে গেলেন। সে কী আনন্দ! শেখ হাসিনা আমাদের স্টলে খেয়েছেন। রাতে স্টল বন্ধ করতে যাব, এমন সময় দুজন এলেন বড় একটা হাঁড়ি নিয়ে। এসে বললেন, নেত্রী পাঠিয়েছেন ৫০ প্লেট চটপটি পার্সেল নেওয়ার জন্য। প্রেসিডিয়াম মিটিংয়ে তিনি সবাইকে খাওয়াবেন। আমরা মহা আনন্দে একসঙ্গে ৫০ প্লেট চটপটি বিক্রি করলাম। পরের বছর থেকে বাংলা একাডেমির ভেতরে খাবারের স্টল বন্ধ করে দেওয়া হলো।
৩. ১৯৯৭-এর ফেব্রুয়ারিতে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় ‘অন্যপ্রকাশ’ প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করে। প্রকাশক হিসেবে এই মেলাকে দেখে আসছি তখন থেকে। দেখছি প্রতি বছরই বইমেলায় প্রকাশকদের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে, বইমেলার জায়গা বৃদ্ধি সময়ের দাবি হয়ে ওঠে। এর মধ্যে বাংলা একাডেমিতে নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা শুরু হলে জায়গা কমে আসে। এক পর্যায়ে লেখক-প্রকাশকদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা একাডেমি ২০১৪ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলাকে সম্প্রসারিত করে। সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এবং বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের আন্তরিক ইচ্ছার কারণে এই স্থানান্তর সম্ভব হয়েছিল। বইমেলা তো এখন আর শুধু একুশের বইমেলা নয়। এই মেলা যে আমাদের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে।
৪. বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের চেতনার মধ্য দিয়ে যে মেলা শুরু হয়েছিল তা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে। এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নানাভাবে আমাদের গৌরবময় ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। সাতই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ, ষোলোই ডিসেম্বর নিয়াজির আত্মসমর্পণের দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে এখানেই। এখানেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে স্বাধীনতা স্তম্ভ এবং বাংলাদেশের সংগ্রামী চেতনার প্রতীক শিখা চিরন্তন। আরো আছে মুক্তিযুদ্ধের ম্যুরাল ও স্বাধীনতা জাদুঘর।
হুমায়ূন আহমেদ সব সময় একুশের বইমেলাকে বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার কথা বলতেন। স্বপ্ন দেখতেন—প্রকাশকেরা বড় বড় প্যাভিলিয়ন তৈরি করেছেন, চারদিকে বই, বই আর বই। অজস্র পাঠক ঘুরে বেড়াচ্ছেন ঘোরলাগা এক জগতে। আছেন লেখকেরাও। নতুন বই আর প্রিয় লেখকের সান্নিধ্য পেতে উন্মুখ পাঠকেরা।
এই স্বপ্ন তো আমাদের সবারই। হয়তো একসময় তা সত্যি হবে। কিন্তু একটা শূন্যতা থেকে যাবে, যা পূরণ হওয়ার নয়। লেখক :প্রধান নির্বাহী, অন্যপ্রকাশ