মেলা শেষ হওয়ার আগে গতকাল ছিল শেষ সাপ্তাহিক ছুটির দিন। তাই মেলায় ফিরে এলো সেই চিরচেনা জনস্রোত, সেই মানুষের ভিড়, স্টলে কেনাবেচা-ফিরিয়ে আনল পুরোনো বইমেলার স্মৃতি। ফিরিয়ে আনল করোনার আগে হারিয়ে যাওয়া বইমেলাকেও। সকাল থেকে ফাঁকাই ছিল, রোদ পড়ে আসতেই জমে উঠতে শুরু করে বইমেলা। সন্ধ্যার আগে এই বিশাল বইমেলাও ছোট মনে হচ্ছিল।
মেলার আর বাকি পাঁচ দিন। তাই অনেকেই হাতে নিয়ে এসেছেন পছন্দের লেখকদের তালিকা, আবার অনেকেই স্টল প্যাভেলিয়নগুলো থেকে সংগ্রহ করেছেন নতুন বইয়ের ক্যাটালগ।
ঐতিহ্য প্রকাশনীর ব্যবস্থাপক আমজাদ হোসেন কাজল জানান, দিনের বেলায় তেমন ভিড় না হলেও বিকেল থেকে লোকসমাগম বেড়েছে। এ বছরের বইমেলা শুরু হওয়ার পর থেকে ছুটির দিনগুলোতে খুব ভালো বিক্রি হয়েছে।
এদিকে, বিকালে মেলায় এসেছিলেন জনপ্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তাকে ঘিরে শিশু-কিশোরদের বিশাল ভিড়। অবশ্য কাউকেই ফিরিয়ে দেননি তিনি। সবার বইয়ে অটোগ্রাফ দিয়েছেন, তুলেছেন ছবি। অনন্যার স্টলে যথারীতি ছিলেন ইমদাদুল হক মিলন। পাঠকদের চাহিদা মেটাতে প্রতিদিনই আসছেন মেলায়, বইয়ে অটোগ্রাফ দিচ্ছেন, পাঠকদের সঙ্গে টুকটাক কথা বলছেন—এতেই তারা খুশি। অনন্যার স্টলে ছিলেন সাংবাদিক জ. ই. মামুন। এখান থেকে তার কবিতার বই ‘করতলে জোনাক জ্বলে’ প্রকাশিত হয়েছে। আর আগামী থেকে প্রকাশিত হয়েছে সাক্ষাৎকারভিত্তিক বই ‘বেহেশতের মেজর’ বইটি। তিনিও বইয়ে অটোগ্রাফ দিয়ে পাঠকদের সঙ্গ দিয়েছেন।
এদিকে, শেষ বেলায় নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন মঞ্চে ভিড় লেগেই আছে। গতকাল একাডেমিয়া পাবলিশিং হাউজ লিমিটেডের চারটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করলেন কবি আল মুজাহিদী। বইগুলো হলো—ড. মো. ফোরকান মিয়ার মওলানা ভাসানী: রাজনীতি, ধর্ম ও দর্শন, অধ্যাপক এ কিউ এম আবদুস শাকুর খন্দকারের ‘ধ্বনি বিজ্ঞান ও আরবি ধ্বনিতত্ত্ব’, আবদুল কাদের জিলানী সম্পাদিত ‘আল্লামা ইকবাল: চিন্তা ও দর্শন’ প্রভৃতি।
এছাড়া ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের লেখা বই ‘বাংলা ভাষার ডিজিটাল যাত্রা’ প্রকাশিত হয়েছে। বইটি প্রকাশ করেছে সময় প্রকাশনী।
এদিকে আজ রবিবার অমর একুশে বইমেলার ২৭তম দিনে বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া: নির্ভীক সাংবাদিকতার পথিকৃৎ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন দেলওয়ার হাসান। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন মোফাকখারুল ইকবাল, মো. মিনহাজ উদ্দীন ও শেখ আদনান ফাহাদ। সভাপতিত্ব করবেন আবেদ খান। সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
মেলামঞ্চে অনুষ্ঠান
বইমেলার মূল মঞ্চে গতকাল অনুষ্ঠিত হয় ‘একুশের গল্প ও উপন্যাস’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রফিকুর রশীদ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন নাসের রহমান, পাপড়ি রহমান ও স্বকৃত নোমান। সভাপতিত্ব করেন ইমদাদুল হক মিলন।
ইমদাদুল হক মিলন বলেন, মহান একুশের ভাষা আন্দোলন বাঙালির চেতনাকে নাড়া দিয়েছিল, রঙিন করে তুলেছিল। আর সেই চেতনা থেকে উপাদান নিয়েই লিখিত হয়েছে ভাষা আন্দোলনবিষয়ক গল্প ও উপন্যাস। একুশের চেতনাবাহী তাদের সাহিত্যকর্মকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে।
এদিকে, ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন পাপড়ি রহমান। অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি সৈয়দ আহমদ আলী আজিজ, মিনা মাশরাফী ও জায়েদ হোসাইন লাকী। আবৃত্তি পরিবেশন করেন জিনিয়া রুনা ও নুরুজ্জামান। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল ফয়জুল আলম পাপ্পুর পরিচালনায় আবৃত্তি সংগঠন ‘প্রকাশ সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠন’, জিনিয়া জ্যোত্স্নার পরিচালনায় নৃত্যসংগঠন ‘জিনিয়া নৃত্যকলা একাডেমী’ এবং ফিফা চাকমার পরিচালনায় ‘আদিবাসী সাংস্কৃতিক সংগঠন’-এর পরিবেশনা। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী সালমা চৌধুরী, আবিদা রহমান সেতু, টুম্পা সমদ্দার, নকুল চন্দ্র দাস, আইয়ুব মোহাম্মদ খান ও খালেদ মাহমুদ মুন্না।
২৬ দিনে নতুন বই এসেছে ২ হাজার ৮৫৯টি: এবারের একুশে বইমেলার বিগত ২৬ দিনে নতুন বই এসেছে ২ হাজার ৮৫৯টি। এর মধ্যে গল্প ৩৯২টি, উপন্যাস ৪২৩টি, প্রবন্ধ ১৫৬টি, কবিতা ৯০৪টি, গবেষণা ৮১টি, ছড়া ৫২টি, শিশুতোষ ৬৫টি, জীবনী ৮৯টি, রচনাবলি ১০টি, মুক্তিযুদ্ধ ৮৬টি, নাটক ১৪টি, বিজ্ঞান ৪৪টি, ভ্রমণ ৪৭টি, ইতিহাস ৫৭টি, রাজনীতি ২১টি, চি:/স্বাস্থ্য ১৬টি, বঙ্গবন্ধু ৭৩টি, রম্য/ধাঁধা ১৩টি, ধর্মীয় ৩৩টি, অনুবাদ ৩১টি, অভিধান ৮টি, সায়েন্স ফিকশন/গোয়েন্দা ৪০টি অন্যান্য ২০৪টি।
নতুন বই: গতকাল শনিবার নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে ৮০টি। উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে—ছায়াবীথি প্রকাশ করেছে হাসানাত লোকমানের কাব্যগ্রন্থ ‘নির্বাচিত কবিতা’, তাম্রলিপি প্রকাশ করেছে নাইম হোসেন ফারুকীর গণিতবিষয়ক ‘গণিতের কলকব্জা’, আহসান হাবীবের রম্যগল্প ‘হাঃ’, কথাপ্রকাশ প্রকাশ করেছে মুহিত হাসানের ইতিহাসবিষয়ক বই ‘রাজা প্রজা বণিক দারোগা’, সময় প্রকাশন প্রকাশ করেছে ড. এ. বি. এম. রেজাউল করিম ফকিরের গবেষণা ‘ভাষা-সংসর্গ বিদ্যার নিরিখে বাংলা ভাষার সৃজন, উন্নয়ন ও অবনমন পরিক্রমা’, য়ারোয়া বুক কর্নার প্রকাশ করেছে গোলাম কিবরিয়া পিনুর গল্পগ্রন্থ ‘ভাষানীতি, নন্দনতত্ত্ব ও লেখক-শিল্পীর ভাবাদর্শের লড়াই’, প্রতিকথা প্রকাশ করেছে ড. মুকিদ চৌধুরীর উপন্যাস ‘তারকাঁটার ভাঁজে’, শুভ্রপ্রকাশ প্রকাশ করেছে উদয় শংকর বিশ্বাসের ফোকলোর ‘বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক ফোকলোর চর্চা’, নবান্ন প্রকাশনী প্রকাশ করেছে সাইমন জাকারিয়ার প্রবন্ধ ‘আদিবাসী শিশু-কিশোরদের উৎসব ঐতিহ্য’, আহমদ পাবলিশিং হাউস প্রকাশ করেছে পূজা মিত্রের উপন্যাস ‘উপকূল মঙ্গল’।