সামাজিক অবক্ষয় রোধে করণীয়

মাতৃগর্ভ থেকে জন্মগ্রহণ করা একটি শিশু নৈতিকতা, মানবিকতা এবং জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠে। কিন্তু বর্তমান সমাজে আপাত দৃষ্টিতে মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও নৈতিকতা ও মানবিকতাবোধের অধঃপতনের ফলে সমাজ আজ অবক্ষয়ের চরম পর্যায়ে। সময়ের আবর্তনে আমরা এমন একটি পর্যায়ে উপনীত হয়েছি, যেখানে সন্তানের হাতে মা খুন হয়ে সংবাদের শিরোনাম হন। হাজারো ত্যাগ আর জীবনের সবটুকু বিকিয়ে দিয়ে বড় করা সন্তানের বাবা মারা যাওয়ার পর তাকে নিজ বাড়িতে অচেনা লোকের মতো ফেলে রেখে সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠে।

একজন কন্যা সন্তান জন্ম লাভ করার পর থেকেই তার নিরাপত্তা নিয়ে পিতা-মাতাকে ভাবতে হয়। ধর্ষকের শাস্তির জন্য রাস্তায় দাঁড়াতে হয়। শিক্ষকের কাছে শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হয়। দুর্নীতির অপচর্চার ফলে হতাশার কবলে পড়তে হয় মেধাবী যুবসমাজের একটি বড় অংশকে। আবার প্রতারণার কবলে পড়ে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক সম্ভাবনাময় জীবন। অপহরণ আর মাদকের ছোবলে অনেক জীবন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। অনিয়মই যেন চিরায়ত প্রথা, এমন একটি পরিস্হিতি বিরাজ করেছে চারদিকে।

ন্যায়বর্জিত চর্চার মাধ্যমে আমাদের সমাজব্যবস্থা মানবিকতায় না গিয়ে দানবিকতায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। সমাজের পারিপার্শ্বিক অবস্হা শিশুর কোমল হূদয়কে দানবিক করে তোলে। দিনে দিনে আমাদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা লক্ষণীয়ভাবে বেড়ে চলেছে। অনিয়ম, যথাযথ শিক্ষার অভাব, অপরাধের প্রশয়, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্বল নৈতিক অবস্থান, ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব, এগুলো সামজিক অবক্ষয়ের জন্য বিশেষভাবে দায়ী। এ অবক্ষয় রোধে কাজ করতে হবে সমাজের প্রতিটি স্তরে। আমাদের দেশে একটি শিশু জন্মলাভ করার পরে তার পিতামাতা তাকে শিক্ষিত করে তোলার সর্বাত্মক চেষ্টা করে থাকেন। কিন্তু এর পেছনে বড় কারণ তাকে ভালো মানুষ করা বা মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে না তুলে বরং বড় বড় সার্টিফিকেটসর্বস্ব শিক্ষা অর্জিত হয় তার, যাতে ভালো চাকরি করতে পারে ।

তাই তো আমাদের দেশে সাক্ষরতা হার বাড়লেও সুশিক্ষার হার বাড়ে না। দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে জীবনের সব স্তরে। পরিবার থেকেই শিশুর নৈতিক ও মানবিক অবস্হান দৃঢ় করার প্রতি লক্ষ রাখতে হবে। পিতামাতার মধ্যকার সম্পর্ক, সম্¦ানের প্রতি তাদের আচরণ, ভালোবাসা, সময় দেওয়া এগুলো শিশুর বিকাশকে প্রভাবিত করে। আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও শুধু একাডেমিক পড়াশোনার ওপরে জোর দেওয়া হয়। অর্থাত্ শিক্ষার সবটুকুই কাগজে-কলমে। সামাজিক অবস্হার পরিবর্তন আনতে আমাদেরকে এখানেও পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষা অবশ্যই জীবনমুখী হতে হবে এবং জীবনে শিক্ষার প্রভাব ফুটিয়ে তুলতে হবে। আইনের চোখে সবাই সমান, এ ধারাটি আরো জোরালো ভাবে সবার মধ্যে গেঁথে দেওয়ার দৃষ্টান্ত স্হাপন করতে হবে। ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করতে ব্যক্তিসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

সমাজের গুরুত্বপূর্ণ আসনে বসা মানুষেরা যেন যুব সমাজের অনুপ্রেরণা হতে পারে, আদর্শ হতে পারে, এসব খেয়াল রেখে জনপ্রতিনিধি বাছাই করতে হবে। কর্মজীবন থেকে ব্যক্তিজীবনে সততা, নৈতিকতা, মানবিকতার, পরমতসহিষ্ণতার চর্চা করতে হবে। মানুষের মধ্যে এগুলোর চর্চা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন অনুপ্রেরণামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। এ বিষয়ে সরকার এবং এনজিওগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। যে কোনো অবস্হান থেকে মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মানসিকতা দেখাতে হবে। আমাদের পারি নৈতিকতা, মানবিকতার এবং ব্যক্তিসচেতনতার দৃঢ় অবস্হানের সঙ্গে একটি সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে।

লেখক: শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়