নায়ক সাকিব ভিলেনও সাকিব

সূর্যটা তখন পশ্চিমের আকাশে কমলা রঙের একটা বৃত্ত হয়ে ঝুলে আছে। সাকিব আল হাসানও তাকিয়ে আছেন আকাশের দিকে, দুচোখে অবিশ্বাস। বাদামি চামড়ায় মোড়ানো কাঠের গোলকটা তখনো টিনো বেস্টের হাতে জমা পড়েনি। পরের মুহূর্তে একসঙ্গে অনেক কিছুই হলো। উঁচু করে তুলে দেওয়া বলটা লুফে নিলেন বেস্ট, শেষ হয়ে গেল দিনের খেলা আর বৈকালির নারকেলগাছগুলোর নিচে হারিয়ে গেল সূর্য। সেই সঙ্গে হয়তো খুলনা টেস্টে 'কিছু একটা' করে ফেলার শেষ আশাও। অগ্রহায়ণের রোদ মরে আসা বিকেলটা গ্রীষ্মদিনের মতো রোদ ঝলমলেও হতে পারত। সকালে দ্রুত ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৫ উইকেট তুলে নেওয়া গেছে, সাকিব একাই নিয়েছেন ৪টি। দ্বিতীয় বাংলাদেশি বোলার হিসেবে ছুঁয়েছেন টেস্টে ১০০ উইকেটের মাইলফলক, মোহাম্মদ রফিককে ছাড়িয়ে ১০২ উইকেট নিয়ে তিনিই এখন টেস্টে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। তারপর যথারীতি বাংলাদেশের টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের আত্মাহুতির পালা, খেয়ালি ভঙ্গিতে উইকেট ছুড়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় ৮২ রানেই নেই ৫ উইকেট। সেখান থেকেই সাকিবের লড়াইয়ের শুরু। ইনিংস ব্যবধানে হারই যেখানে খুলনা টেস্টের নিয়তি বলে ধরে নিয়েছিলেন অনেকেই, সেখানে উঁকি দিচ্ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজকে আবারও ব্যাট করানোর সম্ভাবনা। আশার মশালটা জ্বালিয়েছিলেন সাকিব, জল ঢেলে নিভিয়ে দিলেন তিনিই। বীরাস্বামী পেরমলের করা দিনের শেষ ওভারের প্রথম বলেই উইকেট ছেড়ে এগিয়ে এসে ছক্কা মারতে চাইলেন ৯৭ রানে অপরাজিত সাকিব, কিন্তু ব্যাটে বলে মিলল না। বল উঠে গেল আকাশে, মিড অফে সহজেই সেটা লুফে নিলেন বেস্ট। এই দৃশ্য দেখার জন্য সাকিব অবশ্য তখন ক্রিজে নেই, নিজের সম্ভাব্য নিয়তি আঁচ করতে পেরে অনেকটাই হেঁটে চলে গিয়েছেন ড্রেসিং রুমের দিকে। ১০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করবার দিনটা কি চমৎকারই না হতে পারত সাকিবের! বল হাতে ৪ উইকেট, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ইনিংস ঘোষণা করে দেওয়ায় পঞ্চম উইকেট শিকারের সুযোগটা হাতছাড়া হয়েছে বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিতেই পারেন তিনি। কিন্তু যেভাবে আউট হয়েছেন, তাতে কী পারবেন নিজেকে ক্ষমা করতে? সত্তরের ঘর আসতেই অস্থিরতার শুরু, সুনীল নারিনের এক ওভারে পর পর তিন বলে ৪, ৬, ৪ নিয়ে পৌঁছে গেলেন ৮৬ রানে। এর কিছুক্ষণ আগেই নাসিরকে ৪৯ রানে রেখে ১ রান নিতে গিয়ে ভুল বোঝাবুঝি। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল, নব্বইয়ের ঘরে অপরাজিত থেকে দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘুমাতে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা ছিল না তাঁর। শরীরী ভাষায় সেটা বুঝতে পেরেই অন্য প্রান্ত থেকে নাসির এগিয়ে গিয়ে জানিয়েছিলেন, 'সাকিব ভাই, আরো তিন ওভার আছে। এক এক করে খেলেন।' সতীর্থের উপদেশ কতটা কানে আর মনে নিলেন কিংবা দলের কথাটাই বা কতটা ভাবলেন কে জানে! পেরমলের করা প্রথম বলটাতেই যেভাবে তেড়েফুঁড়ে এসে বল সীমানা ছাড়া করতে চাইলেন, তাতে মনে হচ্ছিল তাঁর মনে বাজছে একটাই সুর, 'তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সেঞ্চুরিটা চাই'। সেঞ্চুরি হলো না, ক্যারিয়ারে তৃতীয়বারের মতো নব্বইয়ের ঘরে কাটা পড়লেন সাকিব। এর আগে শ্রীলঙ্কা ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আউট হয়েছিলেন ৯৬ রানে, এবার ৯৬ থেকে ৯৭-তে পৌঁছার পর তাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন অনেকেই। কিন্তু সেই স্বস্তি পরমুহূর্তেই উধাও করে দিয়েছেন সাকিব নিজেই। সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা একটা কথা খুব বেশি ব্যবহার করেন, 'সবাই যার যার নিজের খেলাটা খেলার চেষ্টা করে।' কথাটা ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে আসা নাসিরও বললেন। যার সূত্র ধরে প্রশ্ন হতেই পারে, তাহলে কী একটা দল হিসেবে এখনো তৈরি হয়নি বাংলাদেশ? ম্যাচের পরিস্থিতি, দলের চাহিদা কোনো কিছুই কি বদল আনতে পারে না ক্রিকেটারদের নিজেদের খেলার ধরনে? এমন পরিস্থিতিতে সাকিবের কাছে সেঞ্চুরির চাইতে বড় লক্ষ্য হতে পারত উইকেটের ঘরে সংখ্যাটা না বাড়ানো, চতুর্থ দিনটা অপরাজিতভাবে শেষ করে পরদিন তরতাজা হয়ে মাঠে নেমে ইনিংসটা যতটা সম্ভব লম্বা করার চেষ্টা করে। একই মাঠে আগের দিনে যা করে দেখিয়েছেন মারলন স্যামুয়েলস-শিবনারায়ণ চন্দরপলরা। গ্যালারি থেকে ভেসে আসা হাততালির আশায় কেউই দুঃসাহসিক শট খেলতে গিয়ে কেউই উইকেট বিলিয়ে আসেননি। তাহলে কি দলের চাইতে ব্যক্তিগত অর্জনই বড় হয়ে গেল? এই প্রশ্নেরও উত্তর মেলে না। এই সিরিজের দুই টেস্টেই বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা শতরানের অনেক কাছে গিয়ে দাতাকর্ণের মতোই বিলিয়ে দিয়েছেন উইকেট। সাকিবের ৯৭-তে আউট হওয়ার আগেও মিরপুরে তামিম ইকবালের ৭২, সাকিবের ৮৯ কিংবা নাসিরের ৯৬, এর একটিও কি তিন অঙ্কে পৌঁছাতে পারত না? এই প্রশ্নের উত্তরই খোঁজা হয়েছিল দিন শেষে ৬৪ রানে অপরাজিত থাকা নাসিরের কাছে, 'একশ মারাটা অভ্যাসের ব্যাপার। আমাদের যে জাতীয় লিগ খেলা হয়, জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা সেখানে সেভাবে খেলতে পারেন না। তারা খেললে ভালো হতো। চাইলেই কেউ একশ মারতে পারে না...(হাসি)। টেন্ডুলকারের কিন্তু নব্বইয়ের পর হাঁটু কাঁপে। এতগুলো একশ মারার পরেও উনার সমস্যা হয়, আর আমরা তো এখনো কিছু করি নাই।' খুলনা টেস্টের শেষ দিনের খেলায় সেই অভ্যাসের শুরুটা নাসির করতে পারবেন কি না সেটা অবশ্য অনেক পাঠক পত্রিকা হাতে তোলার আগেই জেনে যাবেন! প্রতিপক্ষ ৬০০ রান করে ফেলার পর ৪ উইকেট যেমন খেলায় খুব একটা প্রভাব ফেলে না, তেমনি আশি-নব্বইয়ের ঘরে গিয়ে আউট হওয়াটাও নিজের বা দলের কোনো খাতাতেই লাভের অঙ্কে যোগ হয় না। 'নিজেদের খেলা'টা খেলার পর সেটা শেষ পর্যন্ত কোনো কাজে আসে, এমন প্রশ্ন তাই অনেকের মনে জাগতেই পারে। তবে গাড়ির চারটে চাকা চার দিকে ছুটতে চাইলে ফলটা কী হবে, তার উত্তর কিন্তু প্রায় সবারই জানা!