ডাক্তাররা মিছিল-মিটিংয়ে রোগীরা অপেক্ষায়

শনিবার দুপুর ১২টা। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ভেতরে রোগীর ভিড়। একই সময়ে একদল চিকিৎসকের ভিড় হাসপাতালের ডা. মিলন মিলনায়তনের আঙিনায়। কিছুক্ষণ পর আরো একদল চিকিৎসক পরিবেষ্টিত হয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন বিএমএর আসন্ন নির্র্বাচনে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত প্যানেলের মহাসচিব পদপ্রার্থী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। এ সময় চিকিৎসকরা স্লোগান ধরলেন। একই সময়ে মিলনায়তন কমপ্লেঙ্রে বাইরে অন্য দল চিকিৎসক স্লোগান তুললেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত ডা. মাহামুদ হাসান ও ডা. ইকবাল আর্সলান প্যানেলের পক্ষে। এর দেড় ঘণ্টা আগে এ প্যানেলের মহাসচিব পদপ্রার্থী ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলানও সঙ্গী-সাথি নিয়ে ঘুরে গেছেন এ ক্যাম্পাস। গতকাল এ পরিস্থিতি দেখে হাসপাতালে রোগী নিয়ে আসা একজন কালের কণ্ঠকে বলেন, 'এটা কোনো হাসপাতাল কি না, তাই তো চেনা যায় না। ডাক্তাররা দুই দলই হাসপাতালের বাইরে এসে মিছিল-মিটিংয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এখন রোগীদের কী অবস্থা হচ্ছে- তা দেখবে কে?' বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) নির্বাচন নিয়ে হাসপাতালগুলো এখন চিকিৎসকদের রাজনৈতিক ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। দলে দলে ভাগ হয়ে চিকিৎসকরা প্রার্থীদের সঙ্গে নিয়ে এ হাসপাতাল থেকে ও হাসপাতালে যাচ্ছেন। মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চারপাশের ভবন-গাছপালা একরকম ঢাকা পড়ে গেছে নির্বাচনী ব্যানার-ফেস্টুনে। একজন সিনিয়র চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, 'এবারের মতো বিএমএর ভোট নিয়ে এত উন্মাদনা আগে কখনো দেখা যায়নি। আর প্রচারণায় এত টাকার ছড়াছড়ি, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। হাসপাতালের রোগী দেখা ফেলে কিংবা কলেজের ক্লাস বাদ দিয়ে যাঁরা সকাল থেকে-দুপুর পর্যন্ত ভোটের কাজে ব্যস্ত, তাঁরা হয়তো ভালো নেতা হতে পারেন- কিন্তু কোনোভাবেই ভালো চিকিৎসক হতে পারেন না। তাঁরা কেউ ছুটিও নেননি। ভোটে জিতে এসব চিকিৎসক নেতা তো রোগীদের আরো বেশি জিম্মি করে ফেলবেন।' গতকাল সকাল ১০টা থেকে বিএনপি সমর্থিত ড্যাব প্যানেলের আরেকটি পরিচিতি সভা হয় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ২৯ নভেম্বরের বিএমএ নির্বাচনকে ঘিরে এখন সব হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ এলাকার পরিবেশও পাল্টে গেছে। সাধারণ সময়ে যেসব হাসপাতালে কোনো রকম ব্যানার-পোস্টার ঝুলানো নিষেধ, সেখানে এখন পুরো ক্যাম্পাসই প্রায় ঢাকা পড়েছে শত শত পোস্টার-ব্যানার-ফেস্টুনে। হাতে হাতে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে লিফলেট-স্টিকার। এদিকে নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বিএমএ নির্বাচন নিয়ে নানান গুজব-গুঞ্জন আর উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ছে ভোটারদের মধ্যে। অনেকে সুষ্টু ও শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হবে কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন। বিএমএর বর্তমান মহাসচিব অধ্যাপক ডা. সারফুদ্দিন আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, 'নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হবে বলেই আমরা আশা করছি। এ ছাড়া এত সরবভাবে এর আগে কখনো ভোট হয়নি। পুরোপুরি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এবার নির্বাচন হচ্ছে। এ নিয়ে কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই।' ভোটের জন্য রোগীদের ক্ষতি প্রসঙ্গে ডা. সারফুদ্দিন বলেন, 'সব চিকিৎসকই প্রার্থী নয়, তাই রোগী ফেলে সব ডাক্তার নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত থাকার ধারণাটি সঠিক নয়। এর পরও কিছুটা সাময়িক বিঘ্ন ঘটে থাকলে চিকিৎসকদের পেশাগত স্বার্থের প্রশ্নে এটুকু মেনে নেওয়া দরকার।' স্বাচিপের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান বলেন, 'নির্বাচনের হাওয়া এখন খুবই জোরালো। খুবই শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু পরিবেশে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চলছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের প্যানেল পরিচিতি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে ডা. জাহিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমরা চাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বার্থে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু পরিবেশে পুরো ভোট প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। কিন্তু আমাদের বিভিন্ন নির্বাচনী তৎপরতায় যেভাবে বিঘ্ন বা মানসিক উদ্বেগের সৃষ্টি করা হচ্ছে, তা ঠিক নয়।' প্যানেল পরিচিতি সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিএমএর সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম এ মাজেদ। সভাপতিত্ব করেন ড্যাবের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল শাখার সভাপতি ডা.এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁয়া মাসুম। ডা. জাহিদ হোসেনের অভিযোগ প্রসঙ্গে স্বাচিপের মহাসচিব ইকবাল আর্সলান বলেন, 'ড্যাবের লোকজন শুধুই অপপ্রচার চালাচ্ছেন। এটা তাঁদের রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে। অথচ এবার নির্বাচনে তাঁরা কোটি কোটি টাকা খরচ করে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি ব্যানার, পোস্টার, লিফলেটে সবগুলো হাসপাতাল-মেডিক্যাল কলেজ ছেয়ে ফেলেছেন। আমরা কোথাও তাঁদের কোনো প্রচারকাজে বিন্দুমাত্র বিঘ্ন ঘটাইনি। ড্যাব মহাসচিব অধ্যাপক ডা. জাহিদ হোসেন বলেন, স্বাচিপের পক্ষে ক্ষমতাসীন দল থেকে প্রশাসনিকভাবে নির্বাচনের ওপর প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা রয়েছে। তবু আমরা নির্বাচনে থাকব এবং জয়ী হব বলে আশা করি।' এদিকে ভোটের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়েও সাধারণ ভোটারের মধ্যে শুরু হয়েছে বিচার-বিশ্লেষণ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগের প্রধান কালের কণ্ঠকে নিজের অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, দলের সক্রিয় কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে বাইরে রয়েছেন কমপক্ষে ২০-২৫ শতাংশ চিকিৎসক ভোটার। তাঁরা দলের চেয়ে প্রার্থীদের বিবেচনা করবেন বেশি। ফলাফলের ক্ষেত্রে তাঁদের ভোট বড় রকমের ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করতে পারে। এদিকে বিএমএ নির্বাচন সম্পর্কে বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জনস্বাস্থ্য সংগ্রাম পরিষদ ও চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট নামের দুটি সংগঠন। গত ২১ নভেম্বর জনস্বাস্থ্য সংগ্রাম পরিষদের এক সভার সিদ্ধান্তের আলোকে ওই সংগঠনের আহ্বায়ক ডা. ফইজুল হাকিম লালা বলেন, বিএমএ চিকিৎসকদের পেশাগত অধিকারের একটি সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেলেও গত কয়েক বছর যাবৎ এটি সব সময়ই যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তাদের দখলে চলে যায়। ফলে সাধারণ চিকিৎসকরা এ সংগঠনের মাধ্যমে তাঁদের অধিকার রক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই শাসকশ্রেণীর কবল থেকে বিএমএকে রক্ষা করা জরুরি হয়ে পড়েছে। ডক্টরস ফর হেলথের সাধারণ সম্পাদক ডা. শাকিল আখতার স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিএমএ এখন আর মর্যাদা বা গর্ববোধের প্রতিষ্ঠানের পর্যায়ে নেই। তাই ডক্টরস ফর হেলথ এবার বিএমএ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে না। আমাদের মিটফোর্ড প্রতিনিধি জানান, গতকাল শনিবার সকাল ১০টায় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অডিটরিয়ামে ডা. আজিজ-ডা. জাহিদ প্যানেলের পরিচিতি সভা অনুষ্ঠিত হয়।