দালাল ছাড়া পাসপোর্ট করতে গেলে পদে পদে হয়রানি
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০১২, ১৫:৫৩
বগুড়া পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ দালাল ও অসৎ কর্মচারীদের কারণে হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনিয়ম ও হয়রানি ঠেকাতে কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ কাজে আসছে না। পুরুষ দালালদের পাশাপাশি সক্রিয় রয়েছে নারী দালাল। তবে পাসপোর্ট কর্মকর্তারা অনিয়মের কথা অস্বীকার করে বলেছেন, জনসাধারণকে সবর্োত্তম সেবা দেওয়া হচ্ছে, কোন অনিয়ম হচ্ছে না।
পাসপোর্ট নবায়ন ও নতুন মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট(এমআরপি ) করার ক্ষেত্রে মানুষকে হয়রানি থেকে বাঁচাতে ২০১০ সালের ১৩ মে বগুড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নিচতলায় বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলার জনসাধারণের জন্য পাসপোর্ট ও বহিরাগমন অধিদপ্তরের আঞ্চলিক অফিস স্থাপন করা
হয়। এর আগে এ দু'জেলার জনসাধারণ পাসপোর্ট করতে রংপুর আঞ্চলিক অফিসে যেতে হতো। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ অফিসে পাসপোর্টের জন্য প্রতিদিন গড়ে ৩০০টি আবেদন জমা পড়ে এবং সমসংখ্যক ইস্যু (ডেলিভারী) হয়। পাসপোর্ট করতে যারা আসে তাদের বেশিরভাগই গ্রামের শিক্ষিত/অর্ধশিক্ষিত বেকার যুবক । যারা বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যেতে চায়। তারা এ অফিসে যেতেই দালালরা পাসপোর্ট করতে সহায়তার জন্য এগিয়ে আসেন। যারা নিজেরাই নিজের কাজ করতে চান, প্রতি পদে পদে তাদের হয়রানি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে ।
সমপ্রতি ওই অফিসে সরেজমিনে দেখা যায় বিচিত্র ঘটনা। জয়পুরহাট থেকে আসা আশরাফুল ইসলাম নামের এক যুবক জানান, তিনদিন ঘুরে পাসপোর্ট ফি জমার চালান কপিসহ আবেদনপত্র জমা দিতে পারেননি। প্রতিদিন দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতেই বেলা ১টা বেজে যায়। তখন আবেদন জমা নেয়া বন্ধ করা হয়। ছবি ও আঙ্গুলের ছাপ (ফিঙ্গার প্রিন্ট) দেবার জন্য আসা মানুষদেরও একই অবস্থা । আবেদনকারী নিজে জমা দিতে গেলে নানা রকম ভুল ধরে ফেরত দেয়া হয়। এতে সময় বেশি নেয়ার পাশাপাশি মানুষকে হয়রানি করা হয়। কিন্তু দালালরা যে আবেদন জমা দেয় তাতে সময় কম নেয়া হয় এবং ভুল ধরা হয় না। দালালদের মাধ্যমে পাসপোর্ট করতে আসাদের দিনে দিনেই ছবি তোলা ও আঙ্গুলের ছাপ নেয়ার কাজ সেরে ফেলেন অফিস কর্তৃপক্ষ । এভাবে মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে। একই ধরনের অভিযোগ অন্যদের।
বগুড়া দুপচাঁচিয়া থেকে আসা আমিনুল ইসলাম আবিরের অভিযোগ- গত ২৯ অক্টোবর তার পাসপোর্ট ইস্যু হবার কথা থাকলেও পুলিশ রিপোর্ট আসেনি অজুহাতে তাকে দিনের পর দিন হয়রানি করা হচ্ছে । থানায় খোঁজ নিতে গেলে তারা বলছে রিপোর্ট পাসপোর্ট অফিসে । শুধুমাত্র দালাল দিয়ে পাসপোর্ট না করানোর কারণেই তিনি এভাবে হয়রান হচ্ছেন বলে দাবি তার । সোনাতলার জিয়ারুর ইসলাম জানালেন, ফিঙ্গার প্রিন্ট ও ছবি তোলার জন্য প্রতিদিনই আসেন, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন । এভাবে পাঁচদিন পর তিনি ছবি তুলেছেন । দালালের মাধ্যমে আসলে তাকে এই কষ্ট ভোগ করতে হতো না জানিয়ে আক্ষেপ করে তিনি বললেন,"তাইতো মানুষ বেশি টাকা দিয়ে দালালের মাধ্যমে পাসপোর্ট করে, তাতে হয়রানির শিকার হতে হয় না" কতদিনে এসব বন্ধ হবে -এটিই এখন তার বড় প্রশ্ন ।
পাসপোর্ট অফিসের আশেপাশে প্রায় ২০/২৫জন দালাল এবং গ্রামাঞ্চলে আরো সক্রিয় রয়েছে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন দালাল । প্রতি পাসপোর্ট ইস্যুর জন্য নির্দিষ্ট টাকা জমা দেবার পরও পাসপোর্টপ্রতি গড়ে ১ হাজার থেকে ১২শ' টাকা বাড়তি দিতে হয় দালালদের ।
পুরুষ দালালদের পাশাপাশি সক্রিয় রয়েছে নারী দালালরাও । নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন দালাল জানান, পাসপোর্ট অফিসেই বাড়তি ৭ শ' টাকা দিতে হয় । না হলে হয়রানির শিকার হতে হয় ।
পাসপোর্টের জন্য পুলিশ রিপোর্ট দেবার ক্ষেত্রে পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের টাকা দাবির অভিযোগ প্রসঙ্গে বগুড়ার পুলিশ সুপার মোজাম্মেল হক ইত্তেফাককে জানান, এ ধরনের নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে সংশ্লিস্নষ্ট পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে । তিনি আরও জানান, ইতিমধ্যেই একই ধরনের অভিযোগে একজন এএসআইকে ক্লোজ করে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে ।
জনগনের হয়রানির অভিযোগ প্রসঙ্গে বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, বগুড়ার উপ-সহকারী পরিচালক শাহজাহান হাওলাদার বলেন, দালালের সাথে কোন সম্পর্ক নেই। আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই করতে কিছুটা সময় লাগে। কিন্তু এ জন্য কাউকে হয়রানি করা হয় না। দালাল নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সদস্যরা তৎপর রয়েছে। তবে অফিসের বাইরে কে কি করছে তা দেখার দায়িত্ব তাদের নয় বলে তিনি জানান ।