ইসির সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর তৃতীয় দিনের সংলাপ
২০০৮ সালের পূর্বের সংসদীয় সীমানা বহালের দাবি জেপিরও
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০১২, ১৫:৫৩
ঢাকায় বাড়াতে গিয়ে গ্রাম উন্নয়ন বঞ্চিত হচ্ছে :জাতীয় পার্টি (এ) ++ফেব্রুয়ারির মধ্যে সীমানা নির্ধারণ সম্পন্নের দাবি ওয়ার্কার্স পার্টির ++ঢাকার আসন ১০টি করার প্রস্তাব জেএসডির ++সময় চেয়ে আবেদন আওয়ামী লীগ, জাসদ ও জাগপার
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তৃতীয় দিনের সংলাপে ২০০৮ সালের পূর্বের অবস্থাকে ভিত্তি ধরে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। গতকাল বুধবার কমিশনের সম্মেলন কক্ষে ৬টি আমন্ত্রিত দলের সঙ্গে সংলাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও ৪টি দল অংশ নিয়েছে। দলগুলো হল-জাতীয় পার্টি-জেপি, জাতীয় পার্টি (এ), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি । সংলাপে জাতীয় পার্টি-জেপি বলেছে, ওয়ান ইলেভেনের সময়ে সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আনা হয়। সেই সময়ে ঢাকায় আসন বাড়িয়ে গ্রামে কমানোতেই সুষম উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। জনসংখ্যা আইনে তিন নম্বরে থাকলেও তা এক নম্বরে
বিবেচনায় আনা হয়। এ জন্য সীমানা পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে ২০০৮ সালের পূর্বের অবস্থাকে ভিত্তি হিসেবে ধরে কাজ করতে হবে কমিশনকে। এর আগে গণফোরাম, খেলাফত মজলিসসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল একই দাবি করেছিল। জাতীয় পার্টির (এ) পক্ষ থেকে বলা হয়, ঢাকায় আসন সংখ্যা বাড়াতে গিয়ে গ্রামের অনেক আসন কেটে নেয়া হয়েছে। উন্নয়ন বঞ্চিত হচ্ছে গ্রাম। এ অবস্থা থেকে কমিশনকে সরে আসার দাবি জানিয়েছে দলটি। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে সীমানা পুনর্নির্ধারণের কাজ সম্পন্নের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। অন্যদিকে ঢাকার আসন সংখ্যা ১০টি করার প্রস্তাব দিয়েছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক পার্টি-জেএসডি। এদিকে, আজ বৃহস্পতিবারের নির্ধারিত সংলাপে অংশ নিচ্ছে না আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) সময় চেয়ে আবেদন করেছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এই সংলাপ শুরু হয়। বেলা ১২টায় অনুষ্ঠিত সংলাপে জাতীয় পার্টি-জেপির মহাসচিব শেখ শহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে ৮ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল অংশ নেন। এ সময়ে জেপির মহাসচিব বলেন, সংসদীয় আসনের সীমানা প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সীমানা পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে অখন্ডতা ও প্রশাসনিক সুবিধাসহ কিছু মানদ- নির্ধারণ করতে হবে। কোন আসন ৯টি ইউনিয়ন নিয়ে আবার কোন আসন ২৯টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠন করা হয়েছে। ঢাকা শহরের আসনগুলোয় বেশি জনসংখ্যা থাকলে সমস্যা নেই, তেমনি গ্রামে জনসংখ্যা কম থাকলেও সুষম উন্নয়ন হয়। জনসংখ্যা আইনে এক নম্বরের না থাকলেও বিগত কমিশন এটিকে বিবেচনায় আনায় সারাদেশের সংসদীয় আসনে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। সেই সময়ে কোন নিয়মই মানা হয় নি। ২০০৮ সালে ভান্ডারিয়ার একটি ইউনিয়ন মঠবাড়িয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। যেটি অসঙ্গতিপূর্ণ।
তিনি বলেন, সদিচ্ছা থাকলে রাজনৈতিক সরকারের অধীনেও অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব। এর উদাহরণ হলো, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ও টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপনির্বাচন। যেখানে সরকার দলীয় প্রার্থী পরাজিত হলেন। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ভালো নয়। রাজনৈতিক নেতাদের অনমনীয়তা ও খামখেয়ালিপনায় ১/১১ এর মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোও নিবন্ধিত হওয়ার পর নিবন্ধনের নিয়ম-বিধি মানে না। তিনি বলেন, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিচ্ছন্ন নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে নি। রাজনীতিবিদদের প্রতি কোন আস্থা তৈরি হয় নি। যার জন্য তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতির উদ্ভব হয়। ভোটার তালিকার হালনাগাদ কার্যক্রমে কোন প্রচার-প্রচারণা নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশে দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, আইনের মধ্যে থেকে কাজ করবে কমিশন। কোন বৈষম্য সৃষ্টি করবেন না, তাহলে জননন্দিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবেন। ভারতের উদাহরণ দিয়ে বলা হয়, সেখানকার ইসির বন্ধু হলো রাজনৈতিক দল ও আদালত। এছাড়া সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ইসির সমআচরণ কামনা করে দলটি। জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রহিম ও কর্নেল (অব.) আব্দুল লতিফ মলি্লক ঢাকার আসন সুনির্দিষ্ট করে দেয়ার দাবি জানান। দলটির অতিরিক্ত মহাসচিব সাদেক সিদ্দিকী বলেন, রাজনৈতিক দলের মার্কা সংরক্ষণ করা জরুরি। আমাদের দলের মার্কা উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে ব্যবহার করা হয়েছে। সংলাপে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন-প্রেসিডিয়াম সদস্য শাহ রফিকুল বারী চৌধুরী, মিসেস আমেনা বারী, মফিজুল হক বেবু ও নাজমুন্নাহার বেবী।
জাতীয় পার্টি (এ)
সকাল ১১টায় নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে তৃতীয় দিনের প্রথম সংলাপ অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় পার্টির (এ)। দলের মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারের নেতৃত্বে ৮ সদস্যের প্রতিনিধি দল সংলাপে অংশ নেয়। দলটি ঢাকার আসন কমানোসহ সংসদ ছাড়াও সব নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন বাধ্যতামূলক করা, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সেনাবাহিনীকে নির্বাচন কমিশনের অধীনে আনার দাবি জানায়। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে দলটি। রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, জনগণের দাবি অনুযায়ী সারাদেশে আসন সংখ্যা বাড়ানো উচিত। ২০০৮ সালের নির্বাচনে পিরোজপুর ও বরগুনা থেকে যে আসন কমানো হয়েছে তা পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ারও আহবান জানান তিনি। এছাড়া রাজধানী ঢাকার আসন সংখ্যা ১৫তে রাখারও পরামর্শ দেন তিনি। বর্তমান ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, গত এপ্রিলে ডিসিসি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার পর বিভিন্ন স্থানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিলবোর্ড থাকলেও ইসি আমার নির্বাচনী বিলবোর্ড না সরানোর কারণে শুধুমাত্র আমাকে শোকজ করা হয়েছে। এতে ইসি'র নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া দলটি আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হতে সরকারের লাভজনক পদে তিন বছর থাকার পর প্রার্থী হওয়ার যে বিধান তা বাতিল, ইসিকে শক্তিশালী ও স্বাধীনভাবে কাজ করার অনুরোধ করা হয়।
ওয়ার্কার্স পার্টি
আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। গতকাল বিকাল ৪টায় দলটির সভাপতি রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে ৭ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল সংলাপে অংশ নেয়। রাশেদ খান মেনন বলেন, ফেব্রুয়ারির মধ্যে সীমানা নির্ধারণের কাজ না করলে প্রার্থীরা তার নির্বাচনী এলাকায় প্রচার-প্রচারণার সময় পাবে না। তিনি বলেন, সংশোধিত সংবিধানের ১২৩(গ) ধারা অনুযায়ী আগামী নির্বাচন প্রার্থীদের জন্য লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরি হবে না। লেভেল প্লেইং ফিল্ড প্রস্তুত করতে আগামীতে সংবিধান সংশোধন করারও দাবি জানান তিনি। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসিকে আরো স্বাধীন ও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করার আহবান জানান।
মেনন বলেন, ইসি'র নিবন্ধন পাওয়ার পর প্রতিটি দলের আইন মানা উচিত। কিন্তু জামায়াতে ইসলাম আইন মানছে না। তিনি তাদের নিবন্ধন বাতিলেরও দাবি জানান। দলটি আগামী নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে স্টাইকিং ফোর্স হিসেবে ব্যবহার, দ্রুত সময়ের মধ্যে সীমানা নির্ধারণ কাজ শেষ করা, নির্বাচনী ব্যয় কমানো এবং নির্বাচনকালীন সময়ে স্বরাষ্ট্র, অর্থ, স্থানীয় সরকার ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ ইসির কাছে হস্তান্তরের দাবি জানায়।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডি
ঢাকার সংসদীয় আসন ১০টি করার প্রস্তাব দিয়েছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি। গতকাল বিকাল ৩টায় অনুষ্ঠিত সংলাপে দলটির সভাপতি আ স ম আব্দুর রব এই প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে বাংলাদেশে এমন ইতিহাস নেই। আর ভবিষ্যতে হবে সে বিশ্বাস ও সংস্কৃতি এখনও গড়ে উঠেনি। রব নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশে বলেন, ডিসিসি নির্বাচন করতে না পেরে প্রমাণ করেছেন আপনারা স্বাধীন নন। জনগণের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়াই হচ্ছে গণতন্ত্র ও সংসদের কাজ। আমাদের সংসদ জনগণের ক্ষমতা কুক্ষিগত করা, নিয়ন্ত্রণ করায় গণবিরোধী ভূমিকা গ্রহণ করছে। আমাদের দাবি হল, সংসদ হবে ৫শ' আসনের। বিদ্যমান ৩শ' আসন রেখে এর বাইরে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের ২শ' প্রতিনিধি নিয়ে সংসদের উচ্চ কক্ষ গঠন করতে হবে। ডিসিসিসহ সকল জেলা পরিষদের দ্রুত নির্বাচন করতে হবে।
সংলাপে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ প্রথমেই ভোটার তালিকা হালনাগাদ বিষয়ে দলগুলোকে অবহিত করেন। তিনি বলেন, চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে একাধিকবার আপনাদের সঙ্গে বসতে চাই। বর্তমান সংলাপই শেষ সংলাপ না। আমাদের সামনে বড় দুটি নির্বাচন রয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচন। সীমানা নির্ধারণের ব্যাপারে সিইসি বলেন, সকলের মতামত নিয়ে সীমানা নির্ধারণের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তিনি বলেন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন উচ্চ আদালতের নির্দেশে বন্ধ আছে। আমরা আশা করছি, সার্বিক বিবেচনা করে উচ্চ আদালত নির্বাচনের জন্য রায় দিবেন। আমরা নির্বাচন করার জন্য প্রস্তুত রয়েছি। এসময়ে উপস্থিত ছিলেন, নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক, মোহাম্মদ আবু হাফিজ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) মো: জাবেদ আলী, মো: শাহ নেওয়াজ প্রমুখ।
সময় চেয়েছে আওয়ামী লীগ, জাসদ ও জাগপা
নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সময়ের বাইরে নতুন করে তারিখ চেয়ে আবেদন করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)। আজ বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপের দিন ধার্য করেছিল ইসি। বেলা তিনটায় সংলাপের সময় নির্ধারিত ছিল। ওই দিন চলতি সংসদ অধিবেশনের সমাপ্তির দিন হওয়ায় সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে দলটি। আওয়ামী লীগের উপ-দফতর সম্পাদক মৃনাল কান্তি দাস বুধবার বেলা ২টায় এক চিঠির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের কাছে পুনরায় সময় চান। এসময় মৃনাল কান্তি দাস সাংবাদিকদের জানান, 'আমরা সংসদ অধিবেশনে যোগ দেয়ার জন্য বৃহস্পতিবার যোগ দিতে পারছি না বলে ইসির কাছে সংলাপের নতুন একটি সময় চেয়েছি। সেক্ষেত্রে ৪ ডিসেম্বর সংলাপ শেষ হওয়ার পর ৫ ডিসেম্বর এ দিন হতে পারে।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জনসংযোগ পরিচালক এম আসাদুজ্জামান জানান, আওয়ামী লীগের জন্য এখনো সময় নির্ধারণ করা হয়নি। তবে জাগপাকে ৩ ডিসেম্বর এবং জাসদকে ৪ ডিসেম্বর বিকাল ৪টায় সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।