দ্বীপদেশ শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গেল গত ২১ এপ্রিল খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের একটি পবিত্র দিন ইস্টার সানডেতে। তিনটি গির্জায় এবং তিনটি হোটেলসহ মোট আট জায়গায় আত্মঘাতী বোমা হামলায় মৃত্যুবরণ করেছেন প্রায় তিনশ মানুষ। আহত হয়েছেন শ’পাঁচেক। শ্রীলঙ্কায় অশান্তি ছিল, গৃহযুদ্ধ ছিল, হানাহানি ছিল, রক্তপাত ছিল কিন্তু সেটা এক দশক আগের কথা। ২০০৯ সাল থেকে প্রায় ২৬ বছর ধরে চলে আসা ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা-হাঙ্গামার অবসান ঘটিয়ে দেশটি শান্তির পথে যাত্রা শুরু করে। মাঝে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার মতো কিছু ছোটখাটো ঘটনা লক্ষ করা গেলেও তা যে ব্যাপকতা লাভ করবে— তেমন আশঙ্কা কাউকে পোষণ করতে শোনা যায়নি। শ্রীলঙ্কায় শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব্ব-কলহের খবরও ছিল। রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে বিরোধের জেরে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সমস্যার কথা জানা গেলেও তা কোনো বড় রক্তপাত বা বিপর্যয়ের সূচনা করতে পারে সেরকম কোনো ভবিষ্যদ্বাণীও কারো মুখে শোনা যায়নি।
তাই অনেকটা যেন বিনা মেঘেই বজ্রপাতের মতো শ্রীলঙ্কায় গত ২১ এপ্রিল ঘটলো মারাত্মক সহিংসতার ঘটনা। কোনো একদিনের জঙ্গি হামলার ঘটনায় এতো মানুষের হতাহত হওয়ার ঘটনা আর আগে ঘটেনি। শ্রীলঙ্কায় গির্জায় প্রার্থনারত মানুষদের ওপর এমন পৈশাচিক হামলার ৩৫ দিন আগে নিউজিল্যান্ডের দুটি মসজিদে নামাযরত মুসল্লিদের ওপর বর্বর হামলার ঘটনা ঘটেছিল। সেখানেও প্রাণ গেছে ৫০ জনের। বাংলাদেশের পাঁচজনও নিউজিল্যান্ডের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। শ্রীলঙ্কাতেও জায়ান নামের বাংলাদেশের আট বছর বয়সী এক শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে। জায়ানের বাবা গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম করছেন। জায়ান আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা শেখ সেলিমের নাতি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও নাতি। প্রধানমন্ত্রীর স্নেহ-ভালোবাসা পেয়েছে জায়ান। নির্দোষ এই শিশুর এমন করুণ মৃত্যু কারো প্রত্যাশিত ছিল না। সে কারো কোনো ক্ষতি করেনি। কোনো ধর্মের প্রতি, কোনো মানুষের প্রতি তার হিংসা ছিল না, বিদ্বেষ ছিল না। অথচ ধর্মীয় হিংসা-বিদ্বেষের শিকার হয়ে তাকে জীবন দিতে হলো।
সন্ত্রাসী ঘটনা পৃথিবীর যেখানেই ঘটুক না কেন— তার প্রতিক্রিয়া এখন আর একদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বিশ্ব যেহেতু এখন হাতের মুঠোয় সেহেতু এক জায়গায় আঘাত হলে তার অভিঘাত একসঙ্গে বহু জায়গায় লাগে। কখন কোন দেশে সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটবে, উগ্রবাদী জঙ্গিরা কখন কোথায় কার ওপর হামলে পড়বে তা আগে থেকে বলা মুশকিল। তবে যেখানেই হামলা হোক, তার প্রতিক্রিয়া হবে সর্বব্যাপী। সে হিসেবে বলা যায়, গোটা মানবজাতি আজ অনিরাপদ। তাই এখন সাবধান থাকতে হবে সব দেশের সব মানুষকেই, সব ধর্ম বিশ্বাসী মানুষকেই।
কীভাবে মোকাবিলা করা যাবে এই জীবনঘাতী উগ্রতা? কেন, কোন লক্ষ্য অর্জনের জন্য এই সন্ত্রাস, হানাহানি, রক্তপাত? এর জন্য কি কোনো বিশেষ ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষ দায়ী? কীভাবে, কোথা থেকে শুরু হলো এই ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের যাত্রা? রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার, নাকি ধর্মনিরপেক্ষতার বোলচাল এই পরিণতির দিকে মানবসমাজকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার সময় এসেছে। একটি ট্র্যাজিক ঘটনা ঘটবে আর তা নিয়ে হইচই হবে, কারা এই ঘটনা ঘটালো তাদের তত্ত্ব তালাশ হবে, কার ব্যর্থতার জন্য এমন মানবিক বিপর্যয় ঘটলো তার সুলুকসন্ধান চলবে, তারপর আবার সব ঠান্ডা। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে মানবজাতির সামনে বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে বলে আশঙ্কা করার কারণ আছে।
মানুষ হত্যার মতো গুরুতর অপরাধ যারা সংঘটিত করছে, তাদের বিচারের আওতায় আনা দরকার। কারা তাদের মদদ দিচ্ছে, আশ্রয় দিচ্ছে, অর্থ দিচ্ছে, অস্ত্র দিচ্ছে তাদের খুঁজে বের করতে হবে, ধরতে হবে, শাস্তি দিতে হবে। মুসলমানের ওপর আক্রমণ হলে খ্রিস্টান-হিন্দু-বৌদ্ধ বা অন্য ধর্ম বিশ্বাসীদের খুশি হওয়ার কিছু নেই। কারণ কোনো ধর্ম বিশ্বাসীই এখন আর বারুদ-সীমার বাইরে নয়। এক দেশে হামলা হলে অন্য দেশেরও স্বস্তিবোধের কারণ নেই। বাংলাদেশের হলি আর্টিজানে হামলা হলে যেমন বিদেশি নাগরিকের প্রাণ যায়, তেমনি নিউজিল্যান্ড বা শ্রীলঙ্কার সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ যায় বাংলাদেশের মানুষের। জঙ্গিরা কোথায় বসে তাদের লক্ষ্য ঠিক করছে সেটা আগে জানা যাচ্ছে না। শুধু গোয়েন্দাগিরি করে এই উগ্রবাদ দূর করা যাবে না। এর জন্য দরকার নাগরিক সচেতনতা। পরিবারের রয়েছে এক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা। একজন তরুণ কীভাবে উগ্রবাদী চিন্তায় জড়িয়ে যাচ্ছে তা প্রাথমিকভাবে দেখার দায়িত্ব পরিবারের। পবিবারের অভিভাবকদের উদাসীনতা, পারিবারিক বন্ধন শিথিল হওয়ায় এবং তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় আবিষ্কারের ওপর ভর করে তথ্যসাম্রাজ্যে অবাধ যাতায়াতের সুযোগ তরুণ সমাজকে আকৃষ্ট করছে অ্যাডভেঞ্চারিজমের দিকে। ভোগবাদী মানসিকতার কারণে সবারই চাহিদা বাড়ছে। সুখ-শান্তির সন্ধানে চলছে নতুন নতুন পথে হাঁটার অসুস্থ এক প্রতিযোগিতা। ইহজাগতিক সুখের চেয়ে মৃত্যু-পরবর্তী সুখসন্ধানে আগ্রহী হয়ে ওঠার এক অদ্ভুত মগজ ধোলাইয়ের ফল হচ্ছে সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদ প্রসারের ভিত্তিভূমি।
কাজেই কে কোথায় কীভাবে জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে, আত্মঘাতী হয়ে উঠছে তা আগে থেকে অনুমান করা সহজ নয়। শ্রীলঙ্কা আগে তথ্য জেনে হয়তো সতর্ক হয়নি। এজন্য শ্রীলঙ্কার সরকার বা প্রশাসনকে দায়ী করা যেতেই পারে; কিন্তু পৃথিবীর আর যেসব জায়গায় জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটছে, সেগুলো কেন আগাম সতর্কতা দিয়ে রোখা যায়নি? উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদ মোকাবিলার বিষয়টি বোধহয় আরো একটু বেশি গুরুত্ব দিয়েই ভাবতে হবে। ধর্ম চর্চার সঙ্গে এর সম্পর্কের বিষয়টিও মনে হয় পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে।
শ্রীলঙ্কায় সন্ত্রাসী হামলার পর এই প্রশ্ন সামনে এসেছে যে, বাংলাদেশ কি এ ধরনের হামলার আশঙ্কামুক্ত? অন্যরা কে কী বলছেন সেদিকে নজর না দিয়ে আমরা এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কী বলেছেন, সেদিকে একটু মনোযোগ দিতে পারি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বাংলাদেশেও এ ধরনের (শ্রীলঙ্কায় জঙ্গি হামলা) ঘটনা ঘটানোর অনেক চেষ্টা চলছে। তবে আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করে যাচ্ছে’। প্রধানমন্ত্রী এটাও বলেছেন যে, কে কোথায় সন্ত্রাসী-জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে লিপ্ত, সেটা শুধু গোয়েন্দা সংস্থাই নয়, আমাদের দেশবাসীকেও সতর্ক থাকতে হবে এবং এদেরকে খুঁজে বের করে সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে জানাতে। কোথাও কোনো অস্বাভাবিকতা দেখলে, অপরিচিত মানুষের আনাগোনা দেখলে তা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার নজরে আনার যে আহ্বান প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, তা যথাযথ প্রতিপালন করা গেলে কিছু বিপদ হয়তো এড়ানো সম্ভব। কিন্তু আমরা কি আসলে ততটা সচেতন হতে পেরেছি? লোকালয়েই তো জঙ্গিরা বসতি গড়ার সাহস দেখাচ্ছে।
নাগরিকরা, পরিবারের সদস্যরা যতক্ষণ পর্যন্ত ওয়াচডগের ভূমিকা পালন করতে না পারবে ততক্ষণ পর্যন্ত সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে না। মনে রাখতে হবে, আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির কারণে জঙ্গিরা নিয়ন্ত্রণে আছে, তারা কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। কোনো অঘটন ঘটানোর আগেই ধরা পড়ছে, গ্রেফতার হচ্ছে। তার মানে কিন্তু এই নয় যে, আমাদের দেশে জঙ্গি নেই বা তারা নির্মূল হয়ে গেছে। চিহ্নিত কয়েকজন জঙ্গি এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে আছে। তবে কয়েকটি সফল অভিযানে কয়েকজন জঙ্গির মৃত্যু হয়েছে, সেটা নিশ্চয়ই স্বস্তির দিক।
জুম্মার খুতবায় সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে তরুণ এবং যুবসমাজকে এ সম্পর্কে সতর্ক থাকার জন্য দিকনির্দেশনা দিতে মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দরিদ্র পরিবারের মাদ্রাসাপড়ুয়া ছাত্রদের সহজেই আল্লাহ নামে জীবন উত্সর্গে উদ্বুদ্ধ করা যায় বলে তারা সহজেই বিপথগামী হয় বলে একটি ধারণা প্রচলিত থাকলেও এখন দেখা যাচ্ছে সচ্ছল পরিবারের উচ্চশিক্ষিত সন্তানেরাও জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে হলি আর্টিজানে ইংরেজি মিডিয়ামে লেখাপড়া করা ধনীর দুলালেরা অংশ নিয়েছে। শ্রীলঙ্কাতেও সন্ত্রাসে অংশ নেওয়া সবাই উচ্চ শিক্ষিত এবং ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। তাই সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের বিপদ মোকাবিলায় একমুখী ও একপেশে চিন্তা ও কর্মকৌশল থেকে বেরিয়ে এসে নানাভাবে ভাবতে হবে এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়েই কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
n লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক