আজ ২৮ এপ্রিল, ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস’। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের শাসন ও শোষণ থেকে মুক্ত হয়ে শোষণ ও বঞ্চনামুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণ করে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন ও সুবিচার নিশ্চিত করা। তাই বাঙালি জাতিকে পাকিস্তানের শাসন ও শোষণ থেকে মুক্ত করার পরপরই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনাতেই সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত করার কথা সন্নিবেশ করে দেন। এসব নীতি ও বিধান অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সংবিধানে ধনী বা আর্থিক সামর্থ্যবান নাগরিকদের পাশাপাশি দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত নাগরিকদের ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হলেও স্বাধীনতার পর প্রায় তিন দশকেও দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত নাগরিকদের ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকারে আইনগত সহায়তা প্রদানের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো কাঠামো চালু হতে দেখা যায়নি। ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। তিনি আর্থিকভাবে অসচ্ছল, সহায়-সম্বলহীন এবং নানাবিধ আর্থ-সামাজিক কারণে বিচার পেতে অসমর্থ বিচার প্রার্থী জনগণকে সরকারি খরচে আইনগত সহায়তা প্রদান করার জন্য ২০০০ সালে আইনগত সহায়তা প্রদান আইন প্রণয়ন করে দেন। একই সঙ্গে সরকারি আইনি সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা’ নামে একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু ২০০১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে সাত বছর এই আইনের বাস্তবায়ন কার্যক্রম স্থবির হয়েছিল। এরপর ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বার সরকার গঠন করলে আইনি সহায়তা কার্যক্রমকে গতিশীল ও সেবাবান্ধব করার লক্ষ্যে ঢাকায় জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার প্রধান কার্যালয় স্থাপন করা হয় এবং এর অধীনে প্রত্যেক জেলায় লিগ্যাল এইড অফিস স্থাপনসহ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, চৌকি আদালত এবং শ্রম আদালতে লিগ্যাল এইডের কার্যক্রম চালু করা হয়। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসসমূহে একজন করে সিনিয়র সহকারী জজ/সহকারী জজকে লিগ্যাল এইড অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আইনি সহায়তা কার্যক্রমকে গতিশীল ও দরিদ্রবান্ধব করার লক্ষ্যে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে লিগ্যাল এইড কমিটি গঠন করা হয়। সরকারি আইনি সেবা প্রদান আরও বিস্তৃত ও সহজ করার লক্ষ্যে ২০১৬ সালে টোল ফ্রি জাতীয় হেল্পলাইন ১৬৪৩০ চালু করা হয়। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আইনি সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ২০১৮ সালে বিডি লিগ্যাল এইড অ্যাপ চালু করা হয়। মামলা-জট কমানোর লক্ষ্যে বর্তমানে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসগুলোকে ‘এডিআর কর্নার’ বা ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির কেন্দ্রস্থল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এজন্য ২০১৫ সালে ‘আইনি পরামর্শ ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ বিধিমালা প্রণয়ন করে লিগ্যাল এইড অফিসারদেরকে এডিআর বা বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির আইনি ক্ষমতা প্রদান করা হয়। এ ক্ষমতাকে আরো কার্যকর ও ফলপ্রসূ করার লক্ষ্যে ২০১৭ সালে দেওয়ানি কার্যবিধির সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধন করা হয়।
তৃণমূল পর্যায়ে সরকারি আইনি সেবা পৌঁছে দিতে সারা দেশের ইউনিয়ন লিগ্যাল এইড কমিটিগুলোকে সক্রিয় করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারি আইনি সেবার যাবতীয় তথ্য ও কার্যক্রম ডিজিটাল ডাটাবেজের মাধ্যমে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ‘লিগ্যাল এইড অফিস ম্যানেজমেন্ট সফট্ওয়্যার’ নির্মাণ করা হয়েছে২০১৮ সালে। সফটওয়্যারটি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। সেরা লিগ্যাল এইড অফিস, সেরা প্যানেল আইনজীবী ও সেরা বেসরকারি সংস্থাকে পুরস্কার প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে উত্সাহ-প্রণোদনা হিসেবে।
দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত নাগরিককে সরকারি আইনি সহায়তা কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতন করে তোলার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ২০১৩ সালের ২৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে সরকার ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০’ কার্যকরের তারিখ অর্থাত্ ২৮ এপ্রিলকে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস’ ঘোষণা করে। এরপর থেকে প্রতিবছর ২৮ এপ্রিল জাতীয়ভাবে আইনগত সহায়তা দিবস উদ্যাপন করা হচ্ছে। মূলত ছয়টি উদ্দেশ্যে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস উদযাপন করা হয়। যথা: (১) সরকারি আইনি সেবা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা, (২) দরিদ্র ও অসহায় জনগণের ন্যায়বিচারে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, (৩) জনগণকে আইনগত অধিকার বিষয়ে সচেতন করা, (৪) সরকারি আইন সহায়তা কার্যক্রম আরো কার্যকর, বিস্তৃত ও শক্তিশালী করা, (৫) সরকারি ও বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার (এনজিও) যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে আইন সহায়তা কার্যক্রম আরো গতিশীল ও কার্যকরি করা এবং (৬) লিগ্যাল এইড অফিসারের মধ্যস্থতায় গতানুগতিক আইনি প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা ও দীর্ঘসূত্রতা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে বিকল্প উপায়ে বিরোধীয় পক্ষগণের মধ্যকার বিরোধ বা মামলা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে সম্পন্ন করে লিগ্যাল এইড অফিসকে ‘এডিআর কর্নার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সরকারি আইনি সেবার প্রচার ও প্রসার ঘটানো।
আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০ এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে বর্তমান সরকারের ব্যাপক কার্যক্রম সত্ত্বেও সমাজের পিছিয়ে পড়া একটি জনগোষ্ঠী সরকারি আইনি সহায়তা কার্যক্রম সম্পর্কে এখনো অন্ধকারে আছেন। এরা মূলত তৃণমূল পর্যায়ের নিরক্ষর, অসচেতন, অবহেলিত, সহায়-সম্বলহীন এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষ। তারা আইনগত অধিকার সম্পর্কে ততটা সচেতন নন। আমরা যারা সমাজের সচেতন ব্যক্তি তারাও নানা কারণে ওইসব সহায়-সম্বলহীন এবং সুবিধাবঞ্চিত ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়াই না। এমনকি সরকার যে বিনামূল্যে তাদের আইনি সহায়তা দেয় তাও তাদের জানাই না। ফলে তারা হচ্ছেন শোষিত ও বঞ্চিত। স্মরণ রাখা দরকার যে, পৃথিবীতে চলছে গিভ অ্যান্ড টেক। আমরা যদি তাদের পাশে দাঁড়াই তাহলে তারাও তাদের যতটুকু সামর্থ্য আছে তা নিয়েই আমাদের পাশে দাঁড়াবেন। এর ফলে একদিকে যেমন সমাজে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হবে, অন্যদিকে সামাজিক অন্যায়, অপরাধ ও নৈতিক অবক্ষয় কমে যাবে এবং সামাজিক শান্তি সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।
আমি মনে করি, শুধু সরকারের উদ্যোগে আইনগত সহায়তা প্রদান আইনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এজন্যে সমাজের সকলের বিশেষ করে বিজ্ঞ বিচারক, আইনজীবী, এনজিওকর্মী, সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, জনপ্রতিনিধি এবং মিডিয়াকর্মীর আন্তরিক সহযোগিতা খুবই প্রয়োজন। তাই আসুন আমরা সকলে মিলে আর্থিকভাবে অসচ্ছল, সহায়-সম্বলহীন এবং নানাবিধ আর্থ-সামাজিক কারণে বিচার প্রাপ্তিতে অসমর্থ বিচারপ্রার্থী জনগণের পাশে দাঁড়াই, তাদের সরকারি আইনি সহায়তা কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতন করি।
n লেখক: গবেষক