নারীর নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস নয়

ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত আর সনাতন ধর্মে তো নারীকে বিবেচনা করা হয় সকল শক্তির উত্স হিসেবে। কিন্তু প্রায় ৮৫ শতাংশ মুসলিম আর প্রায় ১২ শতাংশ সনাতনী ধর্মাবলম্বীর বাংলাদেশে বর্তমানে নারীর নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে মোটেও আশাব্যঞ্জক বলা যাবে না। সরকার নারীশিক্ষার হার বৃদ্ধি করতে পারলেও এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে পারলেও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। একটি কন্যাশিশু মায়ের কোল থেকে নামা মাত্রই যৌন হয়রানির শিকার হতে শুরু করে আর এই হয়রানি চলমান থাকে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত।

বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী ২০১৬ থেকে এখন পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হয়েছে প্রায় চার হাজার নারী। যার মধ্যে ২০১৬-তে ধর্ষণের শিকার হয়েছে প্রায় ১০৫০ জন ২০১৭-তে ধর্ষণের শিকার হয়েছে প্রায় ১২৫০ জন, ২০১৮-তে ধর্ষণের শিকার হয়েছে প্রায় ৯৫০ জন এবং ২০১৯-এ এখন পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হয়েছে অর্ধশতাধিক। ধর্ষণের শিকার এই নারীদের মধ্যে ১৫০০ জন শিশু এবং যাদের অর্ধেকের বয়স ১২ বছরের নিচে। 

 এ তো কেবল গণমাধ্যমে প্রকাশিত ধর্ষণের সংখ্যা, কিন্তু লোকলজ্জার ভয়ে প্রকাশিত হয়নি এমন ধর্ষণের ঘটনাও রয়েছে অনেক। এবং যৌন হয়রানি বা ধর্ষণচেষ্টার সংখ্যা তো আরো অনেক বেশি। এ্যাকশন এইডের সর্বশেষ প্রকাশিত জরিপের তথ্য অনুযায়ী যাত্রাপথে প্রায় ৮৮ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়, এদের মধ্যে ৮৬ শতাংশ নারী গণপরিবহনে চালক ও হেলপারের দ্বারা হয়রানির শিকার হয়। এছাড়া কর্মক্ষেত্রে প্রায় ৯৫ শতাংশ নারী এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৯০ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়।  সংবাদমাধ্যমে এসবের কিছু কিছু প্রকাশ পেলেও বেশিরভাগ ঘটনাই থেকে যাচ্ছে লোকচক্ষুর আড়ালে। যৌন হয়রানির বিষয়টা বর্তমানে এমন পর্যায়ে চলে এসেছে যে নারীরাও বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নিতে শুরু করেছে এবং মেনে নিয়েছে যে চলার পথে তাদেরকে হয়রানির শিকার হতেই হবে।

আর যে-সকল ক্ষেত্রে নারীরা প্রতিবাদ করছে কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা চাচ্ছে, মামলা করছে সে-সকল ক্ষেত্রেও তারা কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা এবং বিচার পাচ্ছে না। আইন অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে রায় প্রদানের নিয়ম থাকলেও বিভিন্ন অজুহাতে মামলা দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে। কোনো কোনো মামলা চলে ১০ থেকে ১৫ বছরও। ২০০১ থেকে এখন পর্যন্ত যৌন নির্যাতনে দায়েরকৃত মামলার বিপরীতে রায় প্রকাশের হার মাত্র ৩ দশমিক ৬৬ ভাগ এবং সাজার হার ০.৫০ ভাগ। একটি মামলার ক্ষেত্রে অগ্রগতি ততদিনই হচ্ছে যতদিন বিষয়টি গণমাধ্যমে আলোচিত থাকছে, গণমাধ্যম থেকে বিষয়টি হারিয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে থেমে যাচ্ছে মামলার কার্যক্রম। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ তনু হত্যা মামলা। এছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপরাধী অর্থ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে পার পেয়ে যাচ্ছে আর এর ফলে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে এসকল ঘটনা। এসকল কারণে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে অনেকে অভিযোগও জানাচ্ছেন না। আবার অনেকক্ষেত্রে মামলা করার সময় বারবার ঘটনার বর্ণনা শোনার মাধ্যমে পুলিশ কর্তৃক দ্বিতীয়বার যৌন হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। বেশিরভাগ থানাতেই নেই অভিযোগ গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় মহিলা পুলিশ।

সবমিলিয়ে নারীরা বর্তমানে সব থেকে বেশি অনিরাপদ সময় পার করছে। ঘরের বাইরে তো বটেই নারী তার ঘরেও নিরাপদ নয়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের চাইল্ড এডোলেসেন্ট অ্যান্ড ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রির সহযোগী অধ্যাপক ডা.হেলালউদ্দিন আহমেদের করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে বাংলাদেশে প্রতি চারজনের মধ্যে একজন কন্যাশিশু যৌন হয়রানির শিকার হয় যার মধ্যে ৭৫ ভাগ যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে পরিবারের ঘনিষ্ঠজন, বন্ধু বা আত্মীয়দের মাধ্যমে। অর্থাত্ নারীরা কোথাও নিরাপদ নয়।

 যে দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, স্পিকার নারী, যেই দেশ নারীর ক্ষমতায়নের দিক থেকে অনুকরণীয়, সেই দেশে নারীর এমন নিরাপত্তাহীনতা সত্যিই দুঃখজনক। যদি এই অবস্থার পরিবর্তন না হয় তবে একসময় হয়তো শিক্ষাক্ষেত্র, কর্মক্ষেত্র প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ কমে যাবে। তাই নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ জরুরি। ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রেখে ধর্ষণ চেষ্টাকারীর শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করা উচিত। পত্রিকার তথ্যমতে, ইতিপূর্বেও এধরনের ঘটনা ঘটিয়েছিলেন সিরাজউদ্দৌলা কিন্তু সে সকল ঘটনার বিচার হয়নি, কিছু ঘটনার মীমাংসা হয়েছে স্থানীয়ভাবে আর এরফলেই বেপরোয়া হয়ে ওঠে সিরাজউদ্দৌলা এবং জীবন দিতে হয় নুসরাতকে। এর পাশাপাশি প্রতিটি যৌন হয়রানিরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যদি ২০১৭-তে নুসরাতকে উত্ত্যক্তকারীর শাস্তি হতো তবে হয়তো ২০১৯-এ নুসরাতের সঙ্গে এই ঘটনা ঘটতো না। নিশ্চিত করতে হবে স্বল্পসময়ে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্নের বিষয়টিও যাতে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতায় অপরাধী নতুন অপরাধ সংগঠনের সুযোগ না পায়।

লেখক :শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।