নিছক সম্পদ সৃষ্টি নয়, ভালো থাকার ব্যবস্থা করুন

জগতে আমাদের যা প্রয়োজন, তা শুধু সম্পদ সৃষ্টি নয়। আমাদের ভালো থাকার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সম্পদ হলো মানুষের ভালো থাকার উপযোগী একটি যন্ত্রাংশ মাত্র, গোটা যন্ত্রটা নয়। কিন্তু এই মুহূর্তে মানুষ সম্পদের পিছনে এভাবে ছুটেছে, যেন সেটা একটা ধর্ম। অর্থকে আমরা ভগবান করে তুলেছি আর তার পিছনেই অবিরাম ছুটে চলেছি। অর্থ আসলে একটি উপায় মাত্র, এটিই শেষ কথা নয়। একে আমরা সৃষ্টি করেছিলাম আমাদের কিছু সুবিধার জন্য; কিন্তু সম্পদের পিছনে ছুটে বেড়াতে গিয়ে, আমরা যে গ্রহে রয়েছি তাকেই ধ্বংস করে ফেলছি। অথচ সম্পদ সৃষ্টির কথা ভাবার বদলে আমরা যদি মানব-কল্যাণ সৃষ্টির কথা ভাবি— তাহলে আমরা যা-কিছু প্রয়োজন, যত-দূর প্রয়োজন, তার সবই করে ফেলতে পারি।  

সম্পদ নিয়ে আমাদের ধারণাটাকে পরীক্ষা করে দেখা উচিত। এটা কি শুধুই আরো ঘরবাড়ি, আরো যন্ত্রপাতি, আরো গাড়ি, সবকিছুই আরো বেশি বেশি? কিন্তু আরো বেশি মানেই মৃত্যু। বিশ্বের সবচেয়ে সচ্ছল সমাজগুলোয়— ইউরোপীয় দেশগুলোর কথাই ধরুন না কেন— জনসংখ্যার প্রায় চল্লিশ শতাংশ মানুষই সেখানে মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধির শিকার। বাজার থেকে ওষুধপত্রের ব্যাপারটাকে যদি তুলে নেওয়া যায়, ওই মহাদেশের অর্ধেক মানুষই তবে পাগল হয়ে যাবে। তা মঙ্গলজনক নয়। সাধারণত মানুষ যা কিছু পাওয়ার স্বপ্ন দেখে, তার সবই রয়েছে একজন ইউরোপীয় নাগরিকের। ওখানে সম্পদ আছে; কিন্তু ভালো থাকা নেই। তা হলে ওই সম্পদ দিয়ে কী হবে?

আমি যখন আমেরিকায় যাই, ওঁদের আমি জিজ্ঞেস করি, আপনারা ধ্যান করেন না কেন? সব জায়গাতেই শুধু একটাই উত্তর শুনি, ‘আমাদের তো খরচার বিল মেটাতে হয়।’ আমি ওঁদের বলি, ‘আপনারা এত বেশি বেশি বিল বাড়ান কেন? যদি আপনাদের সারা জীবন ওই বিল মেটাতেই কেটে যায়, তবে অত খরচের খপ্পরে পড়েন কেন? বরং খরচ কমিয়ে আপনারা তো অনেক স্বস্তিতে বাঁচতে পারেন, তাই না? অথচ অতশত বিল মেটাতে গিয়ে আপনাদের সীমাহীন কাজ করতে হচ্ছে। কী লাভ এতে?’ ‘না, গোটা সমাজই তো এমনটা করছে।’ এতে ওদের কিছু যায়-আসে না। অন্য কেউই যেন চালাচ্ছে ওদের। আপনাদের যদি কোনো সুবুদ্ধি থাকে, তবে নিজেকে ততদূর পর্যন্তই চালিত করা উচিত, যতদূর আরামে থাকতে পারেন। অন্যরা করছে বলেই কিছু করার চেষ্টা করবেন না। জীবনকে পাওয়ার ভুল রাস্তা ওটা।

বাইরের পরিস্থিতির দিক বিচার করলে দুজন মানুষের সক্ষমতার মাপ কখনো এক হয় না। তাই আমাদেরই ঠিক করতে হবে, কতটা বাইরের কাজ কিংবা ভিতরের কল্যাণ অথবা সমাজের মঙ্গল আমাদের জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখবে—জীবনকে বা চারপাশের পরিবেশকে এতটুকু নষ্ট না করেই। দুঃখের বিষয়, সেই বুদ্ধিবৃত্তি জগত্ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা শুধুই বাধাহীন ছুটে চলেছি; কিন্তু ওভাবে ছোটা তো পাগলামো। কেননা যে ধরনের জীবনধারাকে দুনিয়া বেছে নিয়েছে, তা স্থায়ী হতে পারে না। পারে শুধু গুঁড়িয়ে যেতে এবং সেই কঠিন পরিণাম দ্বারাই আমাদের শিখতে হবে। হয় আমরা নিজেরাই এটা সংশোধন করে নিই, নয়তো বড় নিষ্ঠুরভাবে প্রকৃতিই সেই বদল এনে দেবে। আমরা বেছে নিতে পারি দুটোর মধ্যে একটাকে—সুবুদ্ধিচালিত জীবন অথবা বুদ্ধিভ্রষ্ট জীবন। ঐশ্বর্য এবং দারিদ্র্যের মধ্য থেকে একটিকে বাছা নয়। বেছে নিতে হবে নিজেদের প্রয়োজন ও তার তৃপ্তির জন্য একটি সুযুক্তির পথ অথবা একটি হুজুগের পথকে।  

n সৌজন্যে :ঈশা ফাউন্ডেশন