ইসলামে অসিয়ত সম্পর্কিত বিধান

অসিয়ত এর আভিধানিক অর্থ আদেশ দান, ভার অর্পণ। এটি অসিয়তকারীর জীবদ্দশায় বা তার মৃত্যুর পরে পালনের জন্যও হতে পারে। শরীয়তের পরিভাষায় অসিয়ত বলতে কোন ব্যক্তি তার মৃত্যুও পরবর্তীকালের জন্য কাউকে কোন কিছুর মালিকানা প্রদানার্থে নির্দেশ দান করাকে বুঝায়। অসিয়ত কোন সম্পত্তি বা সম্পত্তির উপযোগ হতে পারে। জীবনের ঘটে যাওয়া ত্রুটি বিচ্যুতির প্রতিকার করার আখেরী সুযোগ এ অসিয়তের বিধান এবং সেই সঙ্গে এটা উত্তম কাজ করে বিদায় নেওয়ার এক সুন্দরতম ব্যবস্থা বটে। রসূল (স.) ইরশাদ করেন- আল্লাহ তায়ালা তোমাদের প্রতি তোমাদের এক-তৃতীয়াংশ সম্পদ দ্বারা দাক্ষিণ্য প্রদর্শন করেছেন, যাতে তোমরা তোমাদের জীবনের শেষ কালে বিগত পুণ্যের ওপর অধিকতর পুণ্য অর্জন করতে পার। সুতরাং যেখানে ইচ্ছা তোমরা এ সম্পদ ব্যয় কর। অসিয়ত সংঘটিত হয় প্রস্তাব ও গ্রহণের মাধ্যমে। অসিয়তকারী প্রস্তাব করবে এবং যার জন্য অসিয়ত করা হয় সে তা কবুল বা গ্রহণ করবে। অসিয়তের প্রস্তাব গ্রহণের প্রকৃত সময় হচ্ছে অসিয়তকারীর মৃত্যুর পর। তার মৃত্যুর আগে অসিয়তকৃত ব্যক্তি গ্রহণ বা প্রত্যাখান যাই করুক তা ধর্তব্য নয়। কাজেই অসিয়তকারীর মৃত্যুর আগে সে যদি তা প্রত্যাখান করে তবুও মৃত্যুর পর তা তার গ্রহণ বৈধ হবে। অনুরূপ অসিয়তকারীর মৃত্যুর পূর্বে সে গ্রহণ করলে মৃত্যুর পর তা প্রত্যাখ্যান করতে পারবে। অসিয়তকৃত ব্যক্তি কর্তৃক গ্রহণ করে নেওয়ার পর অসিয়ত চূড়ান্ত ও অনিবার্য হয়ে যায় এবং অসিয়তকৃত বস্তুতে তার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। অসিয়তকৃত ব্যক্তি প্রত্যাখান করলে অসিয়ত বলবত্ থাকে না। কাজেই একবার প্রত্যাখান করে ফেললে তারপর আর তা গ্রহণ করার অধিকার থাকে না। “হে মুমিনগন! তোমাদের কারো যখন মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন অস্যিয়ত করার সময়তোমাদের মধ্য হতে দু’জন ন্যায় পরায়ন লোকে সাক্ষী রাখবে” সূরা মায়েদা-১০৬। অসিয়ত বৈধ হওয়ার একটি প্রকৃষ্ট প্রমাণ হযরত সাদ ইবনে আবি আক্কাস (রা.) এর অসিয়তের ঘটনা। তিনি অসুস্থ ছিলেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ (স.) তাঁর শয্যাপাশে উপস্থিত হলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি আমার সমস্ত সম্পত্তি অসিয়ত করতে চাই। নবী করীম (স.) বললেন, না। তিনি বললেন, তাহলে দুই-তৃতীয়াংশ? নবী করীম (স.) বললেন, না। তিনি বললেন, তাহলে এক-তৃতীয়াংশ? নবী করীম (স.) বললেন, এক-তৃতীয়াংশ। তুমি তোমর ওয়ারিশদেরকে পরমুখাপেক্ষী রেখে যাওয়ার চেয়ে তাদেরকে সম্পদশালী রেখে যাওয়া উত্তম। যার জন্য অসিয়ত করা হয় সে যখন অসিয়ত কবুল করবে তখন অসিয়তের বস্তুতে তার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে, তা সে হস্তগত করুক আর নাই করুক। অসিয়ত যদি বস্তু সম্পর্কে হয়, যেমন জমি, ঘর-বাড়ি, গবাদিপশু ইত্যাদি ইচ্ছামত ব্যবহার করতে পারে বা দান খয়রাতও করতে পারবে। অসিয়তকারীর মৃত্যুর পর অসিয়তের বস্তুতে কিছু বৃদ্ধি ঘটলে যেমনঃ গাছে ফল ধরল, গাভী বাচ্চা দিল ইত্যাদি তাও অসিয়তের অন্তর্ভুক্ত হবে। যদি বস্তুর উপকার-উপযোগ সম্পর্কে অসিয়ত করা হয় তবে কোন মেয়াদের উল্লেখ না থাকলে জীবনভর এবং মেয়াদের উল্লেখ থাকলে মেয়াদ পর্যন্ত তার ভোগাধিকার লাভ করবে। কিন্তু বস্তুর মালিকানা থাকবে ওয়ারিশদের। যেমন ওসিয়ত করা হল, অমুক বাড়িটিতে যেন অমুককে বাস করতে দেওয়া হয়। তবে ঐ ব্যক্তি যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন সে উক্ত বাড়িতে বসবাস করতে পারবে। তার মৃত্যুর পর তার ওয়ারিশগণ সেথায় বাস করতে পারবে না বরং বাড়িটি কাউকে দেওয়ার অসিয়ত থাকলে সে ব্যক্তির হাতে হস্তান্তর করা হবে অন্যথায় অসিয়তকারীর ওয়ারিশদের কাছে প্রত্যার্পিত হবে। যে বস্তু সম্পর্কে অসিয়ত করা হয় তা মাল বা এ জাতীয় কোন কিছু হতে হবে। অসিয়তকৃত বস্তু কেবল মাল হলেই চলবেনা বরং তার মূল্যও থাকতে হবে। কোন মুসলমানের পক্ষে মাদক দ্রব্যর অসিয়ত বৈধ নয়। মৃত ব্যক্তির জন্য অসিয়ত করা বৈধ নয়। ওয়ারিশদের জন্য অসিয়ত করা বৈধ নয়, তবে অন্য সব ওয়ারিশের অনুমতি থাকলে তা বৈধ হবে। হত্যাকারীর জন্য অসিয়ত করা জায়েজ নেই। (চলবে)