সংস্কৃতিকে অবলম্বন করেই অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০১২, ২২:১৪
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসর বসেছে রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বিকাশে এটি একটি বিশাল পদক্ষেপ। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন ও ভারতের সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমীর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ কনসার্ট সারাদেশের সঙ্গীত পিপাসুদের আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। এই আয়োজন নিয়ে আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের লিটুর। জানতে চেয়েছিলাম তার শিল্পের প্রতি আগ্রহ ও তার প্রসারে পরিকল্পনার কথা। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন
আসিফুর রহমান সাগর
প্রশ্ন : শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে এটি একটি বিশাল আয়োজন। আপনাদের লক্ষ্য কী?
আবুল খায়ের লিটু :সম্ভবত এশিয়ার সবচেয়ে বড় আয়োজন। এত বড় আয়োজন বাংলাদেশে এর আগে আর কখনোই হয়নি। আমাদের উদ্দেশ্য বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহী করে তোলা। পাশাপাশি শ্রোতারও আগ্রহ সৃষ্টি। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে বাংলাদেশে পরম্পরা ভিত্তিক চর্চাকে প্রতিষ্ঠিত করা। বাংলাদেশে সঙ্গীতের প্রসারে ছায়ানটের অবদান সবচেয়ে বেশি ও বিশাল। বাংলাদেশে সঙ্গীতের প্রসারে তারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছে। কিন্তু সারাদেশে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের প্রসার ঘটছে না। আমরা সেই লক্ষ্যেই কাজ করছি।
প্রশ্ন : পদক্ষেপগুলো কী কী?
উত্তর : ভারতের সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমীর (এসআরএ) সঙ্গে বেশ আগে থেকেই আমরা কাজ শুরু করেছি। বাংলাদেশের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বৃত্তি দিয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রায় বারো বছর ধরে এ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছি আমরা। এখন এসআরএ থেকে বিশ জন সঙ্গীতগুরু বাংলাদেশে এসে শিক্ষা দেবেন। এখানে শিষ্য পরম্পরা সৃষ্টি হবে। আগামী দশ বছরে যদি আমরা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে দশ জনকেও তৈরি করতে পারি—সেটা একটা বড় পাওয়া হবে। আমাদের মূল লক্ষ্য এটাই। এর আগে থেকেই আমরা দেশের প্রতিভাবান ও গুনী শিল্পীদের অ্যালবাম প্রকাশ করেছি। তরুণ সঙ্গীতশিল্পীদের প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে আমাদের আরেকটি প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল মিউজিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
প্রশ্ন : বেঙ্গল ফাউন্ডেশন তো বাংলাদেশের শিল্পকলা বিশেষ করে চিত্রকর্মের প্রসারে বেশি কাজ করে থাকে। অন্যান্য মাধ্যমেও আপনাদের পদচারণা রয়েছে।
উত্তর :চিত্রকর্মে আমরা বাংলাদেশসহ বর্হিবিশ্বে একটি অবস্থান সৃষ্টিতে কাজ করে চলেছি। বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টস এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ করছে। ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয় ও গুলশানে বেঙ্গর লাউঞ্জে দেশের ও বিদেশের শিল্পীদের নিয়মিত প্রদর্শনীর আয়োজন করা হচ্ছে। বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শনীগুলোয় বাংলাদেশের শিল্পীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। আমরা চাই, আমাদের শিল্পের এই মাধ্যমটি সারা পৃথিবীতে তার অবস্থান তৈরি করুক। আমাদের শিল্পীরা খুব ভালো কাজ করেন। কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তাদের কাজ বিশ্বের শিল্পরসিকদের কাছে পৌঁছাতো না। আমরা সেই উদ্যোগটাই নিচ্ছি। খুব দ্রুত আমরা বিশ্বের সবচেয়ে বড় আর্ট মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছি। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের প্রায় সাড়ে সাত হাজার চিত্রকর্ম সংগ্রহে রয়েছে। এর মধ্য থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার চিত্রকর্ম এই মিউজিয়ামে দান করেছি। দেশের শিল্পকলার ধারা, গতি-প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করা হবে এই মিউজিয়ামে। এছাড়া বিশ্বখ্যাত শিল্প প্রকাশনা সংস্থা স্ক্রিরার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছি আমরা। বাংলাদেশের শিল্পী ও শিল্প সম্পর্কিত বই এখন সারাবিশ্বের বড় শহরগুলোয় পাওয়া যাচ্ছে। বহির্বিশ্ব বাংলাদেশের চিত্রকলা সম্পর্কে জানতে পারছে।
প্রশ্ন : সাহিত্যের ক্ষেত্রেও তো আপনার বেশ কিছু পদক্ষেপ রয়েছে।
উত্তর :আমরা বেশ কিছু পত্রিকা প্রকাশ করি। ‘যামিনী’, ‘কালি ও কলম’, ‘বেঙ্গল বারতা’, ‘চারদিক চারবেলা’, ‘আইস টুডে’সহ আরও প্রকাশনা রয়েছে। প্রতিবছর তরুণ লেখকদের মানসম্মত লেখাকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। সবই বাংলার চিরায়ত সাহিত্য ধারাকে তুলে ধরার জন্যই।
প্রশ্ন : আপনি তো বাংলাদেশের শিল্পের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠেছেন। বহির্বিশ্বে আপনাকে কেন্দ্র করেই আমাদের চিত্রকর্ম, সঙ্গীতের প্রসার ঘটছে।
উত্তর :দেখুন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে হয়তো অনেক দেশের তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমাদের বিশাল অর্জন রয়েছে। রয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যই আমাদের প্রধান শক্তি। একে অবলম্বন করেই বিশ্বে বাংলাদেশ পরিচিত হয়ে উঠতে পারে। সংস্কৃতিকে অবলম্বন করেই অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। শুধু তাই এই সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করেই বিদেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় হবে। ভারতের মানুষের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্কের বন্ধন সৃষ্টিতে সংস্কৃতিই তো প্রধান অবলম্বন। যা প্রতিবেশী দুই রাষ্ট্রকে মিলতে উপলক্ষ এনে দেয় বার বার।
প্রশ্ন : শিল্পের প্রতি এই আগ্রহ জন্মালো কীভাবে?
উত্তর :আমার চাচা জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে এর পেছনে। তার সাহচর্য আমাকে শিল্পের প্রতি আকৃষ্ট করে তুলেছে। এছাড়া ছোটবেলা থেকেই শিল্পচার্য জয়নুল আবেদিনের সংস্পর্শ পেয়েছি। শিল্পী এস এম সুলতান দীর্ঘদিন আমাদের বাসার নিচতলায় থাকতেন। তার মতো শিল্পীর সান্নিধ্য পেয়েছি। এসবের সংস্পর্শে আমার স্বাভাবিক আগ্রহের ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। আমাকে তারা চির ঋণী করে গেছেন।
প্রশ্ন : তারপরও এত অর্থ লগ্নী, একটা ঝুঁকি তো থাকেই।
উত্তর :ভালো কাজ করতে চাই। হয়তো এ কারণে বেঙ্গল গ্রুপের অন্যান্য ব্যবসায় মন দিতে পারি না। কিন্তু এটা জানি ভালো কাজ করলে তার প্রতিদান পাওয়া যায়। অবশ্য আমি একা এ কাজ করতে পারতাম না। এর পেছনে অনেক মানুষের সহযোগিতা পেয়েছি। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লূভা নাহিদ চৌধুরী যোগ্যতার সঙ্গে এসব কাজ পরিচালনা করে চলেছেন। তিনি এবং তার দল ছাড়া এর কিছুই করা সম্ভব হতো না।
প্রশ্ন : আপনার আগামীর প্রত্যাশা কী?
উত্তর :ভালো কাজ করলে সহযোগিতার অভাব হয় না। আমাদের যে কর্মকাণ্ড তা সবই বাংলাদেশের মাটি, ঐতিহ্যকেন্দ্রিক। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের চিত্রকর্মের একটি গতিশীল বাজার সৃষ্টি করা। ইচ্ছা আছে নিউইয়র্ক, লন্ডন, মেলবোর্ন, সিঙ্গাপুরে কালচারাল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা। মূল লক্ষ্য বহিবির্শ্বে বাংলাদেশের সংস্কৃতির অবস্থান তৈরি।