আদালতের নির্দেশ অমান্য নদীতীর দখল চলছেই

আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে রাজধানীর পার্শ্ববর্তী বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যার তীরে দখল বাণিজ্যের পাশাপাশি রমরমা হয়ে উঠেছে বালু ব্যবসা। বহাল তবিয়তে আছেন নদীর তীরে অবৈধভাবে গড়ে উঠা বালু ব্যবসায়ীরাও। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় নদী তীরে নিরাপদে দখল ও বালু বাণিজ্য চলছে। বুড়িগঙ্গা নদীর পোস্তগোলা শ্মশানঘাট এলাকায় তীর ভূমির প্রায় তিন একর জায়গা দখল করে তা বালু ফেলে ভরাট করা হয়েছে। এখন সরকারি জমি প্লট তৈরি করে বিক্রির পাঁয়তারা চলছে। একইভাবে পোস্তগোলা থেকে শ্যামপুর হয়ে ফতুল্লা পর্যন্ত নদীর তীর বালু ফেলে ভরাট করা হয়েছে। বালু ব্যবসার নামে এখানে কয়েকশ ইট ও বালুর অবৈধ গদি গড়ে তোলা হয়েছে। নদীর অপর প্রান্ত কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়া, হাসনাবাদেও চলছে একই অবস্থা। ফলে বালু ও ইটের ভাঙা অংশে নদীর তলদেশ ক্রমশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। অবৈধ দখলকাররা সুকৌশলে নদী ভরাট করে চলেছে। মাঝে-মধ্যে বিআইডব্লিউটিএ অভিযান চালিয়ে কিছু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করলেও ভরাটকৃত মাটি ও বালু সরানোর ব্যবস্থা না থাকায় ফের দখলে চলে যাচ্ছে নদীর তীরভূমি। অভিন্ন চিত্র দেখা গেছে তুরাগ তীরেও। গাবতলী থেকে সিন্নিরটেক হয়ে আশুলিয়া পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তীর ভরাট করে দেদারসে চলছে অবৈধ বালু ব্যবসা। বালু ব্যবসায়ীরা ছোট-বড় শতাধিক বালুর গদি গড়ে তুলেছেন। বালু ফেলে নদীর প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে মূল নদী সরু হতে হতে তা অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। সমপ্রতি উচ্চ আদালত নদী দখল ও নদীর তীরে বালু ব্যবসা বন্ধের কঠোর নির্দেশ দিলেও তা মানা হচ্ছে না। বালু ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লিজ নিয়ে তারা বালু ব্যবসা করছেন। বিআইডব্লিউটিএ-র চেয়ারম্যান ড. শামছুদ্দোহা খোন্দকার লিজ দেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে ইত্তেফাককে বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক শিগগিরই বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা তীরে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। নদী দখল ও দূষণ সম্পর্কে বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনা ও পরিবেশবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, নদী রক্ষায় উচ্চ আদালতের ঐতিহাসিক রায় বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য অত্যাবশ্যক। নদী রক্ষা করতে না পারলে পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। আর পরিবেশ ধ্বংস হলে মানুষও বাঁচবে না। তিনি বলেন, প্রতি বছর ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর তিন মিটারেরও বেশি নিচে নেমে যাচ্ছে। এতে করে বিরাট প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূমিকম্পের আশংকা রয়েছে। তিনি যেকোনো মূল্যে নদী ও জলাশয় রক্ষায় সরকারের প্রতি কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। এদিকে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার শীতলক্ষ্যার তীর দখল করেও বালুর ব্যবসা অব্যাহত রয়েছে। হাইকোর্টের নির্দেশ উপেক্ষা করে কয়েকটি সিন্ডিকেট এ অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ৬ নভেম্বর হাইকোর্ট কাঁচপুর সেতু ও তুরাগ নদ দখল করে মিরপুরের সিন্নিরটেক এলাকায় সবধরনের বালু ব্যবসায়ীকে তিনদিনের মধ্যে উচ্ছেদ করতে নির্দেশ দেয়। একইসঙ্গে ১৫ দিনের মধ্যে তীর থেকে বালু অপসারণ করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতেও নির্দেশ দেয় আদালত। কিন্তু এ নির্দেশের পরও অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। আগের মতোই সরবে চলছে অবৈধ বালুর ব্যবসা। সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল আলম মোল্লা ইত্তেফাককে বলেন, ‘বালু ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করতে আদালতের নির্দেশনা পত্রিকায় পড়েছি। লিখিত কোনো আদেশ আমাদের কাছে এখনো আসেনি। লিখিত আদেশ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা তীরে সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, কাঁচপুর ব্রিজের নিচে বা ওপরে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে শীতলক্ষ্যা দখল ও ভরাটের চিত্র। যতদূর চোখ যায়, কেবল তীর জুড়ে বালু-সিলিকনের ঢিবি। কার্গো থেকে বালু নামছে এবং ট্রাকে করে চলে যাচ্ছে। লোড-আনলোডের সময় নদীর ভেতরে গিয়ে পড়ছে মাটি ও বালু। কাঁচপুর ব্রিজের গোড়ার প্রথম পিলার থেকেই নদীর সীমানা। এক দশক আগেও গোড়া দিয়ে নৌযান চলত, কিন্তু এখন এমনভাবে ভরাট হয়েছে যে ৩ নম্বর পিলার পর্যন্ত সমতল হয়ে গেছে। এছাড়া ভরাটকারী দখলদাররা সেখানে গড়ে তুলেছে গদিঘর, দোকানঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পাকা দেয়ালসহ নানা অবকাঠামো। অবৈধ দখলদারদের ব্যবসার সুযোগ করে দিতে নির্মাণাধীন ওয়াকওয়ের কাঁচপুরের শিমরাইল এলাকায় তীর থেকে বালু ওঠানো নামানোর জন্য ১৫ থেকে ২০টি জায়গায় ২০ ফুট করে ফাঁকা রাখা হয়েছে। এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রফিক অ্যান্ড সন্স, যমুনা ট্রেডার্স, হ্যাপি ট্রেডার্স, এসএম বিডি বিজনেস, মুক্তার এন্টারপ্রাইজ, আমিন এন্টারপ্রাইজ, বিসমিল্লাহ ট্রেডার্স, আমানত শাহ ট্রেডার্স, তাইয়্যেবা এন্টারপ্রাইজ, রানা এন্টারপ্রাইজ, নূর এন্টারপ্রাইজ, একুশে বিল্ডার্স, আল-আমিন এন্টারপ্রাইজ, কাদের অ্যান্ড সন্স ও নূরজাহান এন্টারপ্রাইজ, বাংলাদেশ পেপার মিল, আরব এন্টারপ্রাইজ, নদী ট্রেডিং, ফ্রেন্স এন্টারপ্রাইজ, হাসান ট্রেডার্স, রাসেল স্টিল, সোয়েব ভোল্টিং, রোজ ট্রেডিং, হাসিব এন্টারপ্রাইজ, অ্যাসোসিয়েট ট্রেডিং ও মনোয়ারা বিল্ডার্স গদিঘর শীতলক্ষ্যার তীরে বালুর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। এরাই নদী ভরাট ও দখল করে রেখেছে। এলাকাবাসী জানায়, সিদ্ধিরগঞ্জের শীতলক্ষ্যার ওপর কাঁচপুর ব্রিজের দক্ষিণ অংশের সিন্ডিকেটের প্রধান ওলামা লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আমির হোসেন ভাণ্ডারী। কাঁচপুর ব্রিজের ল্যান্ডিং স্টেশনসহ (ল্যান্ডিং স্টেশনে কাঁচপুর ব্রিজের নিচসহ উত্তরদিকে তাজ জুট পর্যন্ত) জবর দখলে রেখেছে ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেন, তার বড় ভাই নূরুল ইসলাম ওরফে খান এবং তাদের সমর্থকরা। উত্তর অংশ সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি নজরুল ইসলাম ও তার ভাই মনিরুল ইসলাম মনির, জহিরুল ও তাদের চাচাতো ভাই শ্রমিক লীগের সাবেক সভাপতি আবদুল মতিন মাস্টারের ছেলে হাসানের দখলে রয়েছে। একই এলাকার চার সহোদর রেজাই মেম্বার, শাজাহান, আলমগীর, জাহাঙ্গীর এবং রেজাই মেম্বারের ছেলে সোহেল, সিরাজুল ইসলাম সিরাজ, বাদল, রিপন, সিরাজুল ও হাবিব প্রত্যেকের বালু ব্যবসার গদি রয়েছে। এ বিষয়ে যুবলীগের সিদ্ধিরগঞ্জ থানা সভাপতি নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা এখানে ব্যবসা করি, কোনো চাঁদাবাজি করি না। আমাদের বালুর গদিতে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। অবৈধ বালু ব্যবসার বিষয়ে জানতে ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ-র চেয়ারম্যান ড. শামছুদ্দোহা খোন্দকার ইত্তেফাককে বলেন, আমরা নদীর তীর থেকে অবৈধ বালুর ব্যবসা অপসারণ শুরু করেছি। আদালতের নির্দেশনার পর আমাদের এ উচ্ছেদ অভিযানে আরও গতি বাড়বে। যেকোনো মূল্যে নদী তীর থেকে সবধরনের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে।