টাকা ফেরত না দিতে দুই স্কুলের টালবাহানা
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০১২, ২২:৩৬
ভর্তির সময় আদায় করা অতিরিক্ত ফি ফেরত না দিতে দুটি স্কুল কর্তৃপক্ষ নানা টালবাহানা শুরু করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্কুলগুলো হলো:আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ এবং মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে টাকা ফেরত বা পরবর্তীতে সমন্বয়ের জন্য চূড়ান্ত নোটিস, এমনকি পরে আরো ১৫ দিন সময় দেয়া হলেও তা আমলে নিচ্ছে না ওই দুটি স্কুল। উল্টো নানা অযুহাত দেখিয়ে ও মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের দুর্বলতার সুযোগ খুঁজে তারা টাকা ফেরত না দেয়ারই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ কর্তপক্ষ আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের বেতনের সঙ্গে ওই টাকা সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এ ব্যাপারে গঠিত কমিটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নীতিমালা অমান্য করে রাজধানীর নামকরা ওই তিনটি বিদ্যালয় চলতি শিক্ষাবর্ষে ভর্তির সময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ৯ কোটি ৩১ লাখ ২৮ হাজার ১০০ টাকা আদায় করে। এর মধ্যে মনিপুর স্কুল পাঁচ কোটি ২৩ লাখ ৭৬ হাজার ১০০ টাকা, আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ তিন কোটি ৩৯ লাখ ৩৪ হাজার ৯০০ টাকা এবং ভিকারুননিসা স্কুল অতিরিক্ত ৬৮ লাখ ১৭ হাজার ১০০ টাকা আদায় করে। এ নিয়ে বিতর্ক উঠলে ভর্তির সময় নেয়া এই অতিরিক্ত অর্থ ফেরত অথবা বেতনের সঙ্গে সমন্বয় করতে নির্দেশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, অতিরিক্ত টাকা ফেরত আনার বিষয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় নমনীয় নীতি অবলম্বন করছে। এর মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা ফেরত আনা সম্ভব হবে না। রাজধানীর নামকরা ওই দুই প্রতিষ্ঠান স্থানীয় দুই সংসদ সদস্য নিয়ন্ত্রণ করছেন। এ কারণে অতিরিক্ত টাকা ফেরত আনতে মন্ত্রণালয়কে কঠোর নীতি অবলম্বন করতে হবে। ভিকারুননিসা নূন স্কুলের অধ্যক্ষ মঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মেনে আগামী বর্ষের জানুয়ারি থেকে শিক্ষার্থীদের বেতনের সাথে ওই টাকা সমন্বয় করা হবে। এ সংক্রান্ত চিঠি আমরা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক অধিদপ্তরে পাঠিয়েছি। কত টাকা সমন্বয় করা হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ শাহান আরা বেগম ইত্তেফাককে বলেন, মন্ত্রণালয়ের সাথে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ১৫ দিন সময় বাড়ানো হয়। কিন্তু এ বিষয়ে কোন লিখিত চিঠি আমাদের দেয়া হয়নি। এ কারণে কোন জবাব দেয়া যাচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, যেহেতু অতিরিক্ত টাকা নতুন শাখা হিসেবে মুগদা শাখার পেছনে খরচ হয়ে গেছে, তাই এবার আর টাকা ফেরত দেয়া সম্ভব নয়।
অধ্যক্ষের এ বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, প্রতিষ্ঠানের মুগদা শাখা ২০১১ সালের ৮ জুন প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করেন। ২০১১ শিক্ষাবর্ষ থেকেই ক্লাস শুরু হয়। তবে ২০১২ সালের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হবে কেন? অভিভাবকরা টাকা ফেরত চায় বলে তিনি দাবি করেন ।
অতিরিক্ত টাকা ফেরত দেয়ার বিষয়ে মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ফরহাদ হোসেন বলেন, আমরা ভর্তির সময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোন অতিরিক্ত টাকা আদায় করিনি। তাই টাকা ফেরত দেয়ার প্রশ্নই আসে না। তিনি বলেন, ভর্তি নীতিমালার প্রজ্ঞাপনে নিম্নমাধ্যমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তির কথা বলা হয়েছে। সেখানে প্রথম শ্রেণীর কথা বলা হয়নি। প্রথম শ্রেণীতে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়েছে কী না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রথম শ্রেণীর ভর্তিতে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়েছে। তবে নীতিমালায় প্রথম শ্রেণীর ভর্তির বিষয়টি বলা হয়নি। তাই টাকা ফেরত দেয়া হবে না। যদিও এর আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাত্কারে অধ্যক্ষ ফরহাদ হোসেন অতিরিক্ত ফি নেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
অধ্যক্ষ ফরহাদ হোসেনের প্রশ্নের বিষয় জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক অধিদপ্তরের (মাউশি) এক কর্মকর্তা বলেন, টাকা ফেরত না দিতে এখন নানা বাহানা খুঁজছে স্কুলটি। মন্ত্রণালয় কঠোর হলে টাকা ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে স্কুলটি।
মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক নোমান উর রশীদ বলেন, অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো টাকা ফেরত না দিলে আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
প্রসঙ্গত সম্প্রতি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ২০১২ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তির সময় নেয়া অতিরিক্ত অর্থ ফেরত অথবা বেতনের সঙ্গে সমন্বয় করতে নির্দেশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের পরও এই অর্থ ফেরত না দিলে গত ২ জুলাই সংসদে শিক্ষামন্ত্রী জানান, শিক্ষার্থী ভর্তির সময় নেয়া অতিরিক্ত অর্থ আগামী এক মাসের মধ্যে ফেরত না দিলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিল করা হবে। গত ৪ জুলাই এ সংক্রান্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে অতিরিক্ত ফি নেয়ার বিষয়টি প্রকাশ করে। এর পর টাকা ফেরত দেয়ার জন্য কয়েকবার নোটিসের পর চূড়ান্ত নোটিস দেয়া হয়। এই নোটিসের পরও টাকা ফেরত না দেয়ায় গত ১১ নভেম্বর আবারো ১৫ দিন সময় বাড়ানো হয়।