নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে বিএনপির প্রশ্ন

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে প্রধান বিরোধীদল বিএনপি। বিএনপি বলেছে, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। সংলাপ বর্জনের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত চিঠিতে বিএনপি এই প্রশ্ন তুলেছে। চিঠিতে বিএনপি বলেছে, বর্তমান সংবিধানের বিধান অনুযায়ী সংসদ বহাল রেখে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচিতরা দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবেন না। এই পরিস্থিতিতে ওই সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে দিতে পারে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনকে (সিইসি) দেয়া বিএনপির চিঠিতে এই আশংকা ব্যক্ত করা হয়েছে। বিএনপি অভিযোগ করেছে, কমিশনের দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করার জন্য সংবিধানের ১২০ এবং ১২৬ অনুচ্ছেদে সরকারের যে দায়িত্বের বিধান আছে তা বহুবার লঙ্ঘিত হয়েছে। কমিশনার চাহিদা মোতাবেক সরকার নির্বাচনকালে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সংবিধান লঙ্ঘন করলেও কমিশনের পক্ষে কিছুই করা সম্ভব হয়নি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, সাংবিধানিক যত বিধানই নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতার কথা ঘোষণা করুক না কেন ক্ষমতাসীন সরকারের অসীম ক্ষমতার প্রভাব কমিশনের শেষ সাংবিধানিক স্বাধীনতাকে সীমিত করে ফেলে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনার জন্য ৫ লক্ষেরও অধিক জনবলের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে কমিশনের কয়েকশ কর্মকর্তা ও কর্মচারী ছাড়া বাকি সকলেই সরকারের বা সরকার নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন অফিস ও সংস্থা থেকে যাদের কমিশনের কাছে কোন দায়বদ্ধতা নেই এবং যারা সরকারের ইচ্ছা পূরণে সদা আগ্রহী। এই পরিস্থিতিতে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন ছাড়া দলীয় সরকারের অধীনে সংবিধানে ১১৮(৪) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত কমিশনের স্বাধীনতার ওপর নির্ভর করে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। চিঠিতে বলা হয়, গত ৩০ সেপ্টেম্বরের গাজীপুর-৪ আসনের উপ-নির্বাচনে সরকারি দলের মনোনীত প্রার্থী জয়লাভ করে এবং নির্বাচন কমিশন এ নির্বাচনকে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ বলে দাবি করে। অভিজ্ঞ মহলের ধারণা এই নির্বাচনে ২০ থেকে ২৫ ভাগের বেশি ভোটার ভোট কেন্দে আসেনি। অথচ কমিশনের হিসাব প্রদত্ত ভোটের হার ৪৩ শতাংশ। এই ভোটারবিহীন একতরফা নির্বাচনকে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন দাবি হলে কমিশনের ভূমিকা সম্পর্কে জনমনে প্রশ্ন জেগেছে। চিঠিতে আরো বলা হয়, দলীয় সরকার ক্ষমতায় রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে একথা জনগণ বিশ্বাস করে না। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল না করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে না। উপরন্তু বর্তমান জাতীয় সংসদ বহাল থাকা অবস্থায় আরো একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যে ব্যবস্থা সংবিধানের ১২৩(৩) অনুচ্ছেদে বর্তমান সরকার সন্নিবেশিত করেছে তা সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথে আর একটি প্রধান অন্তরায়। এই দুরভিসন্ধিমূলক বিধান ব্যবহার করে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল সরকার বাতিল করে দিতে পারে। এ জাতীয় বিধান অন্য কোন গণতান্ত্রিক দেশে সংবিধানে আছে বলে আমাদের জানা নেই। প্রসঙ্গত সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে ১২৩(৩)-এ উল্লেখ আছে, ‘সংসদ-সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে। উপধারা-(ক) মেয়াদ-অবসানের কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাংগিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নববই দিনের মধ্যে; এবং (খ) মেয়াদ-অবসান ব্যতীত অন্য কোন কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাংগিয়া যাইবার পরবর্তী নববই দিনের মধ্যে:তবে শর্ত থাকে যে, এই দফার (ক) উপ-দফা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ, উক্ত উপ-দফায় উল্লিখিত মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত, সংসদ সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করিবেন না।’ বিএনপির চিঠিতে ইভিএমে আপত্তি জানিয়ে বলা হয়, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার নিয়ে দেশে-বিদেশে অনেক বিতর্ক হয়েছে এবং হচ্ছে। অনেক দেশেই ভোট গ্রহণের এই যান্ত্রিক ব্যবস্থার বিশ্বস্ততা সম্পর্কে বিভিন্ন আপত্তি উঠেছে এবং এই যন্ত্রটি দূর থেকেও নিয়ন্ত্রণ করে ফলাফল বদলে দেয়া যায় বলে তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব বিবেচনায় যেসব দেশে এই ইভিএম প্রচলন করা হয়েছিল তারা তা থেকে সরে আসছে। কোন কোন দেশে এটা ব্যবহারের বিরুদ্ধে আদালতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু বর্তমান কমিশন এই মেশিন ব্যবহার করা সমপর্কে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। তাতে এটি স্পষ্ট যে সরকার এখনো এই ইভিএম প্রচলন করতে আগ্রহী। চিঠিতে আরো বলা হয়, ‘ছলে বলে কৌশলে যেকোনভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ একটি দলীয় সরকারের সীমাহীন ক্ষমতা ও প্রভাবের মুখে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক স্বাধীনতা যে কত অর্থহীন তা পূর্বেকার কমিশন কিছুটা হলেও উপলব্ধি করেছিল এবং পূর্বেকার কমিশনের কেউ কেউ এখনো তা প্রকাশ করে যাচ্ছেন। বর্তমান নির্বাচন কমিশন এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে তাদের দায়িত্ব পালনে সচেষ্টা হলে তারা জনগণের সমর্থন লাভে সক্ষম হবে। জাতীয় সংসদের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পর্কিত উপরোল্লিখিত সমস্যা ও বিষয়সমূহ জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী সমাধান করার চেষ্টা না করে শুধু ভোটার তালিকা প্রস্তুতকরণ বা নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণের মতো আনুষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হবে না। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে ইসির সচিবালয়ে সংলাপে না আসার আনুষ্ঠানিক চিঠিটি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী কমিশন কার্যালয়ে পৌঁছে দেন। এ সময়ে তিনি বলেন, ‘বৈঠকে কেন বসতে পারছি না তা জানিয়ে বিএনপি মহাসচিবের চিঠি সিইসি ও সচিবকে দেয়া হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এই জন্য এসব আলোচনাও কোন সুফল আসবে না।’ এ সময়ে দলের সহ দপ্তর সম্পাদক আবদুল লতিফ জনিও উপস্থিত ছিলেন। আগামী রবিবার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বিএনপির সংলাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এদিকে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপের চতুর্থদিনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ও প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক পার্টি (পিডিপি) অংশ নেয়। অংশ নেয় নি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ন্যাশনাল পিপলস পার্টি। তবে আওয়ামী লীগ নতুন সময় চেয়ে আবেদন করেছে। জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের দাবি সিপিবি’র জামায়াতে ইসলামীসহ সাম্প্রদায়িক ও স্বাধীনতা বিরোধী সব দলের নিবন্ধন বাতিল করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি। গতকাল দুপুর ২টায় শেরে বাংলা নগরের নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের ধারাবাহিকতার চতুর্থদিনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি অংশ নিয়ে এ দাবি জানায়। কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, জামায়াতে ইসলামী দলের উদ্দেশ্য সংবিধানের মূল চেতনা ও সারমর্মের পরিপন্থী যা রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করা বিশেষভাবে জরুরি। আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল সংস্কারও দাবি করেছে দলটি। এলাকাভিত্তিক একক প্রতিনিধিত্ব’ বাদ দিয়ে ‘জাতীয়ভিত্তিক সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা চালু, নির্বাচনী ব্যয় ৫ লাখ থেকে কমিয়ে ৩ লাখ টাকা ও জামানত ৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করে কমিউনিস্ট পার্টি। এছাড়াও সীমানা পুনর্নির্ধারণে জনসংখ্যা, যাতায়াত ব্যবস্থা ও অতীত নির্বাচনী অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর পরামর্শ দেয় সিপিবি। সংলাপে দলের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন সিপিবি সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর আহমদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য আহসান হাবিব লাবলু, কেন্দ ীয় কমিটির সদস্য মাহবুব আলম, এ এন এরশাদ ও রুহিন হোসেন প্রিন্স। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবে না কল্যাণ পার্টি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহাল না হলে আগামী জাতীয় নির্বাচনে কল্যাণ পার্টি অংশ গ্রহণ করবে না বলে জানিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক। গতকাল সকাল ১১টায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সম্মেলন কক্ষে কল্যাণ পার্টির সঙ্গে ইসির সংলাপে তিনি এ কথা বলেন। সংলাপে অংশ নিয়ে সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, বিদ্যমান জনসংখ্যা দিয়ে জাতীয় নির্বাচনে একদিনে নির্বাচন করা সম্ভব নয় তাই ৭ দিনে নির্বাচন করতে হবে। তিনি বলেন, নির্বাচনে সেনা মোতায়েন নিয়ে কমিশন বিতর্কে লিপ্ত হওয়াটাকে আমি সমীচীন মনে করি না। প্রয়োজনের আবেদনের প্রেক্ষিতে সেনাবাহিনী নিযুক্ত করা যায়। তিনি বলেন, পত্রিকার রিপোর্টে জানা গেছে আগামী নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন হবে না। দেশে একটি দল সেনাবাহিনী চায় আর একটি দল চায় না। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমরাও সেনা মোতায়েন চাই। একাধিক দিনে ভোট গ্রহণের প্রস্তাব পিডিপির ১২টায় প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল সংলাপে অংশ নিয়ে দলটির সভাপতি ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী বলেন, জনসংখ্যার বৃদ্ধিতে আগামী নির্বাচনে আসন সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি বলেন, নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার এখনও ঝুঁকি মুক্ত নয়। তাই আগামী নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা যাবে না। নির্বাচনে একাধিক দিনে ভোট গ্রহণেরও প্রস্তাব দেন তিনি। সংলাপে দলটির ৯ সদস্যের একটি দল অংশ গ্রহণ করে। কোনো সময় বলিনি সেনা মোতায়েন হবে না : সিইসি কল্যাণ পার্টির সঙ্গে সংলাপের সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ বলেন, আমি কোনো সময় বলিনি নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করা হবে না। খবরের কাগজে আমার বক্তব্য সঠিকভাবে রিফ্লেক্টেড হয় না। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও সেনাবাহিনী ধাপে ধাপে মোতায়েন করা হয় বলে জানান তিনি। প্রতিটি নির্বাচনে স্থানীয় পর্যায়ের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখে তাদের মোতায়েন করা হয়। প্রয়োজনে আমরা সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেবো। প্রয়োজন না হলে যে পর্যন্ত প্রয়োজন হবে তাতে সীমিত রাখবো। সংলাপে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক, মোহাম্মদ আবু হাফিজ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাবেদ আলী, মো. শাহ নেওয়াজ, ইসি সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ।