নাশকতার ভয় দেখিয়ে ঘুষ দাবি
এনএসআই কর্মকর্তা গ্রেফতার
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০১২, ২২:৪০
‘তাজরীন গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আপনার সংশ্লিষ্টতা আছে এবং এর ভিডিও ফুটেজও রয়েছে আমার কাছে’ বিভিন্ন ব্যক্তিকে এ ধরনের কথা বলে ভয় দেখিয়ে ঘুষ নিচ্ছিল জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) এক কর্মকর্তা। গতকাল বৃহস্পতিবার ঘুষ গ্রহণকালে এনএসআইয়ের ওই কর্মকর্তাসহ তিন জনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। গ্রেফতারকৃত অন্য দুই জন হলেন হাসান কবির ও মিন্টু। ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে উত্তরা থানায় তাদের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছে। জানা গেছে, এনএসআইয়ের মাঠ কর্মকর্তা মাজহার বিভিন্ন লোকের কাছে ফোন করে বলেন তার কাছে তাজরীন গার্মেন্টসে কারা আগুন দিয়েছে এর ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। এসব কথা বলে ভয় দেখিয়ে ওই সব লোকজনের কাছ থেকে ঘুষ দাবি করেন মাজহার।
গতকাল বিকালে হাসান কবির ও মিন্টু নামে দুই ব্যক্তি ২০ হাজার টাকা নিয়ে উত্তরার নির্ধারিত স্থানে যায়। মাজহার ঘুষ নেয়ার সময় র্যাবের একটি দল তাকেসহ তিনজনকে হাতেনাতে ধরে ফেলে। র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে ঘুষ চাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন মাজহার।
র্যাবের লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মোহাম্মদ সোহায়েল বলেন, একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে এনএসআইয়ের কর্মকর্তাসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদেরকে উত্তরা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
ঢাকার পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান বলেন, গ্রেফতারকৃত তিনজন ডেবনিয়ার কারখানায় আগুন দেয়ার ঘটনায় গ্রেফতার সুুমি বেগমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিনা এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ডেবোনিয়ারে আগুন দিতে গিয়ে গ্রেফতার হয়েছিল শ্রমিক সুমি বেগম এবং ম্যানেজার জাকির হোসেন। জিজ্ঞাসাবাদে সুমি বেগম পুলিশকে জানায়, আগুন দিতে বলেছিল ম্যানেজার জাকির। বিনিময়ে তাকে দেয়া হবে ২০ হাজার টাকা।
র্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, সুমি বেগমের সঙ্গে এনএসআই কর্মকর্তাসহ গ্রেফতারকৃতদের যোগসাজশ থাকতে পারে। এ বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
এদিকে প্রাথমিক তদন্তে জানা যায় যে, সুমি বেগমকে ডেবনিয়ার গার্মেন্টসে চাকরি দেয় ম্যানেজার জাকির। জাকির এক সময় গ্রেফতারকৃত হাসান কবিরের এমএলএম কোম্পানিতে চাকরি করতেন। জাকিরের বাসায় তল্লাশি চালিয়ে র্যাব-পুলিশ হাসানের এমএলএম কোম্পানির পরিচয়পত্র উদ্ধার করেছে। হাসান কবির একটি রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী বলে জানা গেছে। এদিকে সাভার ও আশুলিয়ায় গার্মেন্টসে আগুন আতংক এখনো কাটেনি। গার্মেন্টস ছাড়াও অন্য কারখানা বন্ধ রয়েছে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা বলেছে, শ্রমিক নামধারী একটি গোষ্ঠী গার্মেন্টসে আগুন আতংক সৃষ্টি করছে। গতকাল দুপুরে সাভারের হেমায়েতপুর ক্রিসেন্ট ট্যানারির ‘সু’ কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণ ঘটে। আতংকে শ্রমিকরা নিচে নেমে আসে। তবে কোন ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
ক্রিসেন্ট ট্যানারির মালিক এমএ কাদের বলেন, ঐ সময় বাইরে থেকে একদল মানুষ আগুন আগুন বলে চিত্কার শুরু করে। শ্রমিকরা আত্মরক্ষার জন্য দ্রুত নিচে নেমে আসে। ঐ লোকগুলো বিস্ফোরণের আগে কারখানার অদূরে দাঁড়ানো ছিল বলে শ্রমিকরা মালিককে জানিয়েছেন। এ ধরনের প্রায় কারখানার সামনে অজ্ঞাত পরিচয়ের লোকজন দাঁড়িয়ে থাকে। আগুন আগুন বলে চিত্কার দিয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে তারা। গতকাল ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মিজানুর রহমান সাভার আশুলিয়া পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে ছিলেন।
এদিকে সাধারণ শ্রমিকরা জানিয়েছে, অনেকে নিজেকে শ্রমিক নেতা দাবি করলেও তাদের পোশাক পরিচ্ছদ ও চালচলন দেখলে তা মনে হয় না। তারা দামি গাড়িতে চড়েন, দামি বাড়িতে থাকেন।
বিদেশি চক্রের সঙ্গে এসব নেতার জড়িত থাকার ও কোটি কোটি টাকা কামানোর তথ্য আছে পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে।
পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হন যে, এরা কোন কারখানায় কাজ করে না। তাদের পাসপোর্টে আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও ইউরোপের পাঁচ বছর মেয়াদী ভিসা আছে। প্রতি মাসে ঐ সব দেশে যান তারা। গার্মেন্টস সেক্টরকে ধ্বংস করার জন্য দেশি-বিদেশি চক্রের সঙ্গে ঐ সব নেতা জড়িত বলে কর্মকর্তাগণ তথ্য পেয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে বলে এক কর্মকর্তা জানান।
অন্যদিকে তাজরীন গার্মেন্টসের মালিক দেলোয়ার হোসেন বলেছেন, তার গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি নাশকতামূলক। আগুন লাগার পর তালা বন্ধ রাখার কোনো নির্দেশ তিনি দেননি। ওই রাতে গার্মেন্টসে যে সব কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেছেন, তারা কেউ তালাবদ্ধ করে শ্রমিকদের আটকে আগুনের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। নিহত শ্রমিকদের পরিবারের জন্য সরকার ও বিজিএমইএ যে সিদ্ধান্ত নেবে, তিনি তা মেনে নিবেন বলে জানিয়েছেন। এদিকে তাজরীন গার্মেন্টসে স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১১২ জন শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ আশুলিয়া-সাভারসহ আশেপাশে গার্মেন্টস কারখানায় অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা শুরু করেছেন।