সুর-লহরীতে অবগাহন
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০১২, ২২:৪৩
বলা যেতে পারে—সুর সাগরে অবগাহন। সুর ভ্রমণতো বটেই! যেভাবেই বলা হোক না কেন—কমই বলা হবে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সুর-লহরী খোলা ময়দানে গভীর রাতে এক ভিন্ন দ্যোতনার সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশে শ্রোতাদের সুরে অবগাহনের এই অভিজ্ঞতা সম্ভবত এই প্রথম। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের এত বড় আসর বাংলাদেশে আর কখনো বসেনি। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসর বসেছে রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে। গতকাল বৃহস্পতিবার উদ্বোধনী দিনে আর্মি স্টেডিয়ামে সঙ্গীতপিপাসু মানুষের ঢল নেমেছিল। দীর্ঘসময় লাইনে দাঁড়িয়ে সবাই প্রবেশ করেছেন উত্সবস্থলে। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন ও ভারতের সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমীর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ উত্সব সারাদেশের সঙ্গীত পিপাসুদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে গতকাল সন্ধ্যায় উত্সবের উদ্বোধন হয়েছে। এরপর শুরু হলো হেমন্তের কুয়াশাসিক্ত পরিবেশে সমর্পিত ওস্তাদদের সুরের মূর্ছনা। চারদিনের এ উত্সবের উদ্বোধন করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিপু মনি। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ সরন। অ্যামিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন আইটিসি এসআরএ সঙ্গীত একাডেমীর কার্যনির্বাহী পরিচালক রবি মাথুর ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সভাপতি আবুল খায়ের লিটু।
দীপু মনি বলেন, যে সঙ্গীত জীবনের উত্সব সেই সঙ্গীত শুনতে এসেছি আমরা। এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে দুই দেশের সঙ্গীত পিপাসু মানুষদের একটি বিন্দুতে মিলতে সহযোগিতা করবে। পঙ্কজ সরন বলেন, দুটি হূদয় এক হলে সীমান্ত রেখা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষকে এই সঙ্গীত মিলবার উপলক্ষ এনে দিয়েছে। পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী বলেন, শ্রোতার না থাকলে সঙ্গীতের কোন মূল্য নেই। সঙ্গীতের মাধ্যমেই হূদয় ছোঁয়া যায়। আবুল খায়ের লিটু বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহী করে তোলা। পাশাপাশি আগ্রহী শ্রোতার সৃষ্টি করা—শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে বাংলাদেশে পরম্পরা ভিত্তিক চর্চাকে প্রতিষ্ঠিত করা।
তরুণ প্রজন্মকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে আগ্রহী করে তুলতে বাংলাদেশের বেঙ্গল ফাউন্ডেশন ও ভারতের কলকাতার আইটিসি এসআরএ সঙ্গীত একাডেমী যৌথভাবে আয়োজন করেছে ‘বেঙ্গল-আইটিসি এসআরএ শাস্ত্রীয় সঙ্গীত উত্সব’। উত্সবটি প্রয়াত সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁকে উত্সর্গিত হয়েছে। চারদিনের এই উত্সবের প্রতিদিন চারজন বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞকে উত্সর্গ করা হয়েছে। প্রথমদিন গতকালের আয়োজন সঙ্গীতসাধক ওয়াহিদুল হককে উত্সর্গ করা হয়েছে। উদ্বোধনী পর্ব শেষে আয়োজনের শুরুতে ছিল বাংলার লোকসঙ্গীত, চর্যাপদ, বাউলগান ও পঞ্চকবির গান থেকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে উত্তরণের ইতিহাস। বিষয়টি আলো, শব্দ ও ছবির মাধ্যমে তুলে ধরেন নাসিরুল হক।
উদ্বোধনী পর্বের পর ওস্তাদ আলী আহমেদ হোসেনের সানাইবাদন দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। এরপর রাগ সঙ্গীত পরিবেশন করেন ওমকার দাদারকার, সরোদ বাজিয়ে শোনান ওস্তাদ শাহাদাত হোসেন খান। ওড়িশি নৃত্য পরিবেশন করেন বিদুষী সুজাতা মহাপাত্র, সরোদ বাদন করেন পণ্ডিত তেজেন্দ্র এন মজুমদার, সেতার বাজান ওস্তাদ শহীদ পারভেজ। এছাড়া রাগ পরিবেশন করেন ওয়াসিম আহমেদ খান, পণ্ডিত উদয় ভাওয়ালকর, সবশেষে আসেন পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী।
আজকের আয়োজন
বিকেল পাঁচটায় শুরু হবে আজকের দিনের আয়োজন। এই দিনটি ওস্তাদ বিলায়েত খাঁকে উত্সর্গ করা হয়েছে। রাজরূপা চৌধুরী (সরোদ), দেবশ্রী ভট্টাচার্য (কণ্ঠ), যশবন্ত বৈষ্ণব (তবলা), আদনান খান (সেতার), সন্দীপ ভট্টাচার্য (কণ্ঠ), কৌশিকী দেশীকান (কণ্ঠ), ওস্তাদ মাশকুর আলী খান (কণ্ঠ), পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (সরোদ), ওস্তাদ রশীদ খান (কণ্ঠ) এবং পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা (সন্তুর) আজ অংশ নেবেন।
বাকি দুই দিনের আয়োজন
শনিবার বিকাল পাঁচটা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলবে এ আয়োজন। এ দিনের আয়োজন পণ্ডিত উদয় শংকরকে উত্সর্গ করা হয়েছে। এদিন আরশাদ আলী খান (কণ্ঠ), এবাদুল হক (সেতার), শশাঙ্ক মাক্তেদার (কণ্ঠ), আবির হোসেন (সরোদ), প্রিয়াংকা গোপ (কণ্ঠ), কুমার মারদার (কণ্ঠ), পণ্ডিত কুমার বোস (তবলা), বিদুষী শুভ্রা গুহ (কণ্ঠ), পূর্বায়ন চট্টোপাধ্যায় (সেতার), বিদুষী গিরীজা দেবী (কণ্ঠ) এবং পণ্ডিত বিরজু মহারাজ (কত্থক) অংশ নেবেন।
রবিবার উত্সবের শেষ দিন। এদিন সন্ধ্যা ছয়টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত আয়োজন চলবে। এদিনের আয়োজন ওস্তাদ আলী আকবর খাঁকে উত্সর্গ করা হয়েছে। এদিন আলিফ লায়লা (সেতার), ব্রজেশ্বর মুখোপাধ্যায় (কণ্ঠ), মুর্তজা কবির (বাঁশি), বিদুষী অরুণা সায়েরাম (কণ্ঠ), বিদুষী আলারমেল ভালি (ভরতনাট্যম), পণ্ডিত রাজন মিশ্র (কণ্ঠ), পণ্ডিত সজন মিশ্র (কণ্ঠ) এবং পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া (বাঁশি) অংশ নেবেন।