টিকে থাকুক সম্ভাবনা

এক সপ্তাহ আগে ঘটে যাওয়া আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের তাজরীন গার্মেন্টসে যখন আগুন লাগে তখন কারখানাটিতে ‘নিশ্চিন্ত মনে’ কাজ করছিলেন হাজারখানেক শ্রমিক। কারখানাটিতে স্বাভাবিক সময়ে ১৬শ’ শ্রমিক কাজ করেন। তবে ওভারটাইম ডিউটি হওয়ায় শ্রমিকের সংখ্যা কিছুটা কম ছিল। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে আগুন লাগে। আগুন লাগার পর যথারীতি ফায়ার অ্যালার্ম বাজে। কান খাড়া করে যে যার মত করে উঠে দাঁড়ান। ‘কিচ্ছু হয়নি, ফায়ার ড্রিল (অগ্নিকাণ্ড থেকে রক্ষার মহড়া) হচ্ছে। তোমরা কাজ করো।’ এমন কথা শোনালেন সেখানে দায়িত্বরত মধ্যম সারির কর্মকর্তা। আতঙ্ক তবু পিছু ছাড়ছিল না। এই আতঙ্কে অনেকে বসার সাহস পাচ্ছিলেন না। তাদের ধমক দেন কর্মকর্তা। অবশ্য বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের কেউ কেউ জানিয়েছিলেন, তাদের গালিও দেয়া হয় তখন। ফলে যে যার মত বসে কাজ করতে শুরু করেন। কিছুক্ষণ পরই ধোঁয়া আসতে থাকে। এবার ভাবলেন সত্যি সত্যিই আগুন লেগেছে। উদ্বিগ্ন শ্রমিকরা এবার হুড়োহুড়ি শুরু করেন। ততক্ষণে বিদ্যুত্ চলে গেছে। হুড়োহুড়ি করে নিচে নামতে গিয়ে দেখেন সিঁড়ির গোড়ায়ই আগুন। এখানেই ছিল সুতার গোডাউন, যেখান থেকে আগুনের সূত্রপাত। এবার উপরে উঠতে গিয়ে দেখেন তালা বন্ধ। এরপর জানালা ভেঙ্গে নিচে লাফিয়ে বাঁচার চেষ্টা আর আগুনের কাছে কারো কারো নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। এই হচ্ছে এক সপ্তাহ আগের নিশ্চিন্তপুরের তাজরীন ফ্যাশনের ভয়াল সেই রাতের সারসংক্ষেপ। এর পর থেকেই এই ঘটনা নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। এই ঘটনার পর মালিক ও মালিকের প্রতিনিধিদের (মধ্যম সারির ব্যবস্থাপনা) নির্দয় অবহেলা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। মালিক ও মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ বলছে এটি নাশকতা। এর সাথে সুর মিলিয়েছে সরকার। তদন্ত চলা অবস্থায় স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী সংসদে নাশকতার কথা বলেছেন। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ফলাও করে এই মর্মান্তিক ঘটনা প্রচার করা হয়েছে। গুরুত্ব পেয়েছে শ্রমিকদের প্রতি মালিক পক্ষের নির্দয় অবহেলার চিত্র। শ্রমিক সংগঠনগুলো আর এক পা এগিয়ে এটাকে পরিকল্পিত ‘হত্যাকাণ্ড’ বলছেন। দেশের ভেতরেও সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে। তাদের প্রশ্ন আগুন লাগার ঘটনা নাশকতা হতে পারে। কিন্তু সে জন্য শ্রমিকরা মারা যাবে কেন? তারা তো নিরাপদে বের হতে পারার কথা। তাদেরকে কেন আটকানো হলো? অভিযোগ রয়েছে, মধ্যম সারির ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে। তাদের কয়েকজনের নামও এসেছে যারা তালা লাগিয়ে দিয়েছিল। ফলে পুড়ে অঙ্গার হয়েছে শত প্রাণ। এই ঘটনায় সরকার ও বিজিএমইএসহ ৫টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জাতীয়ভাবে পালন করা হয়েছে শোক দিবস। অভিযুক্তদের মধ্য থেকে তিন জনকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। হয়ত কিছু তথ্য পাওয়া যাবে। কিন্তু প্রকৃত দোষী কি চিহ্নিত হয়ে শাস্তির আওতায় আসবে? নাকি আর সব ঘটনার মত এটিও আরেকটি বড় ঘটনার নিচে চাপা পড়ে যাবে? এরকম অনেকগুলো প্রশ্নের সঠিক সমাধানের উপর নির্ভর করছে এই শিল্পের ভবিষ্যত্। শাস্তি হয় না দোষীদের, দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল: তৈরি পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডসহ অন্যান্য দুর্ঘটনায় দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। সর্বশেষ সেই মিছিলে যোগ দিল আরো ১১১ জন (সরকারি হিসাবে)। বিজিএমইএ’র হিসাবে ১৯৯০ সালে সারাকা গার্মেন্টসে বড় অগ্নি দুর্ঘটনায় মালিকসহ ১৭ জন নিহত হওয়ার পর থেকে গত দুই দশকে মোট মৃতের সংখ্যা প্রায় ৩০০। এর মধ্যে ২০১০ সালে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি এ কে আজাদের মালিকানাধীন হা-মীম গ্রুপ ও গরীব এন্ড গরীব গার্মেন্টস কারখানায় বড় মৃতের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া ভবন ধসে স্পেক্ট্রাম গার্মেন্টসের বেশকিছু শ্রমিক মারা যায়। তবে বিজিএমইএ’র হিসাবের সাথে শ্রমিক ও তাদের সংগঠনগুলোর হিসাবে বিস্তর ফারাক। তাদের হিসাব বলছে, অগিকাণ্ডসহ অন্যান্য দুর্ঘটনায় এই শিল্পে মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। আহতের সংখ্যা কয়েক হাজার। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে। হয়েছে তদন্ত কমিটি। হয়ত তদন্ত রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের হাতে পৌঁছেছে। কিন্তু উল্লেখ করার মত কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের জানা নেই। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সঠিক তদন্ত ও তার ভিত্তিতে দোষীদের শাস্তিসহ অন্যান্য সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে এই মৃত্যুর মিছিল আরো অনেক ছোট করে আনা যেত। তাদের আশংকা, তাজরীনের অগ্নি দুর্ঘটনার তদন্তও চলে যাবে হিমাগারে। মূল নায়করা থেকে যাবে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। ফলে আবার হয়তো চোখের সামনে পুড়বে অন্য কোন ‘তাজরীন’। জোরালো হচ্ছে কমপ্লায়েন্স না মানার অভিযোগ: বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে কমপ্লায়েন্স (কর্ম পরিবেশ) মানা হয় না বলে অভিযোগ অনেকদিনের। শ্রমিকদের স্বল্পমজুরি, ট্রেড ইউনিয়ন করতে না দেয়া, ঘিঞ্জি পরিবেশে কাজ করা, নারী শ্রমিকরা শারীরিক ও যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার খবরও গণমাধ্যমে প্রচার হচ্ছে। গত শনিবার রাতে তাজরীন গার্মেন্টসের শ্রমিকরা বের হওয়ার জন্য (দুর্ঘটনাকালীন সময়ে) বাইরে কোন সিঁড়ি ছিল না। প্রতিষ্ঠানের চারপাশে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যাওয়ার জন্য প্রশস্ত রাস্তা ছিল না। ফলে চারপাশ থেকে পানি ছিটানো যায়নি। পানির আধার যথাযথ স্থানে ছিল না। ভেতরের সিঁড়ি দিয়ে নামার ব্যবস্থা যেখানে ঠিক সেখানেই আগুনের সূত্রপাত। ফলে উপরে উঠতে গিয়ে আবার কলাপসিবল গেট আটকা পেয়ে আগুনে দগ্ধ শ্রমিকরা বেঘোরে প্রাণ হারায়। ঘুরেফিরে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এসব খবর এসেছে। অথচ যে তাজরীন গার্মেন্টসে এ কাজ হচ্ছিল সেটি কমপ্লায়েন্সের সার্টিফিকেট পাওয়া কারখানা! আমেরিকার প্রভাবশালী এবিসি নিউজকে দেশটির শ্রমিক অধিকার সংক্রান্ত ওয়ার্কার রাইটস কনসোর্টিয়ামের নির্বাহী পরিচালক স্কট নোভা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক ক্রেতা ও ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের জীবন বিপদাপন্ন উল্লেখ করে বার বার সতর্ক করেছে। কিন্তু তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সংবাদ সংস্থা এএফপি বাংলাদেশের পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের পেছনে পশ্চিমা পোশাক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের দুর্বল নিরাপত্তা নিরীক্ষা প্রতিবেদনকে দায়ী করেছে। সংবাদ সংস্থাটি হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, তথাকথিত কমপ্লায়েন্স নিয়ে কারখানার মালিকেরা প্রতারণা করেছেন। সমপ্রতি ‘ফাইবারটুফ্যাশন’ ওয়েবসাইটের এক নিবন্ধে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, কম্বোডিয়াসহ কয়েকটি দেশের কর্মক্ষেত্রে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের নিরাপত্তায় অবহেলার বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এর কয়েক মাস আগে দ্য গার্ডিয়ান বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের প্রতি মালিকের অবহেলার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের শ্রমিকদের হাতে তৈরি একটি পোশাক একজন আমেরিকান ক্রেতা যে দামে কেনেন ঐ শ্রমিক সারা মাসে ঐ একটি পোশাকের সমান বেতনও পান না। আরো কঠিন হবে কমপ্লায়েন্সের শর্ত: বাংলাদেশ গত ২০১১-১২ অর্থবছরে প্রায় ২ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের পোশাক রফতানি করেছিল। এর প্রায় ৮০ ভাগই রফতানি হয়েছে আমেরিকা, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও কানাডায়। ওয়ালমার্ট, এইচ এন্ড এম, সি এন্ড এ, লি ফাংসহ অনেক নামি-দামি ব্র্যান্ড বাংলাদেশের পোশাকের অন্যতম ক্রেতা। তাদের কমপ্লায়েন্সের শর্ত মেনেই উত্পাদনকারীরা পোশাক উত্পাদন করছেন। কিন্তু তাজরীন ফ্যাশনে আগুন লাগার ঘটনা ও এর ফলে শ্রমিকদের অমানবিক মৃত্যুর পর দেখা গেছে, তাজরীন কমপ্লায়েন্সের অনেক শর্তই মানেনি। ফলে প্রশ্নের মুখে পড়েছে এসব ব্র্যান্ড। প্রশ্ন উঠেছে তাজরীন কীভাবে কমপ্লায়েন্সের সার্টিফিকেট পেল? চাপের মুখে পড়ে ইতিমধ্যে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক চুক্তি বাতিল করেছে ওয়ালমার্ট। তাদের অভিযোগ ছিল, সরবরাহকারী কোম্পানি তাদেরকে না জানিয়ে তাজরীন ফ্যাশনকে সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ দিয়েছিল। এটি তাদের সাথে সরবরাহকারী কোম্পানির চুক্তির সরাসরি লঙ্ঘন। এছাড়া আরো অনেকগুলো কোম্পানি এখন বাংলাদেশে অর্ডার দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করবে। সম্ভাবনায় কুঠারাঘাত: গার্মেন্টস রফতানিকারক দেশগুলোর ‘বড় ভাই’ চীন ধীরে এই খাত থেকে সরে যাচ্ছে। ক্রমাগত মজুরি বৃদ্ধি এর অন্যতম কারণ। ফলে উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন খাতে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকায় সে দিকেই মনোনিবেশ করছে তারা। বছরে বিশ্ব বাজারে চীনের তৈরি পোশাক রফতানি ৩০ হাজার কোটি ডলারের উপরে। আর গত বছর প্রায় ২ হাজার কোটি ডলারের পোশাক রফতানি করে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে! চীন এই খাত থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণায় ক্রেতারা বিকল্পের তালিকায় প্রথমে রেখেছে বাংলাদেশের নাম। এর প্রমাণ দেখা যায়, সমপ্রতি বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এইচ এন্ড এম ও হংকংয়ের অ্যামচেমের বাংলাদেশের পোশাক কারখানা পরিদর্শন। তারা ঘোষণা দিয়েছে, বাংলাদেশের সাথে তাদের ব্যবসা আরো বাড়াতে চায়। এ ছাড়া চীনও বাংলাদেশে পোশাক খাতে বিনিয়োগের কথা বলেছে। বর্তমানে প্রায় ২ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের পোশাক রফতানি খাত আগামী কয়েক বছরে দ্বিগুণ ও তিনগুণ হবে বলে আশার কথা জানিয়েছিল বিজিএমইএ। বিশ্লেষকরা আশংকা করছেন, তাজরীনের ঘটনা ও এর আগে শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা সরাসরি না হলেও দীর্ঘমেয়াদে রফতানি বাজারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে। ক্রেতাদের বাংলাদেশমুখী মিছিল গতিপথ ঘুরে চলে যেতে পারে প্রতিযোগী ভারত, পাকিস্তান, মায়ানমার, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও তুরস্কে। ইতিমধ্যে সে রকম ইঙ্গিত দিয়েছে অন্যতম বৃহত্ চেইন শপ ওয়ালমার্ট। টিকে থাকুক সম্ভাবনা: বাংলাদেশে গার্মেন্টস খাত সোনার ডিম পাড়া হাঁস। বিশাল রফতানি আয় অর্জনকারী এই খাত এবং প্রবাসী আয়ের উপর ভর করে টিকে আছে আমাদের অর্থনীতি। প্রতি বছর বড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পেছনে এই পোশাক খাতের বিশাল অবদান। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, যে কোন উপায়ে এই খাতের ক্ষতি হতে দেয়া যাবে না। মালিক-শ্রমিক, সরকার আর সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতির স্বার্থে এই খাতের টালমাটাল পরিস্থিতি দূর করতে হবে। শ্রমিকের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। যে কোন দুর্ঘটনায় দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে এই বার্তা পৌঁছাতে হবে যে, বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাত পুরোপুরি কমপ্লায়েন্সের শর্ত মেনে কাজ করে। কারণ একবার ক্রেতারা বিমুখ হলে তাদের ফিরিয়ে আনা কঠিন। সেই ক্ষেত্রে হুমকির মুখে পড়তে পারে সার্বিক অর্থনীতি। সেই আশঙ্কা সত্যি না হোক। সম্ভাবনাই টিকে থাকুক।