মধ্যবিত্তের দিন বড় কষ্টে যাচ্ছে

আর্থিক সঙ্গতি বিবেচনায় ধনী বা উচ্চবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, গরিব বা বিত্তহীন, সর্বহারা বা ছিন্নমূল ইত্যাদি নানা পর্যায়ের মানুষ আমাদের সমাজে আছে। কখনো মনে হয় এরূপ শ্রেণিকরণের ধরন পালটাতে হবে। সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত কাঠামোয় এখন বলতে গেলে চারটি ধাপ রয়েছে— উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও বিত্তহীন। এর মধ্যে মধ্যবিত্তের স্বরূপ উন্মোচন বড় কঠিন। এ শ্রেণির মানুষের জীবন-যাপন প্রণালী প্রায়শ ঘোলাটে। কাজেকর্মে তারা নিম্নবিত্তের কাছেও পরাজিত। বাজার অর্থনীতির চরিত্রানুযায়ী চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে নিম্নবিত্তের চেয়েও মধ্যবিত্ত অক্ষম। শুধু চেয়ে থাকা আর ধৈর্যের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়াস নেয় তারা। সব সময় কি তাতে কৃতকার্য হওয়া যায়? মোটেও না। চাহিদার পাগলা ঘোড়া প্রায়শ তাদের অস্তিত্বকে চুরমার করে দেয়। দ্রুত মধ্যবিত্ত বিত্তহীন হয়ে যাচ্ছে। মাঝের নিম্নবিত্তের স্তরে তারা আটকে থাকতে পারে না। রাজনীতি, আমলা, চাকরিজীবী নির্ভর সুযোগ সন্ধানী এবং অতি নগণ্য সংখ্যক মধ্যবিত্ত, যারা ধান্ধাবাজিতে পারঙ্গম তারা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে সক্ষম হয়। কেউ কেউ লিজ, ঠিকদারি, কমিশন খাওয়ার মতো পেশায় যোগ দিয়ে দ্রুত আখের গোছায়। কেউ ঘুষ তদবিরসহ নানা বায়ুবীয় কার্যাবলীর হোতা হিসেবে নিজেদেরকে টাকা কামাইয়ের মেশিনে পরিবর্তন করতে পারে। তাদের পোয়াবারো। সরলভাবে মধ্যবিত্তে অবস্থান বা ইতিবাচক অবস্থানে সরে দাঁড়ানো কঠিন ব্যাপার। তারপরও প্রকৃত মধ্যবিত্তের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। দুর্যোগ-দুর্বিপাক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানাবিদ পরিবর্তনের বাতাস আগে লাগে মধ্যবিত্তের গায়ে। তাদের পরিবর্তন হয় আকস্মিকভাবে, বিষয়বস্তু ঠাহর করার আগেই। বিত্তবান আর নিম্নবিত্তের এখন সময়। ব্যাংক টাকা দেয় বিত্তবানদেরকে। তারা নানা বাহানায় ব্যাংক লোপাট করে ফেলতে পারে। মধ্যবিত্ত মাথা কুটলেও প্রয়োজনে ঋণ পায় না, ফেরত প্রাপ্তি যত নিশ্চিত হোক না কেন। নিম্নবিত্ত এমনকি বিত্তহীনেরা বর্তমানে ক্ষুদ্র ঋণের আওতায় নানা কিসিমের ঋণ ও অনুদান পেয়ে থাকে। মধ্যবিত্তের জীবন মানকে উন্নত করার বা নিদেনপক্ষে ধরে রাখার কোনো প্রকল্পই নেই, কী সরকারি বা বেসরকারি। ক্ষুদ্রঋণ, আয়-বর্ধক কর্মসূচি, সামাজিক ব্যবসা, অর্থনীতির এসব বহুল আলোচিত বিষয়-আশয় নিয়ে দেশে অনেক এনজিও কাজ করে যাচ্ছে। কোনো এনজিওর কোনো প্রকল্পেই মধ্যবিত্তের প্রবেশ মসৃণ নয়। এ এক তাজ্জব ব্যাপার! স্পষ্টত প্রতীয়মান হয়, মধ্যবিত্ত এক গলগ্রহ শ্রেণি। প্রয়োজন মেটাতে অক্ষম এ শ্রেণি সক্ষমতার ভান করে আর কতকাল দিনাতিপাত করবে? তাদের খরচের হাত সংক্ষিপ্ত। দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধির ফলে মধ্যবিত্ত নাকানিচুবানি খায়। তাদের অস্তিত্বের স্কেল ওঠানামা করে। খোলা পারদের মতো শঙ্কার সৃষ্টি করে। এই বুঝি পড়ে গেলো বিত্তহীনের অতল গহবরে! সে চিন্তায় ঘুরপাক খায় তাদের মেধা ও মনন। ফলে মধ্যবিত্ত আজ আর কিছু দিতে পারে না। খাদ্য ও অপরাপর দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি উচ্চবিত্তের গায়ে লাগে না। নিত্য কামাইয়ে নিম্নবিত্ত ও বিত্তহীন দিনগুলো পার করে দেয়। মধ্যবিত্ত সেখানে অসহায় সময় পার করে। গতর ঘাটাতে পারে না অনভ্যাস, অক্ষমতা ও চক্ষু লজ্জার কারণে। আর্থিক ব্যবস্থাপনা, সামাজিক অবস্থান, স্বীয় মানসিকতা মধ্যবিত্তকে পিঠমোরা দিয়ে বেঁধে রেখেছে। সামনে যাওয়া দূরের কথা, বেঁচে থাকাই দায়। সন্তানের লেখাপড়া বা কর্মক্ষম করে তোলা, চাকরি-বাকরি, প্রয়োজনে চিকিত্সাসেবা প্রাপ্তি সবকিছুতেই মধ্যবিত্ত আজ পশ্চাদপদ। কোনো কারণে দুরারোগ্য বা দীর্ঘ চিকিত্সার প্রয়োজন হলে অক্ষমতার ভারী পাথর তাদের বুকে চাপা পড়ে। যেভাবেই হোক, মধ্যবিত্তের অস্তিত্ব যদি বিলীন হয়, তাদের অস্তিত্ব না থাকে তবে সামাজিক কাঠামোতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হবে কি? এ বিষয়ে সূক্ষ্ম ও স্পষ্ট গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। ইতিহাস বলে বিজ্ঞান-আবিষ্কার, শিল্পকলা, সংগীত-সাহিত্য ইত্যাদি পরিপুষ্টতা পায় মধ্যবিত্তের সক্রিয়তায়। তাদের জীবন-মান মননশীলতার উত্স। এসব কথা এখন আর তেমনভাবে সঠিক নয়। যেহেতু মধ্যবিত্ত এখন সীমাহীন চাপে আছে, অস্তিত্ব রক্ষার টানাপড়েনে দিনগুলো পার করছে, স্পষ্ট বরে বললে এই: মানুষ বাড়ছে, সে তুলনায় কবি-লেখক-শিল্পী-বিজ্ঞানীর সৃষ্টি হচ্ছে না। এটি নিশ্চয়ই আন্দাজ নয়, বাস্তবতা। এমনটি হওয়ার প্রকৃত কারণ কী? ভেঙে পড়া আর্থ-সামাজিক অবস্থানকে দায়ী করা যেতে পারে। দায়ী করার আগে বুঝে নিতে হবে প্রেক্ষাপট। করতে হবে মধ্যবিত্তের স্বরূপ উন্মোচন। নেত্রকোনা