মোহামেডানের পক্ষে কি সম্ভব
প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০১২, ২১:১৪
ফুটবলে শিরোপা জয় ঐতিহ্যবাহী ঢাকা মোহামেডানের কাছে মামুলিই বলা চলে। ক্রীড়াঙ্গনে আত্মপ্রকাশ ও প্রতিষ্ঠার পর এ পর্যন্ত দলটি কত যে শিরোপা ঘরে তুলেছে তার হিসাব মেলানো কঠিন। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য যে, মোহামেডান গত এক দশক ধরে লীগে কোনো শিরোপা পাচ্ছে না। পেশাদার লীগে পাঁচটি আসর শেষ হলেও ক্লাবটি এখনো এ শিরোপার স্বাদ পায়নি। সদ্য শেষ হওয়া পেশাদার লীগে ১১ দলের মধ্যে মোহামেডানের অবস্থান তৃতীয়। অবস্থা এমনই মোহামেডান ফুটবল দলের সঙ্গে তুলনা শুরু হয়েছে এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ওয়ান্ডারাসের। সমর্থক মনে প্রশ্ন—ওয়ান্ডারাসের মতো কি হারিয়ে যাচ্ছে মোহামেডান? ক্লাবের এমন হতাশাজনক পারফরমেন্সে ক্লাব কর্মকর্তারা কে কী ভাবছেন জানি না, সমর্থকদের মাঝে কিন্তুু হতাশা বিরাজ করছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে সমর্থকরা কি তাদের ধৈর্য ধরে রাখতে পারবেন?
ক্লাবের আজ এ কী অবস্থা! মঈনুল, আকমল ও মোসাদ্দেক আলী ফালুর মতো নিবেদিতপ্রাণ সংগঠকের আজ বড়োই অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। অনেকেই তাঁদের সময়টাকে স্বর্গযুগ বলে থাকে। আমিও তাঁদের সঙ্গে সুর মেলাতে চাই। বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি অত্যন্ত সঙ্কটময় সময় পার করছে। কেননা ফুটবল, ক্রিকেট ও গেলো মৌসুমের হকি ছাড়া দীর্ঘ কয়েক বছর খেলাধুলায় সাফল্য নেই। বর্তমানে ক্লাবের দৈন্য-দশার জন্য দায়ী ক্লাব-কর্মকর্তাদের অন্তর্কলহ ও গ্রুপিং। বলতে দ্বিধা নেই, দেশের ক্রীড়াঙ্গন অনেক বদলে গেছে, অনেক কিছুই এখন আর আগের মতো নেই। এখন নতুন নতুন দল তৈরি হচ্ছে, প্রতিযোগিতাও বাড়ছে, ক্লাব-কর্মকর্তাদের মাঝে দেখা যাচ্ছে ক্ষমতার দম্ভ , রাজনীতি ও গ্রুপিং। অথচ এটা কারো কাম্য নয়। প্রকৃত নিবেদিতপ্রাণ সংগঠকেরা এখন ক্লাব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। যার প্রভাব পড়েছে ক্লাবে। এর ফলে ভালো দলগঠন এবং সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে না।
পুরনো ঢাকার গেণ্ডারিয়ার নুরুল হক, সূত্রাপুরের পাপ্পু, কামরুল, ওয়ারির মোসাদ্দেক, পলাশীর ফারুক, নাজিরাবাজারের মিজান, ধানমণ্ডির ডন, মিরপুরের কাজীপাড়ার মুকুলরা এখন আর মাঠে যায় না। কারণ আশি-নব্বইয়ের দশকের যে মোহামেডানের খেলা তাদের আলোড়িত করতো সেই খেলা এখন আর নেই। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম, ধানমণ্ডির স্টেডিয়াম কিংবা হকি স্টেডিয়ামের কোথাও ওদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। অথচ একসময় এগুলোই ছিল ওদের দ্বিতীয় ঠিকানা। জীবন-জীবিকার শত টানাপড়েনেও খেলা দেখা বন্ধ হয়নি। মোহামেডানের সমর্থক হিসেবে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করেও ছুটে গেছে খেলার মাঠে। প্রিয় দলকে সমর্থন জানিয়েছে। সেই খেলাপাগল মানুষ আজ মাঠবিমুখ। এখন আর মোহামেডানের খেলায় আগের মতো উন্মাদনা নেই। দর্শক নেই, গ্যালারি পড়ে থাকে শূন্য। সাফল্য যাদের নিত্য সঙ্গী ছিল, আজ তারা ব্যর্থ। কিন্তুু এভাবে আর কতদিন?
২৪ মার্চ ২০১০-এ মোহামেডান ক্লাব লিমিটেড কোম্পানি হয়। লিমিটেড কোম্পানি হওয়ার পরও সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে ক্লাব। অথচ দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও দর্শকনন্দিত ক্লাব যা বলার অপেক্ষা রাখে না। এক্ষেত্রে আবাহনী এগিয়ে থাকলেও সাংগঠনিক ব্যর্থতাসহ নানা কারণে মোহামেডান অনেক পিছিয়ে। যদিও মোহামেডানের অনেক পরে আবাহনীর জন্ম। কথিত আছে, দীর্ঘদিনের সফল সংগঠক ও সাবেক সভাপতি মোসাদ্দেক আলী ফালুর ক্লাব ত্যাগের পর ক্লাব কর্মকর্তারা দু’ভাগে বিভক্ত হন।
জল ঘোলা করে অনেক নাটকের পর নতুন পরিচালনা পরিষদ দায়িত্ব নেন। সমপ্রতি ক্লাব সংস্কারের মাধ্যমে আধুনিক হলেও খেলার মাঠে সাফল্য পাচ্ছে না। ক্লাবের নতুন সভাপতি হয়েছেন দেশের বিশিষ্ট শিল্পপতি ওবায়েদুল করিম। তাঁর পরিকল্পনায় ক্লাব ভবনে বহুতল বিশিষ্ট আধুনিক টাওয়ার হবে, আর্থিক সঙ্কট দূর হবে, সাভারে নিজস্ব জমিতে আধুনিক স্টেডিয়াম হবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বল্প সময়ে ক্লাব মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। অন্যান্য ক্লাব হবে মোহামেডানের মডেল স্বরূপ। কিন্তুু এ হবেটা কবে? আবার সাদা-কালোর জার্সির সাফল্য গান বাজবে মাঠে। মোহামেডানের পক্ষে কি সম্ভব? শেষ কথা, সমর্থকদের ভালোবাসা ছাড়া যেমন ক্লাব চলতে পারে না ঠিক তেমনি অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে ভিত মজবুত না হলে কোনো ক্লাব টিকে থাকতে পারে না। দেশের লাখো সমর্থকের আশা—আবার জেগে উঠবে মোহামেডান সকল কর্মকর্তার সহযোগিতায়—ক্লাবে সুদিন ফিরে আসবে এবং সাদা-কালোর ভবিষ্যত্ উজ্জ্বল হবে।
ঢাকা