ছয় উপজেলার মানুষ দুর্ভোগে
রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি
কাপ্তাই হ্রদের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় বন্ধ হয় গেছে লঞ্চ চলাচল। এতে রাঙ্গামাটির ৬ উপজেলার প্রায় ২ লাখ মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে। গত ২২ এপ্রিল থেকে কাপ্তাই হ্রদ বেষ্টিত ৬টি উপজেলা বিলাইছড়ি-লংগদু-বরকল-জুরাছড়ি-বাঘাইছড়ি- নানিয়ারচর সবকয়টিতে লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। পানি কমে যাওয়ায় বিদ্যুত্ কেন্দ্রের উত্পাদন হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে নৌপরিবহনসহ হ্রদ ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা সংকট। হ্রদের নাব্য ফিরিয়ে আনতে জরুরি ভিত্তিতে ড্রেজিং-এর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
রাঙ্গামাটি কাপ্তাই হ্রদের রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার চেঙ্গী এবং লংগদু উপজেলার কাট্টলী বিল ছাড়া হ্রদের মূল ধারার সব জায়গাতে হ্রদের পানি কমে গিয়ে জেগে উঠেছে ডুবো চর। অনেক স্থানে পায়ে হেঁটে পাড়ি দেওয়া যায় হ্রদ। বন্ধ হয়ে গেছে যাত্রী পরিবহন। উপজেলা সদরগুলোতে লঞ্চ পৌঁছাতে পারে না আরো অনেক দিন আগে থেকে। যাত্রী সেবার কথা চিন্তা করে বর্তমানে ছোট ছোট ইঞ্চিন চালিত বোট দিয়ে যাত্রী পরিবহন সেবা দিচ্ছে রাঙ্গামাটি লঞ্চ মালিক সমিতি।
কাপ্তাই হ্রদবেষ্টিত নানিয়ারচর, বাঘাইছড়ি, লংগদু, বরকল, জুরাছড়ি, বিলাইছড়ির বিস্তীর্ণ জলাভূমি শুকিয়ে এখন মাঠ-প্রান্তরে রূপ নিয়েছে। হ্রদজুড়ে জেগে উঠেছে ডুবোচর। হ্রদের পানি অস্বাভাবিক হারে কমে যাওয়ায় জেলা সদরের সঙ্গে বিভিন্ন উপজেলায় নৌ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার উপক্রম। ডুবোচরে আটকে যাচ্ছে নৌযান। হ্রদে পানি কমে যাওয়ায় কাপ্তাই পানি বিদ্যুত্ কেন্দ্রে উত্পাদনে মারাত্মক ধস নেমেছে। ২৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রে বর্তমানে রেশনিং পদ্ধতিতে উত্পাদন হচ্ছে মাত্র ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্।
গত সোমবার কাপ্তাই পানি বিদ্যুত্ কেন্দ্রের প্রকল্প ব্যবস্থাপক এটিএম আবজ্জুর জাহের জানান, হ্রদে পানির স্তর এখন অনেক নিচে নেমে গেছে। বর্তমানে লেকে পানি ৮০.১৬, থাকার কথা ছিল ৮৩.৮০ এমএসএল (মীন সী লেভেল) বা ফুট। বর্তমানে কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে রেশনিং পদ্ধতিতে ৩টি ইউনিট দিয়ে ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন করা যাচ্ছে। সন্ধ্যায় আরেকটি ইউনিট চালু করে রেশনিং পদ্ধতিতে উত্পাদন চালু রাখা হয়। পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত এ অবস্থার উন্নতি হবে না বলে জানান তিনি।
রাঙ্গামাটি নৌপরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মঈন উদ্দিন সেলিম জানান, কাপ্তাই হ্রদের পানি অস্বাভাবিক হারে কমে যাওয়ায় ২২ এপ্রিল থেকে সবকয়টি উপজেলায় লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হ্রদের নাব্যতা কমে যাওয়ায় হ্রদের মূল চ্যানেলগুলো পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। সেই কারণে প্রতিবছর গ্রীষ্মের শুরুতেই ভোগান্তি পোহাতে হয় আমাদের। বর্তমানে লঞ্চসহ যানবাহন চলাচল করছে বিলাইছড়ি রুটে উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার নিচে নতুনবাজার ঘাট, জুরাছড়ি রুটে উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার নিচে সুবলং মিতিঙ্গ্যাছড়ি, বাঘাইছড়ি রুটে উপজেলার সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার নিচে লংগদু উপজেলার ফোরেরমুখ, নানিয়ারচর রুটে ১৫ কিলোমিটার নিচে বুড়িঘাট পর্যন্ত। এছাড়া বরকলের হরিণা রুটে লঞ্চ যাচ্ছে বরকল উপজেলা সদর পর্যন্ত।
বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান কমোডর মো. মাহাবুবুল ইসলাম জানান, কাপ্তাই হ্রদে যে সকল লঞ্চ চলাচল করে সেইগুলো আমাদের রুট। এসব রুটে লঞ্চ চলাচলে যে ব্যাঘাত সৃষ্ট হয়েছে তা খুবই দুঃখজনক। তিনি বলেন, হ্রদটি সরকারের হওয়ায় ড্রেজিং-এর বিষয়ে আমরা কিছু বলতে পারছি না। সরকার যদি আমাদেরকে কাজ করার অনুমতি দেয় এবং আমাদেরকে বলে তাহলে আমরা ড্রেজিং-এর চিন্তা-ভাবনা করবো। তিনি বলেন, আমরা আরো একটি রুট নিয়ে ভাবছি এটা হচ্ছে ঠেগামুখ স্থল বন্দর বা ট্রানজিট-এর জন্য যে পরিকল্পনা রয়েছে সেই রুটটি নিয়ে।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক এ কে এম মামুনুর রশিদ বলেন, ‘হ্রদের ড্রেজিং না হওয়া পর্যন্ত সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। কাপ্তাই হ্রদের ক্যাপিটাল ড্রেজিং করার জন্য আমরা বারবার উচ্চ পর্যায়ে চিঠি দিয়েছি। ইতোমধ্যে বিআইডব্লিউটিএর একটি প্রতিনিধি দল সার্ভে করে গেছে। তিনি বলেন, গত কয়েকদিন আগে বান্দরবানের নদী রক্ষা বিষয়ক মিটিং-এ আমি বিষয়টি জানিয়েছি। তারা বিষয়টি নোট করে নিয়েছে। তিনি বলেন, নাব্যতা সংকটে দিন দিন কাপ্তাই হ্রদ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। লঞ্চ চলাচলও বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি বলেন, আমি আগামীকালই আরো একটি পত্র দিবো এবং রাঙ্গামাটি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ডাকবো।