জলবায়ু পরিবর্তনের দায় নিয়ে ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে উন্নত দেশগুলো

জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য শিল্পোন্নত দেশগুলোই দায়ী- এই দায় নিয়ে ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে তারা। এই অর্থ ছাড়ের বিষয়ে আগামী সপ্তাহে চূড়ান্ত কাঠামো তৈরি হবে। তবে দ্বিতীয় মেয়াদে কিউটোপ্রটোকলে রাশিয়া, কানাডা ও জাপান স্বাক্ষর করবে না বলে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অব্যাহত চাপের মুখে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির দায় স্বীকার করে নিয়েছে শিল্পোন্নত দেশগুলো। এ ব্যাপারে শুক্রবার চলমান জলবায়ু সম্মেলনে চার দফা কর্মপরিকল্পনার একটি কর্ম পরিকল্পনা তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী দুই বছরে এই কর্ম পরিকল্পনা করা হবে। এদিকে ইউএনএফসিসিসি-এর নির্বাহী সেক্রেটারি ক্রিসটিনা ফিগার্স সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেছেন, ২০২০ সালে গিয়ে প্রতিবছর শিল্পোন্নত দেশগুলো ১০০ বিলিয়ন ডলার করে দেবে। বিষয়টি মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে চূড়ান্ত হবে। গত দুই বছরের চেষ্টা এবং গত চার দিনের দরকষাকষির ফলে উন্নত দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির দায় স্বীকার করে নিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশ ও ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ক্ষতিপূরণ পাবে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের জেলেরা যারা জীবিকা হারাবে কিংবা জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে তারা জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের লস এন্ড ডেমেজের আওতায় ক্ষতিপূরণ পাবে। তবে এই ক্ষতিপূরণ সহসা মিলবে না বলে মন্তব্য করেছেন ইউরোপীয় ক্লাইমেট ফাউন্ডেশনের ফেলো ড. বিরার্ট মিরটজ। তিনি গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, লস এন্ড ডেমেজের যে বিষয়টি বলা হচ্ছে তা আপেক্ষিক। যে যার মতের উপর নির্ভর করে এ বিষয়টি উপস্থাপন করছে। যার কারণে এ বিষয়ে ফল পাওয়া সময় সাপেক্ষ। দোহা সম্মেলনে এ বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত নাও হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন কনভেনশনের (ইউএনএফসিসিসি) নির্বাহী সেক্রেটারি ক্রিসটিনা ফিগার্স শুক্রবার কাতার ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে সাংবাদিক সম্মেলন করে আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে শিল্পোন্নত দেশগুলো যে একশত বিলিয়ন ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তার বিস্তারিত আগামী সপ্তাহে চূড়ান্ত হবে। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে পর্যায়ক্রমে অর্থ দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে। কিভাবে, কোন দেশ, কত করে এই অর্থ দেবে তা ঠিক হবে আগামী সপ্তাহে। তিনি বলেন, রাশিয়া, কানাডা ও জাপান দ্বিতীয় মেয়াদে আর কিউটোপ্রটোকলে স্বাক্ষর করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। তবে তারা কার্বন নির্গম কমাতে অন্য কার্যক্রমে অংশ নেবে। বাংলাদেশের একান্ত আগ্রহের কারণেই স্বল্পোন্নত দেশের কর্মসূচির তালিকায় জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়। সেই থেকে গত দুই বছর ধরে বাংলাদেশ জি ৭৭ ও চীন গ্রুপের পক্ষ থেকে এই বিষয়টি জাতিসংঘের জলবায়ু আলোচনার এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চালায়। গত ডারবান জলবায়ু সম্মেলনে এটি অন্তর্ভুক্ত হলেও এ নিয়ে উন্নত দেশগুলো বেশিদূর এগুতে পারেনি। কারণ উন্নত দেশগুলো এ ব্যাপারে বার বার আপত্তি জানিয়ে আসছিল। এ ব্যাপারে অগ্রগতির সবচেয়ে বড় বাধা ছিল যুক্তরাষ্ট্র। তারা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে ক্ষতি হয় সেই বিষয়টিই স্বীকার করতে চাইছিল না। কারণ এটি স্বীকার করে নিলে তাদেরকে দায় স্বীকার করতে হবে। আর দায় স্বীকার করলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। গত চার দিন আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র চাপাচাপি করছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির বিষয়টি এডাপটেশন বা অভিযোজনের আওতায় নিয়ে আসতে। কিন্তু এলডিসির পক্ষে বাংলাদেশ বলে আসছিল, অভিযোজনের মাধ্যমে সব ক্ষতি পোষানো যাবে না। যারা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জীবিকা হারাবে কিংবা বাস্তুচ্যুত হবে তাদের কিভাবে খাপ খাওয়ানো হবে। এজন্য এডাপটেশন প্লাস একটি মেকানিজম প্রয়োজন। আর সেই মেকানিজমই হলো ‘লস এন্ড ডেমেজ’ বা জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয় ও ক্ষতি এবং এর মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ প্রদান। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য শেষ পর্যন্ত চাপাচাপি করছিল, এ বিষয়টিকে বীমার ওপর ছেড়ে দিতে। কিন্তু এক্ষেত্রেও স্বল্পোন্নত দেশের যুক্তির কাছে তারা হেরে যায়। এক্ষেত্রে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর যুক্তি হলো- লাভজনক না হলে কোন বীমা কোম্পানি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির দায় নেবে না। যেখানে অব্যাহত ক্ষতি দেখবে সেখানে বীমা কোম্পানিগুলো এগিয়ে আসবে না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে বীমা আসুক। কিন্তু কোনভাবেই ক্ষতিপূরণের দায় দায়িত্ব বীমার ওপর ছেড়ে দেয়া চলবে না। উন্নত দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিপূরণ দিতেই হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ দরকষাকষি দলের সদস্য ড. মঞ্জুরুল হান্নান খান বলেন, জলবায়ুু পরিবর্তনের ক্ষতির ৯০ শতাংশ পর্যন্ত অভিযোজন কার্যক্রমের মাধ্যমে মেটানো সম্ভব। কিন্তু বাকী ১০ শতাংশের জন্য এডাপটেশন প্লাস প্রয়োজন।