বিজয়ের মাস
প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০১২, ২২:২৩
জাতির জীবনে আবারো এসেছে বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। কোটি মানুষের হূদয়ে এই ডিসেম্বর আসে প্রেরণা, প্রতিজ্ঞার বার্তা নিয়ে। প্রতিকূল পরিস্থিতিকে পরাজিত করে সুন্দর, সত্যের পথে লড়াইয়ের সঞ্জীবনী শক্তি লুকিয়ে রয়েছে এই ডিসেম্বরে। ‘বাংলাদেশ’ রাষ্ট্রের পরিচয়ে মাথা তুলে দাঁড়াবার চূড়ান্ত বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। সেই অনন্য অর্জন অন্যদিকে এই ডিসেম্বর স্বজন হারানোর মাস। ৩০ লক্ষ প্রাণ ও অসংখ্য নারীর সম্ভ্রম হারানোর বেদনা মিশে আছে এই বিজয়ের ক্ষণে।
ডিসেম্বর স্মরণ করিয়ে দেয় মুক্তিযুদ্ধে নেয়া ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তোলার রক্তশপথের কথা। মনে করিয়ে দেয় ৪১ বছর ধরে সেই লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া এই স্বাধীন দেশে অনাহারে, অভাবে থাকা মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর কথা। তাই এই ডিসেম্বর অঙ্গীকারের মাস, প্রত্যয়বদ্ধ হবার মাস। বাবা হারানো সন্তানের কাছে, স্বামী হারানো স্ত্রীর কাছে, মেয়ে হারানো পরিবারের কাছে জাতি, রাষ্ট্র, সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহিতার মাস এই ডিসেম্বর। বাঙালি জাতির জীবনে ডিসেম্বর নতুন করে শপথ নেবার মাস।
মুক্তিযুদ্ধের ৪১ বছর পরও আমরা জাতিগত জীবনে যা অর্জন করতে পারিনি, জাতি হিসেবে আমাদের যা স্খলন—তার উত্তরণ ঘটিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শকে সমাজে, রাষ্ট্রে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য শপথ নেয়ার মাস ডিসেম্বর।
মুক্তিযুদ্ধের পর গত ৪১ বছরে জনগণের দীর্ঘ আন্দোলনের পরও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি আজো বাস্তবায়িত হয়নি। অনেক আশা জাগিয়ে এই বিচার কাজ শুরু হয়েছে। এই বিচার কাজ ভণ্ডুল করতে প্রতিক্রিয়াশীল জামায়াত-শিবিরচক্র খুবই সক্রিয়। এই চক্রান্তকে মোকাবিলা করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাস্তবায়নের জন্য অঙ্গীকারের মাস ডিসেম্বর।
আজ পহেলা ডিসেম্বর। এই সময় সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধ সর্বাত্মক রূপ পেয়েছে। পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আক্রমণের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে। সারাদেশে চলতে থাকে ব্যাপক যুদ্ধ। ১৯৭১ সালের এই দিনে নিউইয়র্ক টাইমসের পত্রিকার এক রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গেরিলা তত্পরতা বৃদ্ধি পাবার ফলে পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তাদের নির্দেশে সামরিক বাহিনীর লোকেরা পুনরায় গ্রামবাসীদের হত্যা এবং বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেবার বর্বর অভিযান শুরু করেছে। গেরিলা সন্দেহে জিঞ্জিরার কতজন যুবককে যে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে হত্যা করেছে তার ইয়ত্তা নেই। বুড়িগঙ্গার অপর পাড়ের এই গ্রামটিতে অন্তত ৮৭ জনকে সামরিক বাহিনীর লোকেরা হত্যা করেছে। এদের অধিকাংশই যুবক। নারী ও শিশুরাও ওদের হাত থেকে রেহাই পায়নি।
এদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পার্লামেন্টের উচ্চ পরিষদে বক্তৃতাকালে উপমহাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানি সৈন্য অপসারণের নির্দেশ দেয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানি সৈন্য অপসারণই সমস্যার শ্রেষ্ঠ সমাধান। এই বক্তৃতায় তিনি ভবিষ্যত্ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের জনসাধারণকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।
এদিন রাওয়ালপিন্ডিতে একজন সরকারি মুখপাত্র জানায়, অধুনালুপ্ত আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার এখনও শেষ হয়নি। তিনি বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের চারটি রণাঙ্গণে যে আক্রমণাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়েছিল তা এখনো অব্যাহত রয়েছে। ’৭১ সালের এই দিনে মুক্তিযোদ্ধারা অপারেশন চালিয়ে ঢাকায় দুজন মুসলিম লীগ কর্মীকে হত্যা করে। বাকি দুজনকে বুলেটবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এদিকে মুক্তিযোদ্ধারা শেষরাতের দিকে সিলেটের শমসেরনগরে অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে পাকবাহিনীকে নাজেহাল করে তোলে। মুক্তিবাহিনীর তীব্র আক্রমণে পাকবাহিনী এই এলাকা থেকে পালাতে শুরু করে। মুক্তিবাহিনী টেংরাটিলা ও দুয়ারাবাজার মুক্ত ঘোষণা করে। মুক্তিবাহিনীর অপারেশন অব্যাহত থাকায় পাকবাহিনী এই জেলার গারা, আলিরগাঁও, পিরিজপুর থেকে তাদের বাহিনী গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
এদিকে পিপলস পার্টির ঢাকা অফিস বোমা বিস্ফোরণের ফলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জুলফিকার আলী ভুট্টো দুমাস আগে এ অফিস উদ্বোধন করেন। রাঙ্গামাটিতে ব্যাপটিস্ট মিশনে হানাদার বাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত হয়ে চার্লস আর. হাউজার নামে একজন ধর্মযাজক এবং বহু বাঙালি সন্ন্যাসী নিহত হন।