পাহাড়ে শান্তি আসেনি
তরুণ ভট্টাচার্য, খাগড়াছড়ি ও মিলন চক্রবর্তী, বান্দরবান প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:০৪
পার্বত্য শান্তি চুক্তির দীর্ঘ ১৫ বছরেও পাহাড়ে শান্তি আসেনি। ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকার শান্তি চুক্তি করলেও পার্বত্যাঞ্চলে অস্ত্রের ঝনঝনানি এখনো থামেনি। পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাতিল কিংবা চুক্তি সংশোধনের দাবিতে সমঅধিকার আন্দোলন ও ইউপিডিএফ এবং চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) আন্দোলন আর সংঘাতে আজও অস্থির পাহাড়ি জনপদ।
আজ রবিবার ২রা ডিসেম্বর শান্তি চুক্তির ১৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে সমঅধিকার আন্দোলন ও জনসংহতি সমিতি তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙামাটি এবং খাগড়াছড়িতে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। চুক্তির পক্ষে অবস্থানকারী আওয়ামী লীগ ও জনসংহতি সমিতি শান্তি চুক্তির ১৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র্যালি, আলোচনাসভা এবং অপরদিকে চুক্তি বাতিলের দাবিতে সমঅধিকার আন্দোলন ও বিএনপি নেতারা কালো পতাকা উত্তোলন, কালো ব্যাজ ধারণ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে।
পার্বত্য শান্তি চুক্তির ১৫ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের সর্বত্র শান্তি বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। আমরা শান্তির এ বার্তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে চাই। তিনি শান্তি চুক্তির ১৫ বছর পূর্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামবাসীসহ দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের দীর্ঘদিনের সংঘাতময় পরিস্থিতি নিরসনের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর কোন তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা ছাড়াই তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে এই ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বিশ্বে এটি বিরল ঘটনা। এই চুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে দীর্ঘদিনের জাতিগত হানাহানি বন্ধ হয়। অনগ্রসর ও অনুন্নত পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ও উন্নয়নের ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির জন্য ইউনেস্কো শান্তি পুরস্কার অর্জন এই চুক্তির আন্তর্জাতিক প্রশংসা ও স্বীকৃতির প্রতীক।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫-পরবর্তী সরকারগুলো পার্বত্য অঞ্চলের সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পরিবর্তে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য বাঙালি-পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে। খুন, রাহাজানি, অন্যের সম্পদ জবরদখল এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার এ অঞ্চলকে আরো অস্থিতিশীল করে তোলে। এমন প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি দেশের অখণ্ডতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার লক্ষ্যে একটি মহান পদক্ষেপ হিসাবে সর্বমহলে প্রশংসিত হয়। পরবর্তী বিএনপি-জামায়াত জোট ঐতিহাসিক এই চুক্তির চরম বিরোধিতা করে পার্বত্য অঞ্চলকে পুনরায় অস্থিতিশীল করতে চেয়েছিল। ‘পার্বত্য চুক্তির আলোকে এ অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের জন্য আমরা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করি। সরকার এ অঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুত্, যোগাযোগসহ সকল খাতের উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে।’ তিনি পার্বত্য শান্তি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।
পাহাড়ি-বাঙালি দ্বন্দ্বের সুযোগে চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে চলেছে অস্ত্রধারীরা। চাঁদাবাজি আর অপহরণ পার্বত্যবাসীর জীবনে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পার্বত্য শান্তি চুক্তি সম্পাদনকারী আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের কথা বললেও জনসংহতি সমিতির নেতারা এটিকে সময়ক্ষেপণের বাহানা হিসাবে দেখছে। ভূমি সমস্যার সমাধান ছাড়া শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফিরিয়ে আনতে ভূমি সমস্যা সমাধানে গঠিত ভূমি কমিশনকে কার্যকর এবং শান্তি চুক্তির সাংঘর্ষিক ধারাগুলোর সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন জেএসএস নেতারা। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমাসহ জেএসএস নেতাদের দাবি, জুম্ম জনগণ ও পার্বত্যাঞ্চলের স্থানীয় অধিবাসীদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন করছি এবং শান্তি চুক্তি সম্পাদন করেছি। কিন্তু সরকার ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের কথা বললেও কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয়নি। শান্তি চুক্তির ধারা অনুযায়ী জেএসএস সকল শর্ত পূরণ করলেও সরকার শর্ত পূরণ করেনি। সরকারের উচিত শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন করা। অপরদিকে শান্তি চুক্তি বাতিল, পাহাড়ি-বাঙালি সমান অধিকার নিশ্চিত এবং ভূমি জরিপ সম্পাদন ছাড়া পার্বত্যাঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয় বলে দাবি করেছে সমঅধিকার আন্দোলন পরিষদের নেতাকর্মীরা। এছাড়া তিন পার্বত্য জেলায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে শান্তি চুক্তির মৌলিক ধারাগুলোর সংশোধন জরুরি বলে দাবি করেছে পার্বত্য চুক্তিবিরোধী সংগঠন ইউনাইটেড পিপ্লস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)।
১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর সরকারের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হয় জনসংহতি সমিতির শান্তি বাহিনীর সদস্যরা। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তিন পার্বত্য জেলায় প্রায় দুই হাজার শান্তি বাহিনী সদস্য অস্ত্র সমর্পণ করে ‘স্বাভাবিক জীবনে’ ফিরে আসে। সরকার সে সময় শান্তি বাহিনীর সদস্যদের আর্থিক সহযোগিতা এবং যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি চাকরি দেয়। এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের সদস্য কাজী মজিবর রহমান বলেন, শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসাবে সরকার তিন পার্বত্য জেলা থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্প প্রত্যাহার করে। তিন পার্বত্য জেলার জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন করেছে। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক সরকার। চুক্তির ৮০ ভাগ শর্ত ইতিমধ্যে পূরণ করেছে সরকার এবং বাকিগুলো পূরণ করবে পর্যায়ক্রমে। চুক্তি বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে সন্তু লারমা মিথ্যাচার করছেন।
অপরদিকে বিএনপি নেতা ও বান্দরবান সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল কুদ্দুছ বলেছেন, একতরফা শান্তি চুক্তি করা হয়েছে। চুক্তিতে নিরীহ উপজাতি ও বাঙালির ক্ষতি করা হয়েছে। শান্তি চুক্তি বাতিল অথবা সাংঘর্ষিক ধারাগুলো সংশোধন করলে পাহাড়ে শান্তি ফিরে আসবে। বস্তুত শান্তি চুক্তি হলেও পাহাড়ে প্রকৃত অর্থে শান্তি এখনো ফিরে আসেনি। শান্তি চুক্তি নিয়েই পাহাড়িদের মধ্যে রয়েছে দ্বিধা-বিভক্তি। শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের দাবি করছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। অপরদিকে চুক্তি সংশোধনের দাবিতে আন্দোলন করছে প্রসিত খিসা সমর্থিত ইউপিডিএফ। এই দুটি সংগঠন পাহাড়ে অসংখ্য ভ্রাতৃঘাতি যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত এদের দ্বন্দ্ব-সংঘাতে পাহাড়ে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় চারশ মানুষ, আহত হয়েছে কয়েক হাজার। অপরদিকে বাঙালি সমর্থিত পার্বত্য সমঅধিকার আন্দোলন পরিষদ প্রথম থেকেই চুক্তির বিরোধিতা করে আসছিল। সমঅধিকার আন্দোলন এই চুক্তিকে কালো চুক্তি আখ্যায়িত করে চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই আন্দোলন করে আসছে।
’৯৭ সনের ২রা ডিসেম্বর চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর প্রকাশ্যে ও অন্তরালে পরস্পরবিরোধী তত্পরতা শুরুর পর অশান্তির যে দাবানল ছড়িয়ে পড়ে তা প্রশমিত হয়নি। পাহাড়ে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ও ইউনাইটেড পিপ্লস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের দ্বন্দ্ব-সংঘাতে গত ১৫ বছরে অন্তত ৩৩০ জন নেতাকর্মী হয় বন্দুকযুদ্ধে নয় চোরাগোপ্তা হামলায় নিহত হয়েছেন। জেএসএস সভাপতি সাবেক গেরিলা নেতা জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার দাবি ঃ ১৫ বছরে ইউপিডিএফ জেএসএসের ৮৬ জন নেতাকর্মীকে হত্যা, অসংখ্য মানুষকে হত্যা, কয়েক হাজার মানুষকে ভিটেমাটি ছাড়া করেছে। লারমা বলেন, ইউপিডিএফ পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে অন্যতম বাধা। পক্ষান্তরে ইউপিডিএফের শীর্ষনেতা প্রসীত খীসা জানান, চুক্তি সম্পাদনের পর থেকে আজ পর্যন্ত ইউপিডিএফের ২৩১ জন নেতাকর্মী ও সমর্থক সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএসের হাতে প্রাণ হারান।
একদিকে সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তির বিভিন্ন শর্ত বাস্তবায়ন প্রশ্নে টানাপড়েন এখন চরমে, অন্যদিকে চুক্তির পক্ষে-বিপক্ষে বাঙালি ও উপজাতীয়দের বিভিন্ন গ্রুপের মতবিরোধও চরমে। চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে পরস্পর বিরোধী অবস্থানের কারণে এ অঞ্চলের মানুষের জন্য সুখ ও শান্তি এখনো সোনার হরিণ। পার্বত্য চট্টগ্রাম জুড়ে জেএসএস ও ইউপিডিএফ’কে দ্বন্দ্ব-সংঘাত পরিহার করে অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য ঐক্য স্থাপনের আহ্বান জানানো সত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রামে বন্ধ হয়নি সংঘাতের রাজনীতি।
ইদানীং পাহাড়ি গ্রাম-গঞ্জে, যানবাহনে ও হাট-বাজারে একশ্রেণীর উপজাতীয় অস্ত্রধারী ও চাঁদাবাজের তত্পরতা বেড়ে গেছে। তবে তারা কোন রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত কি-না; নাকি শুধু চাঁদাবাজির জন্যই পাহাড়ে নিজেদের বিস্তার ঘটাচ্ছে তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, পাহাড়ে এখন বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে যে গ্রুপগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদের কাছে রয়েছে অত্যাধুনিক অস্ত্র। অর্থ আর অস্ত্রের যোগান পেয়ে সন্ত্রাসী এই গ্রুপগুলো দ্রুত নিজেদের সংগঠিত করে তুলছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।
রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি একেএম মকছুদ আহমেদ জানান, ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি সম্পাদনের দিনই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িরা। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি ও গেরিলা নেতা সন্তু লারমাকে বিশ্বাসঘাতক আখ্যায়িত করে পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্ণাঙ্গ স্বায়িত্বশাসন দাবি করে ইউনাইটেড পিপ্ল্স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) নামে নতুন সংগঠন গঠন করে পাহাড়িদের একাংশের নেতারা। এরপর থেকে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে জড়িয়ে পড়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। অশান্ত হয়ে উঠে পার্বত্য চট্টগ্রাম। গত ১৫ বছরে এই ভ্রাতৃঘাতি সংঘর্ষে জেএসএস ও ইউপিডিএফ-এর ৩ শতাধিক নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। জেএসএস সভাপতি সন্তু লারমার দাবি, এ পর্যন্ত জেএসএসের ৮৬ জন নেতা-কর্মীকে হত্যা করেছে ইউপিডিএফ। আর ইউপিডিএফ-এর প্রদীপণ খীসার দাবি, ইউপিডিএফ-এর ২৩৩ জন নেতাকর্মীকে হত্যা করেছে জেএসএস।
শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সন্তু লারমা বললেনঃ ইতিমধ্যে যে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছি তা হচ্ছে, পার্বত্য সমস্যার সমাধান হয়নি। বরঞ্চ পার্বত্যাঞ্চলের সমস্যা আরো ঘনীভূত হয়েছে। বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অচল অবস্থার মধ্যে রয়ে গেছে। বাস্তবায়নে যে বিষয়গুলো জরুরি সে বিষয়গুলো বাস্তবায়ন হয়নি।