দেশে উত্পাদিত সবজির ২৫ ভাগই নষ্ট হচ্ছে!
অলক বিশ্বাস ও আনিসুর রহমান মণ্ডল
প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:১১
বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়ায় ত্রুটির কারণে দেশে উত্পাদিত শাক-সবজি ও ফলমূলের প্রায় শতকরা ২৫ ভাগই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চাষি থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত ব্যবসায়ীরা। আর এর প্রভাব পড়ছে গোটা বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর। ফলে পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে খুচরা ক্রেতাদের। অথচ চাষিরা একটু সচেতন হলে আর কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া আধুনিকায়ন করলে এই ক্ষতি অনেকাংশেই রোধ করা সম্ভব বলে মনে করেন কৃষি বিশেষজ্ঞ ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
রাজধানীর বেশ কয়েকটি বাজার পরিদর্শন করে দেখা গেছে সচেতনতার অভাব ও অব্যবস্থাপনার কারণেই নষ্ট হচ্ছে সবজি। অথচ এই শাক-সবজি কিনতে গিয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। উত্পাদক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, বাজারজাতকরণের প্রত্যেকটি ধাপেই সবজির একটি বড় অংশ পচে-গলে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ভোক্তার হাত পর্যন্ত পৌঁছাতে এই সমস্ত পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে দ্বিগুণেরও বেশি।
রাজধানীর গাবতলী, কারওয়ান বাজার ও শ্যামবাজারে গেলেই চোখে পড়ে নষ্ট হয়ে যাওয়ার সবজির স্তূপ। বাজারের ভেতর প্রবেশ করতেই দেখা যায় পচে-গলে যাওয়া সবজির সবুজ আস্তরণ। অনেক কষ্টের ফসল নিজ হাতেই ফেলে দিচ্ছেন কৃষক। এছাড়া সামান্য কারণেও সবজির মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেন একশ্রেণির ব্যবসায়ী। রাজধানীর বাইরে থেকে আসা ব্যবসায়ী ও কৃষকদের অভিযোগ, সবজিতে সামান্য আঘাতের চিহ্ন থাকলেও দাম কমানোর জন্য বাহানা শুরু করে দেন আড়তদাররা।
চুয়াডাঙ্গা থেকে কারওয়ান বাজারে ফুলকপি এনেছেন
জলিল। এ বছর প্রায় পাঁচ একর জমিতে ফুলকপির চাষ করেছেন। জলিল জানান, এলাকার বাজারে একত্রে বেশি ফুলকপি বিক্রি করা যায় না। তাই ট্রাক ভাড়া করে নিজেই নিয়ে এসেছেন রাজধানীর বাজারে। কিন্তু এখানেও বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে তাকে। ট্রাক থেকে নামানোর পর বাছাই করে একটি বড় অংশ তিনি ফেলে দিয়েছেন। তবু কপির গায়ে সামান্য দাগ দেখলেও ব্যবসায়ীরা নানা ছুতোয় দাম কমানোর চেষ্টা করছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এত খরচা করি ফসল ফলাই আমরা আর লাভ করেন ঢাকাওয়ালারা। এলাকায় বিক্রির সুযোগ থাকলি ঢাকায় আসতাম না। এখানে কথা বলতিও টাকা লাগে।’ তিনি জানান, এক ট্রাক ফুলকপির মধ্যে প্রথমেই প্রায় ৪০/৫০ পিস নষ্ট বের হয়। আর একদিন বাজারে থাকলে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়।
বাজারের বিভিন্ন শ্রেণির ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখন শীতকাল হওয়ায় সবজির পচন কিছুটা কম। তবে কাঁচা মরিচ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, মিষ্টিকুমড়া, লাউ ও ধনে পাতা বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে। আড়তদাররা জানান, দূর-দূরান্ত থেকে যেসব শাক-সবজি রাজধানীতে আসছে সেগুলোতে পচন ধরে খুব দ্রুত। তাই এসব পণ্যের মানের ওপর দাম নির্ভর করে। বেশিরভাগ পণ্যই দুই-একদিনের বেশি রাখা যায় না।
সবজির পচন রোধ করার উপায় প্রসঙ্গে পরিচয় গোপন রেখে গাবতলী বাজারে কথা হয় কয়েকজন চাষির সাথে। তারা মনে করেন বাজারে টাটকা সবজি নিয়ে আসতে হলে ফরমালিন ব্যবহারই হচ্ছে একমাত্র ব্যবস্থা। ফরমালিন দিলেই পচন কিছুটা কমানো যায়। তবে ফরমালিনের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা কোন জবাব না দিয়ে চুপ থাকেন।
এ বিষয়ে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ‘সমন্বিত মানসম্পন্ন উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্প-২য় পর্যায়’-এর উপ-পরিচালক শাহনাজ বেগম নীনা বলেন, এ সমস্ত পণ্য বাজারে আনার আগে কয়েকটি ধাপে কাজ করতে হয়। জমি থেকে উত্তোলনের পর সেগুলো পরিষ্কার, বাছাই ও প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করলে শতকরা ৫-১০ ভাগ পণ্য ক্ষতির হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব। তিনি বলেন, জমি থেকে ফসল সংগ্রহ করার সাথে সাথে সেগুলো পরিষ্কার ও ‘গ্রেডিং’ করা উচিত। ভালোগুলো একদিকে এবং হালকা পচা বা থেতলে যাওয়াগুলো আলাদা করলে কৃষক ভালো পণ্যগুলোর জন্য ভালো দাম পেতে পারে।
নীনা আরো বলেন, কৃষিপণ্য মাঠ থেকে তোলার সময় কিছু পদ্ধতি অবলম্বনের পাশাপাশি সেগুলোকে দূরের বাজারে পাঠানোর আগে সঠিক পদ্ধতিতে ট্রাকে তোলা হলে পচন অনেকটাই রোধ করা যায়। অনেক সময় ব্যবসায়ীরা ট্রাকে ধারণ ক্ষমতার বেশি পণ্য পরিবহন করতে গিয়ে এক-তৃতীয়াংশ পণ্যই নষ্ট করে ফেলেন। তিনি জানান, এ ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে এবং কৃষকদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে সরকারিভাবে ১২টি জেলায় কৃষকদের বাজারজাতকরণের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ১৮ হাজার কৃষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরো ব্যাপক প্রশিক্ষণ কর্মশালার মাধ্যমে কৃষকদের দক্ষ করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।
এ বিষয়ে সরকারি কর্মকাণ্ডের পরিধি সম্পর্কে খোঁজ নিতে সংশ্লিষ্ট কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পাইকারি ব্যবসায়ী, ক্রেতা ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাতকরণের ওপর সরকারের কৃষি বিপণন অধিদপ্তর কিছু কাজ করলেও ব্যাপক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে তা কোন সুফল বয়ে আনতে পারছে না। পচন রোধে করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. গোলাম রাব্বানী বলেন, দেশের উত্পাদিত শাক-সবজি ও ফলমূলের শতকরা প্রায় ২৫ ভাগ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অথচ এত বড় ক্ষতির দিকে কারো তেমন নজর নেই। তিনি আরো বলেন, বিদেশে কৃষকদের পণ্য বাজারজাতকরণের জন্য সরকারিভাবে কুলভ্যান ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দিয়ে সহায়তা করা হয়, আমাদের দেশে এখনো এ বিষয়ে তেমন কোন কাজ হয়নি। তাছাড়া সচেতনতামূলক ধাপগুলো সম্পর্কেও কৃষক রয়ে গেছে অন্ধকারে।
অধ্যাপক রাব্বানী আরো বলেন, রাজধানী ও দেশের বড় শহরের পাইকারি বাজারগুলোতে কোল্ডস্টোরেজের ব্যবস্থা করা গেলে কৃষকরা সময় নিয়ে তাদের পণ্য সঠিক দামে বিক্রি করতে পারবে। সেক্ষেত্রে বাজারে আড়তদাররা তাদের পণ্যের মান নিয়ে কমমূল্যে কেনার সুযোগ পাবে না। ক্রেতারাও পাবে তরতাজা শাক-সবজি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারিভাবে রাজধানীর গাবতলী কাঁচাবাজারে ছয়টি কুলভ্যানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখান থেকে এই গাড়িগুলো কৃষকরা ভাড়া নিতে পারেন। ২৪ ঘণ্টায় একটি গাড়ির ভাড়া ৪ হাজার টাকা। অনেক ফুলচাষি এই গাড়ির ব্যাপারে আগ্রহ দেখালেও ব্যয়বহুল হওয়ায় সবজি চাষিরা এতে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছেন না ।
প্রসঙ্গত সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মনজুর হোসেন জানিয়েছেন, কৃষকরা উত্পাদিত পণ্যের যথাযথ দাম না পাওয়ায় কৃষিপণ্য উত্পাদনে উত্সাহ হারাচ্ছে। তাই সরকার কৃষকদের সংগঠিত করে সমবায় ভিত্তিতে কৃষিপণ্যের উত্পাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের উদ্যোগ নিয়েছে। এজন্য সারাদেশে ৬৮টি কৃষি মার্কেট গড়ে তোলা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ বিভাগও পুনর্গঠন করা হচ্ছে। এতে কৃষকরা একটি নির্দিষ্ট স্থানে উত্পাদিত পণ্য বিক্রির সুযোগ পাবে। ফলে কৃষকরা কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবে এবং ফসল চাষে আগ্রহী হবে। তবে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা এসব উদ্যোগের বিষয়ে তারা তেমন কিছুই জানেন না বলে জানান।