মুক্তিযুদ্ধের মনস্তাত্ত্বিক ফ্রন্ট
প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:১২
পাকিস্তানি দুঃশাসনের সময়ের যে ২৩ বছর বৈষম্য এবং বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে যে গণতান্ত্রিক আন্দোলন সূচিত হয়েছিল তারই চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। আমা-দের সংগ্রামের ঐতিহ্য তিতুমীর-সূর্যসেন থেকে শুরু করে সালাম-বরকত-রফিক-জব্বার হয়ে আসাদ- মতিউর-সার্জেন্ট জহুর— নিজেদের অমূল্য প্রাণ বিসর্জন যে পথ দেখিয়ে গিয়েছিলেন— তাই আমরা অবশেষে জানলাম লড়াইয়ের সেই পথ ছাড়া আমাদের মুক্তি নেই।
মানুষ ক্ষোভে-বিক্ষোভে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠছিল ক্রমশ। এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার দল পাকিস্তানি সেনা শাসকের ঘোষিত জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিপুলভাবে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল প্রাদেশিক এবং জাতীয় পরিষদে। কিন্তু বাঙালির এই বিজয়কে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও ক্ষমতার পাঞ্জাবি ক্লিক গ্রহণ করতে পারেনি। এই দুই রাজনৈতিক ও সামরিক সমঝোতার কারণেই অবশেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে যে ডাক দিয়েছিলেন তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসমুদ্রে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করলেন— ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। তিনি তাঁর বক্তব্যে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার এবং পাড়ায়-মহল্লায় প্রতিরোধ কমিটি গঠনের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এ সময়ে আমি ঢাকার একটি দৈনিক পূর্বদেশ-এ চিফ সাব-এডিটর হিসেবে কর্মরত এবং পূর্ব-পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। এখান থেকেই আমি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার লক্ষ্য স্থির করে আগরতলা হয়ে কলকাতায় পৌঁছালাম। সেখানে আমি পৌঁছে জানতে পারলাম, ২৫ মে বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের জন্মদিনে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু হতে যাচ্ছে। আমি বেতার কেন্দ্রের অফিসের খোঁজ করতে গিয়ে বাংলাদেশ মিশনের সামনে আমিনুল হক বাদশার দেখা পেলাম। তিনি আমাকে বালিগঞ্জের সার্কুলার রোডের একটি বাড়িতে নিয়ে গেলেন। এখানেই স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রের পত্তন হলো। তবে বেতার কেন্দ্রের ট্রান্সমিটারটি কোথায় ছিল তা আজও আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে খুবই গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়েছিল। আমরা কেবল অনুষ্ঠান রেকর্ড করে স্পুলটি বিএসএফের মাধ্যমে ট্রান্সমিটার ভবনে পাঠিয়ে দিতাম। শুনেছি, সেই ভবনটি সীমান্তের কাছাকাছি কোনো একটি অঞ্চলে ছিল। এই বেতার কেন্দ্রে শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব—যারাই অংশগ্রহণ করতেন—তারাই গান পরিবেশন, কথিকা লেখা, জল্লাদের দরবার নাটিকা উপস্থাপনা, চরমপত্র পাঠ এবং নিয়মিতভাবে বাংলা, ইংরেজি ও উর্দু সংবাদ বুলেটিন প্রচার করতেন। প্রথমে সংক্ষিপ্ত দুটি অধিবেশন হলেও পরবর্তীকালে সকাল, দুপুর এবং সন্ধ্যায় মোট তিনটি অধিবেশন চালু করা হয়েছিল।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছিল মুক্তিযুদ্ধের মনস্তাত্ত্বিক ফ্রন্ট। আমরা মনে করতাম, এই বেতার কেন্দ্র নিয়মিত আয়োজন নির্দিষ্ট সময়ে প্রচার না হলে—যারা শুনতেন—অবরুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষ ও বাঙ্কারে থাকা মুক্তিসেনারা বিপন্নবোধ করবেন। যে কারণে আমরা সজাগ থাকতাম—কোনোভাবেই যেন আমাদের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত না হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল সিপিএম যখন ‘বন্ধ’ ডাকতো তখন তা হতো আমাদের জন্য বিপদ। কারণ কোনো কাক-পক্ষীও সেই সময়ে রাস্তায় বের হতো না। এমনিভাবে একবার সিপিএম ৭২ ঘন্টা অর্থাত্ নিরবচ্ছিন্ন ৩ দিনের ‘বন্ধ’ ডেকেছিল। তখন আমরা মাঝে-মধ্যে রণাঙ্গন থেকে শহরে আসা মুক্তিসেনাদের কাছ থেকে পাওয়া ছক দেখে আমাদের পর পর তিনদিনের ২৭টি সংবাদ বুলেটিন আগেই তৈরি করে পাঠিয়ে দিতে হয়েছিল। এখানেই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের যথার্থতা প্রমাণিত হয়েছে।
ইতিমধ্যেই ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইষ্টার্ন কমান্ড ও মুক্তিবাহিনীর সমন্বয়ে মিত্র বাহিনী গঠিত হয়েছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দুর্বলতা, মুক্তিবাহিনীর হাতে প্রচণ্ড মার খাওয়া এবং নৈতিকভাবে মনোবল ভেঙ্গে যাওয়ায় আমরা বুঝতে পারলাম—সামনেই আমাদের বিজয়। একদিন হঠাত্ করে ট্রানজিমটারের নব ঘোরাতে ফেরাতে হঠাত্ করে ধরে ফেললাম—নিয়াজী-অরোরার কথোপকথন। তা থেকে বুঝতে পারলাম—পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে কোনো মুহূর্তে আত্মসমর্পণ করবে। এছাড়াও আমরা মিত্রবাহিনীর সদর দপ্তর ফোর্ট উইলিয়াম থেকে জানতে পারলাম—১৬ ডিসেম্বর বিকাল ৪টায় পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের সময় নির্বাচিত হয়েছে। তখন বেতার কেন্দ্রে আমাদের প্রস্তুতি নেয়ার পালা। সংবাদ বিভাগের প্রধান হিসেবে আত্মসমর্পণের সংবাদটি আমি লিখতে বসলাম এবং আমার অনন্য প্রাপ্তি যে— আমার কণ্ঠে বিজয়ের সংবাদটি বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিয়েছিলাম।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র