আমিরকে গ্রেফতারে বার দিনের ইঁদুর বিড়াল খেলা!
প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:১৩
কেরানীগঞ্জের চাঞ্চল্যকর শিশু পরাগ মণ্ডল অপহূত হয় গত ১১ নভেম্বর বরিবার সকালে। অপহরণকারীরা যাতে তাকে হত্যা না করে সেজন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বেশ সতর্কতার সঙ্গে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। পরাগকে উদ্ধারে গোয়েন্দা পুলিশ প্রথমে আটক করে অপহরণের মূল হোতা আমিরের শ্যালক মামুনসহ বেশ কয়েকজন আত্মীয়কে। তাদের দিয়ে বিভিন্ন কৌশলে আমিরের উপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। ফলে অপহরণের ৪৮ ঘণ্টা পর অচেতন অবস্থায় পরাগকে উদ্ধার করা হয় কেরানীগঞ্জের আটিবাজার এলাকা থেকে। শেষটায় গোয়েন্দারাই তাকে ভর্তি করে স্কয়ার হাসপাতালে। তবে উদ্ধারে মুক্তিপণ দেয়া নিয়ে তৈরি হয় বিতর্ক। ঢাকা জেলা ও মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধারে মুক্তিপণ দিতে হয়নি। আর র্যাব ঐদিনই বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের কাছে জানায়, ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণের বিনিময়ে পরাগকে অপহরণকারীরা ফিরিয়ে দিয়েছে। কথাগুলো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার।
তিনি আরও বলেন, র্যাব পুলিশ বাহিনীর একটি সংস্থা। তা সত্ত্বেও সফলতা আর ব্যর্থতার কারণেই এ বিতর্ক। এখানেই শেষ নয়। পরাগ উদ্ধারের পর শুরু হয় কে অপহরণের মূলহোতা আমিরকে গ্রেফতার করবে তার প্রতিযোগিতা। শেষটায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সফল হয়। ঘটনার ১২ দিন পর আমিরকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় টঙ্গী থেকে গ্রেফতার করে। ঐ কর্মকর্তা কৌতুক করে বলেন, অপহরণকারীদের গ্রেফতারটি ছিল রীতিমত বিড়াল ইঁদুরের খেলার মত।
আমির হোসেনকে কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। গতকাল রবিবার ছিল রিমান্ডের তৃতীয় দিন। দুই একদিনের মধ্যে মহানগর গোয়েন্দারাও তাকে জিজ্ঞাসবাদ করবে বলে সূত্র জানিয়েছে।
অভিযান সম্পর্কে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ঐ কর্মকর্তা বলেন, গত ১৪ নভেম্বর বুধবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ নিশ্চিত হয় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় আমিরের ছয় সহযোগী অবস্থান করছে। তারা ঐ দিন ভোর রাতে ঢাকা থেকে গাজীপুরে একটি বাড়িতে গিয়ে দেখা করবে। এ অবস্থায় ঢাকা মগানগর গোয়েন্দা পুলিশ ৬ সহযোগীর আশপাশ এলাকায় অবস্থান নেয়। তাদের টার্গেট ছিল ভোরে তাদের পিছু পিছু গাজীপুরে যাওয়া। কিন্তু এরই মধ্যে হঠাত্ করে র্যাবের গাড়ি এসে তাদের তুলে নিয়ে যায়। অভিযান ব্যর্থ হয় গোয়েন্দাদের। এরপর আমির চলে যায় গভীর আত্মগোপনে।
এ ঘটনার ৭ দিন পর গত ২২ নভেম্বর মহানগর গোয়েন্দা শনাক্ত করে আমিরের অন্যতম সহযোগী আল-আমিনের। তাকে ধরতে ঐদিন রাত সাড়ে ৭টার দিকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম পৌঁছায় রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দে। আর গোয়ালন্দ থানায় পৌঁছে গোয়েন্দা দেখতে পান র্যাবের একটি টিম অবস্থান করছে। উদ্দেশ্য আল আমিনকে গ্রেফতার। এ অবস্থায় গোয়েন্দারা তাদের কৌশল পাল্টিয়ে থানা থেকে সরে পড়েন। আর র্যাবের অভিযানের আগেই রাত ১০টার দিকে গোয়ালন্দ উপজেলা থানা কমপ্লেক্স এলাকা থেকে আল-আমিন ও তার সহযোগী শাহিনকে গ্রেফতার করে সরাসরি ঢাকায় ফিরে আসেন। আল-আমিন ও শাহিন গ্রেফতার হলেও প্রচারিত হয় আমিরও গ্রেফতার হয়েছে।
আল-আমিন ও শাহিনকে ঢাকায় আনার পর তাদের একদিন আটক রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করে গোয়েন্দারা। পরে গোয়েন্দারা আল-আমিনকেই গ্রেফতার দেখায়। অপহরণে জড়িত থাকার পরও শাহিনকে ছেড়ে দেয়া হয়। আর আল-আমিনের দেয়া তথ্যমতে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হন যে, আমির টঙ্গী এলাকায় অবস্থান করছে।
২৯ নভেম্বর শুক্রবার রাত ১২টার দিকে গোয়েন্দরা আমিরকে ধরতে টঙ্গীর (গাজীপুর সদর থানার অন্তর্গত) মুদাফা টিলারগাতিতে অভিযান শুরু করে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পান র্যাবের একটি টিম অবস্থান করছে (যে বাড়িতে একদিন ছিল আমির)। র্যাব বিষয়টি আঁচ করতে পারে। তারা তাদের সোর্স এক মহিলাকে একটি বাড়ির দেয়াল টপকিয়ে ভেতরে পাঠান। কিন্তু ঐ মহিলা তাড়াহুড়ার কারণে অচেতন হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ আগের মতো কৌশল পাল্টিয়ে অন্য সোর্সের দিকে নজর দেন। এদিকে র্যাবের সোর্সের ( ঐ মহিলা) জ্ঞান ফেরে প্রায় দেড় ঘণ্টা পর। আর তার আগেই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ আমিরের অবস্থান নিশ্চিত করে। টিলারগাতি এলাকার সৌদি প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়ি। একতলা ভবন। দুইটি ফ্ল্যাটের একটিতে আমির ভাড়ায় আসে ২৩ নভেম্বর। প্রথমে গোয়েন্দরা সোর্স দিয়ে আমিরকে নাম ধরে ডাকতে থাকে। পরে যুক্ত হয় বাড়িওয়ালীও। শেষটায় প্রায় এক ঘণ্টা পর দরজা খোলে আমির। আর ভবনের চারদিকে অবস্থায় নেয় গোয়েন্দারা।
এদিকে ডাকাডাকির এক পর্যায়ে আমির ঘরে লাইট জ্বালান। এ সময় জানালার ফাঁক দিয়ে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা দেখতে পান আমিরের হাতে পিস্তল। সঙ্গে সঙ্গে ঐ গোয়েন্দা সদস্য অন্যদের সতর্ক করে দেন। দরজা খুলেই আমির গোয়েন্দাদের লক্ষ্য করে ২/৩ রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে। গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। গোয়েন্দাদের পাল্টা গুলিবর্ষণে মেঝেতে লুয়িয়ে পড়ে আমির। এ সময় তার পরনে ছিল সাদা লুঙ্গি ও হাফহাতা সাদা গেঞ্জি। গোয়েন্দারা প্রথমে মনে করেছিলেন আমির মারা গেছে। কিন্তু মৃত ভেবে গাড়িতে তোলার পরই আমিরের জ্ঞান ফেরে। গোয়েন্দাদের অভিযান শেষ হয় ভোর পাঁচটার দিকে। আর আমির গ্রেফতারের খবর জানাজানি হওয়ার পর র্যাব ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
মুক্তিপণ ঃ সূত্র জানায়, পরাগকে ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে অপরহরণকারীদের মুক্তিপণ দেয়া হয়েছে। তবে তার পরিমাণ ৫০ লাখ টাকার কম হবে। পরাগ উদ্ধারের কয়েকঘণ্টা আগেই গাবতলী এলাকায় আমিরের কাছে এ টাকা প্রদান করা হয়। আর টাকা প্রদানের সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও ঐ এলাকায় অবস্থান করছিল। ইচ্ছে করলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আমিরকে গুলি করে ধরতে পারতেন। ঐ সময় উপস্থিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একজন সদস্য বলেছেন, উপরের নির্দেশ ছিল আগে পরাগ উদ্ধার, পরে অপহরণকারী গ্রেফতার।
ঘটনার দিন স্কুলে যাওয়ার পথে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের পশ্চিম শুভাঢ্যা এলাকা থেকে সন্ত্রাসীরা স্কুল ছাত্র পরাগকে অপহরণ করে। এ সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হয় পরাগের মা লিপি রানী মণ্ডল, বোন পিনাকি মণ্ডল ও গাড়িচালক নজরুল ইসলাম। ঐদিন রাতেই পরাগের দাদি সাবিত্রী মণ্ডল বাদী হয়ে মামলা করেন। অপহরণের ঘটনায় আমিরসহ মোট গ্রেফতারের সংখ্যা ১০ জন।