ভেষজ কীটনাশক ব্যবহারে বগুড়ায় সবজি চাষ
প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:১৪
বগুড়া জেলার শাজাহানপুর উপজেলার কামারপাড়ায় সবজি চাষ হয় বেশি। সেই কামারপাড়াতেই গড়ে তোলা হয়েছে ‘অংশগ্রহণমূলক গ্রামীণ ভিডিও কেন্দ ’। যেখানে কৃষকরা এসে কৃষি কাজের পরামর্শ গ্রহণ করে, সেই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে উত্পাদিত ভেষজ কীটনাশক ও কম্পোস্ট সার সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। পুরো গ্রামেই বাড়ি বাড়ি কেঁচো কম্পোস্ট সার তৈরির ব্যবস্থা রয়েছে কামারপাড়ায়। এছাড়া গ্রামের কৃষকরাই সেখানে তৈরি করেন ভেষজ কীটনাশক।
প্রায় দেড়যুগ আগের কথা। যখন উত্তরাঞ্চল জুড়ে সারের সংকট দেখা দিয়েছিলো, সে সময় কামারপাড়ার ২৫ জন কৃষক মিলে একটি সংগঠন দাঁড় করান। নাম দেন ‘প্রান্তিক কৃষক সমবায় সমিতি’। তারা যৌথভাবে কৃষি বিভাগ ও ইউপি চেয়ারম্যানের কাছে গিয়ে সার সংগ্রহ করে আনতেন। এরপর তারা নিজেরা স্বল্প পরিমাণের সেই সার জমিতে প্রয়োগ করেও চেষ্টা চালাতেন ভালো ফসল উত্পাদনের। সে সময় ওই এলাকায় কীটনাশক ও সার পরিবেশকের দায়িত্বে ছিলেন রুস্তুম আলী নামে এক ব্যক্তি। কোন ফসলে কি ধরনের কীটনাশক ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হবে এসব পরামর্শ দিতেন তিনি। এক সময় এলাকার কৃষকরা জমিতে অধিক দামে সার-কীটনাশক কিনে না দিয়ে অন্যকোন উপায়ে চাষ করা যায় কিনা তার (রুস্তুমের) কাছে সেই পরামর্শ চান। তখন রুস্তুম আলী বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমীতে (আরডিএ) গিয়ে বেশ কিছু ফসল চাষাবাদের ওপরে প্রশিক্ষণ নেন। সেখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে কৃষকদের জানান, বাজার থেকে কেনা কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ছাড়াও ফসল উত্পাদন করা সম্ভব।
কিভাবে তা সম্ভব সেটি তিনি বুঝিয়ে দেন কৃষকদের। জমির আইলসহ গ্রামের বিভিন্ন ঝোপঝাড়ে বিষকাটালি, নিম, নিশিন্দা, থানকুনি, পিতরাজ, মেহগনিসহ যেসব উদ্ভিদ জন্মে সেসব কেটে এনে বাড়িতেই ভেষজ কীটনাশক তৈরি করা সম্ভব। আর সারায়নিক সারের পরিবর্তে জমিতে দেয়া যেতে পারে আবর্জনার কম্পোস্ট ও কেঁচো (ভার্মি) কম্পোস্ট সার।
তত্কালীন কৃষক সমিতির উদ্যোক্তা মাহফুজার রহমান জানান, রুস্তুম আলী (এলাকায় এখন তিনি ফসলের ডাক্তার হিসেবে পরিচিত) ভেষজ কীটনাশক ও কম্পোস্ট সার তৈরির পরামর্শ দিলেও তারা বিষয়টি নিজেরা কিভাবে করবেন তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। পরে ৪ জন নারী ও ৩ জন পুরুষ মিলে তারা গঠন করেন একটি টিম। ফসলের ডাক্তার রুস্তুম আলী জানান, একসময় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের পরামর্শে সেখানে “ফোস্টারিং উইমেন ভয়েসেস থ্রু ভিডিও‘স ইন বাংলাদেশ” নামক একটি প্রকল্পের আওতায় স্থাপন করা হয় ‘অংশগ্রহণমূলক গ্রামীণ ভিডিও কেন্দ ’। এই কেন্দে র মাধ্যমে কৃষকদের অংশগ্রহণমূলক ভিডিও তৈরি, কম্পিউটার ব্যবহার এবং জৈব (অর্গানিক) কৃষির বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। পরবর্তীতে কামারপাড়ার কৃষকরা নানা পদ্ধতি অবলম্বন করে যেসব বিষমুক্ত ফসল উত্পাদন করেন এবং স্থানীয়ভাবে যেসব খাবার তৈরি করেন সেসব ভিডিও চিত্রে ধারণ করে অন্য জেলার কৃষকদের মাঝে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়। এই সাতজনের সঙ্গে কমিউনিটি সদস্য হিসেবে যুক্ত হন গ্রামের আরো ১৮ জন নারী এবং ২৪ জন পুরুষ।
এ কেন্দে র পথ অনুসরণ করে ইতিমধ্যে বগুড়ার শেরপুর, কিশোরগঞ্জ সদর, টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর, ময়মনসিংহের গৌরীপুর, রংপুরের মিঠাপুকুর এবং গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে সাতটি কৃষকদল গঠিত হয়েছে। কামারপাড়া কেন্দে র কৃষক সেসব কেন্দে গিয়ে স্থানীয় কৃষকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি তাদের তৈরি ভিডিওচিত্রগুলো প্রদর্শন করছেন। বগুড়ার স্থানীয় এই কৃষকদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছেন ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি সমপ্রসারণ শিক্ষা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামান সরকার মিল্টন। তিনি বলেন, কৃষি প্রযুক্তি বিস্তারে ভিডিও একটি শক্তিশালী ও কার্যকর মাধ্যম। তিনি আরো জানান, এই প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমী সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থিক সহায়তা প্রদান করছে অস্ট্রেলিয়ার বকু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ডেভলপমেন্ট স্টাডিজ।