কারখানায় ছাঁটাইয়ের তালিকা দেখেই ক্ষুব্ধ হন কর্মীরা

আশুলিয়ার জামগড়া বাসস্ট্যান্ডে হিউন অ্যাপারেলের শ্রমিক জালাল (১৯) গতকাল রবিবার কারখানায় ঢুকতে গিয়ে দেখেন, গেটে ১০১ জন শ্রমিকের তালিকা টাঙ্গানো। গত ২৪ নভেম্বর পোশাক কারখানাটি অনির্দিষ্ট-কালের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়। গতকাল রবিবার কারখানাটি খোলার কথা ছিল। সকাল ৭ টার দিকে শ্রমিকরা কারখানায় ঢুকতে গিয়ে গেটে এই তালিকা দেখতে পান। যেসব শ্রমিকের তালিকায় নাম রয়েছে, তাদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। এভাবে সকাল ৮ টার মধ্যে গেটের সামনে ছাঁটাইকৃত ১০১ শ্রমিক জড়ো হন। ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে তারা বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন। এক পর্যায়ে শ্রমিকরা ঐ কারখানা লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এই পরিস্থিতিতে হিউন অ্যাপারেল কর্তৃপক্ষ কারখানা ছুটি দিয়ে দেয়। এরপরই আশেপাশের পোশাক কারখানাগুলোতে ছুটি দেয়া হয়। শ্রমিকরা জামগড়ায় আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়ক প্রায় দুই ঘণ্টা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের কয়েক দফা ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কয়েক রাউন্ড টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। পুলিশের লাঠিচার্জে প্রায় অর্ধশত শ্রমিক আহত হন। শ্রমিকরা রাস্তায় ৩০/৪০টি গাড়ি ভাংচুর করেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের বেশিরভাগ পোশাক কারখানায় গতকাল ছুটি ঘোষণা করা হয়। আশুলিয়া থানার পরিদর্শক মোস্তফা কামাল জানান, বহিরাগত কিছু শ্রমিক শনিবার পুকুরপাড় এলাকার রপ্তানিমুখি ব্যাগ তৈরির কারখানা পিকার্ড বাংলাদেশ লিমিটেডে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেন। গতকাল সকালে শ্রমিকরা কাজে এসে ছুটি দিতে কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানান। পিকার্ড কর্তৃপক্ষ রবিবারের জন্য কারখানা ছুটি দিয়ে দিলে শ্রমিকরা একসঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এসে রাস্তায় জড়ো হন। একসঙ্গে এতো শ্রমিক রাস্তায় দেখে অস্থিরতার আশঙ্কায় পুকুরপাড়, জিরাবো ও কাঠগড়ায় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। এসময় শ্রমিকদের একটি অংশ শিমরাইল-জিরাবো সড়ক অবরোধ করতে চাইলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ে তাদের সরিয়ে দেয়। গতকাল বেলা সাড়ে ১০টার দিকে হিউন অ্যাপারেলের ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকরা পার্শ্ববর্তী রোজ ফ্যাশনে ইট-পাটকেল ছুঁড়তে শুরু করলে ঐ কারখানার শ্রমিকরাও বের হয়ে আসেন। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা এসময় আশপাশের সেতারা গ্রুপ, এম ডিজাইন লিমিটেড, রিয়ম কমপ্লেক্স, এনবয় গ্রুপ ও শেড ফ্যাশনসহ বেশ কয়েকটি কারখানায় ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করেন ও ভাঙচুর চালিয়ে শ্রমিকদের বের করে নিয়ে আসে। শ্রমিকরা খন্ড খন্ড মিছিল বের করেন। মিছিল থেকে তাজরীন ফ্যাশনের অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের দ্রুত পুনর্বাসনসহ নিজেদের নিরাপত্তার দাবিতে শ্লোগান দিতে থাকেন শ্রমিকরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কারখানা ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কে ৩০/৪০টি গাড়ি ভাংচুর করলে সড়কটিতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এসময় পুলিশ বাধা দিলে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের বগাবাড়ী, ইউনিক, শিমুলতলা, জামগড়া, বেরন, সরকার মার্কেট, নরসিংহপুর, নিশ্চিন্তপুর, জিরাবো, পুকুরপাড় এলাকায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বেলা সাড়ে ১২টার পর অতিরিক্ত পুলিশের হস্তক্ষেপে ঐ সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। নিশ্চিন্তপুরে স্বজনদের আহাজারি : গতকালও অগ্নিকান্ডে নিহত ও আহতদের স্বজন, চাকরিহারাদের ভিড় ছিল নিশ্চিন্তপুর প্রাইমারি স্কুল মাঠে। শ্রমিকরা জানান, মাস শেষ হলেও তারা বাড়ি ভাড়া দিতে পারছেন না। মাসিক হিসাবে কেনাকাটা করা দোকানে বাকি পড়ে রয়েছে। তাজরীন ফ্যাশনে তাদের ৪ মাসের বেতন বকেয়া থাকায় স্বাভাবিক জীবন যাপনও করতে পারছেন না। আহতদের স্বজনরা জানান, অর্থের অভাবে আহতদের চিকিত্সা করানো যাচ্ছে না। সকাল ৮ টা থেকে নিশ্চিন্তপুর স্কুলমাঠে শ্রমিকদের অপেক্ষা শুরু হয় কখন বিজিএমই’র কর্মকর্তারা আসবেন। বেলা ১২টার দিকে বিজিএমই’র দুইটি গাড়ি স্কুলমাঠে উপস্থিত হয়। সে গাড়িতে তাজরীন ফ্যাশনের ৬৬ জন শ্রমিক প্রতিনিধিকে রাজধানীর বিজিএমই’র ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। উল্লেখ্য, গত ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনে অগ্নিকান্ডে ১১১ জন নিহত হওয়ার পর থেকেই এ এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ চলছে।