পদ্মা সেতু
দুদকের পদক্ষেপের উপরই বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন
প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৩৩
পদ্মা সেতু প্রকল্পের দুর্নীতির ব্যাপারে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যকর পদক্ষেপের উপর নির্ভর করছে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়ন। বলেছেন বিশ্ব ব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি অ্যালেন গোল্ডস্টেইন। তিনি বলেন, দুদককে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। এ সেতু বাস্তবে পরিণত করার বিষয়টি এখন দুদকের হাতে। গতকাল রবিবার দুর্নীতি দমন কমিশনের সঙ্গে বিশ্ব ব্যাংক পর্যবেক্ষক দলের বৈঠকের পর অ্যালেন গোল্ডস্টেইন এ কথা বলেন।
বিশ্ব ব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের পক্ষ থেকে অ্যালেন গোল্ডস্টেইন আরো বলেন, দুদকের তদন্তে অগ্রগতি বিষয়ে তারা জানতে চেয়েছেন। এখন পর্যন্ত যা জেনেছি তা উত্সাহব্যঞ্জক। আগামী তিন-চার দিনে আমরা আরো কয়েক দফা বৈঠক করব। এছাড়া পদ্মা সেতু প্রকল্প এগিয়ে নেয়ার জন্য দুর্নীতির অভিযোগের ‘অবাধ ও সুষ্ঠু’ তদন্ত ‘খুবই জরুরি’। দুদকের তদন্তে যদি পর্যাপ্ত অগ্রগতি থাকে তাহলে পদ্মাসেতু বাস্তবায়নের বিষয়ে আমরা আশাবাদী। তদন্তের যথেষ্ট অগ্রগতি হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ কীভাবে শুরু করা যায় তা নিয়েই আলোচনা হয়েছে। অপর দিকে ম্যানিলাতে বিশ্ব ব্যাংকের বৈঠকের ব্যাপারে তিনি জানান, পদ্মা সেতু প্রকল্পে ফিরে আসার ব্যাপারে ম্যানিলাতে প্রাথমিক বৈঠক হয়েছে। দুদকের তদন্তের অগ্রগতি দেখতে গত শনিবার রাতে দ্বিতীয় দফার সফরে ঢাকায় পৌঁছান পর্যবেক্ষক দলের তিন সদস্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সাবেক প্রধান আইনজীবী লুই গাব্রিয়েল মোরেনো ওকাম্পো, হংকংয়ের দুর্নীতি বিরোধী স্বাধীন কমিশনের সাবেক কমিশনার টিমোথি টং এবং যুক্তরাজ্যের দুর্নীতি দমন কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক রিচার্ড অল্ডারম্যান। ওকাম্পো নেতৃত্বাধীন এই প্যানেলের প্রতিবেদনের ওপরই পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্ব ব্যাংকের ১২০ কোটি ডলারের ঋণ দেয়ার বিষয়টি নির্ভর করছে। গতকাল রবিবার এই প্রতিনিধি পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির তদন্ত পর্যবেক্ষণ করতে দুপুর ৩টা দশ মিনিটে বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিনিধি দল সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে আসেন। দুদকের অনুসন্ধান টিমের সঙ্গে তারা বৈঠকে বসেন সোয়া ৩টার দিকে। বিকাল সাড়ে চারটার দিকে বৈঠক শেষ হয়। বৈঠকে দুদকে চেয়ারম্যান গোলাম রহমান, দুই কমিশনার, দুদকের আইনজীবী এডভোকেট আনিসুল হক ও তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিচালক আবদুল্লা-আল-জাহিদ, মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলী, গোলাম শাহরিয়ার চৌধুরী ও উপ-পরিচালক মির্জা জাহিদুল আলম উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে অনুসন্ধানের যাবতীয় তথ্য বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিনিধি দলের কাছে উপস্থাপন করা হয়। গত নভেম্বরে বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে প্রথম বৈঠকের পর যাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে তাদের জবানবন্দির নথিপত্রের কপি পর্যবেক্ষক দলের কাছে দেয়া হয়। অনুসন্ধান দলের পক্ষ থেকে জানানো হয় ওই সব ব্যক্তিদের জবানবন্দিতে অসংলগ্নতা রয়েছে। এছাড়া সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী আবুল হোসেন, এসএনসি লাভালিনের দেশীয় এজেন্ট ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীকে সোমবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের পর অনুসন্ধান প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে। বৈঠকে বিশ্ব ব্যাংকের পক্ষ থেকে অনুসন্ধান বিষয়ে বেশ কিছু পরামর্শ দেয়া হয়। ওই পরামর্শকে সামনে রেখে আগামী ৪ ডিসেম্বর দুদকের অনুসন্ধান দল একটি প্রতিবেদন তৈরি করবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বৈঠক প্রসঙ্গে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিনিধি দলকে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিনিধিরা তাতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। অনুসন্ধানের পর কি হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনুসন্ধান প্রতিবেদন বিচার বিশ্লেষণ করে দুদকের পক্ষ থেকে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
দুদকের আইনজীবী ও অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ এডভোকেট আনিসুল হক বলেন, মামলা হবে কিনা? হলে কার বিরুদ্ধে হবে তা দুই একদিনের মধ্যে ফয়সালা হবে। তিনি আরো বলেন, যাদের সম্পর্কে প্রশ্ন উঠেছে তারা অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। এজন্য আমাদের পর্যাপ্ত তথ্য প্রমাণ দরকার। দুদক এ ব্যাপারে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। অনুসন্ধান কাজের সব কিছুই বিশ্ব ব্যাংকের পর্যবেক্ষক দলের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। আমরা কোন কিছুই গোপন করিনি।
উল্লেখ্য, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে গত জুনে ঋণচুক্তি বাতিল করেছিল বিশ্ব ব্যাংক। তবে সরকারের তত্পরতায় ‘শর্তসাপেক্ষে’ আবার অর্থায়নের ঘোষণা দেয় বিশ্ব ব্যাংক। বিশ্ব ব্যাংকের শর্তানুযায়ী দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত শুরু করে দুদক। বিশ্ব ব্যাংকের ফিরিয়ে আনার অংশ হিসেবে শর্ত পূরণে পদত্যাগ করেন সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, ছুটিতে যান সেতু বিভাগের সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া, প্রকল্পের ইন্টেগ্রিটি উপদেষ্টা মসিউর রহমানকেও ছুটিতে পাঠানো হয়।