আবার অস্থিরতা শিক্ষাঙ্গনে

ছাত্রলীগের একশ্রেণীর নেতা-কর্মী আবারো উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠেছে। এ কারণে অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, অন্তর্দ্বন্দ্ব, সংঘর্ষ, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখল-বাণিজ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ারও অভিযোগ উঠেছে ঐতিহ্যবাহী এই ছাত্র সংগঠনের অনেক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে। সব মিলিয়ে বর্তমান সরকারের পৌনে চার বছরে ছাত্রলীগ সংঘর্ষে জাড়িয়েছে ৩৭০ বার। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ছয় জন, পঙ্গু হয়েছেন ৫০ জন, আর ২০ জন শিক্ষককে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষিসহ শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। শিক্ষকদের পেটানোর এই ঘটনায় দেশের শিক্ষক সমাজ রীতিমতো ক্ষুব্ধ। ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মক ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বিভিন্ন সময় সরকার প্রধান ও সরকারের দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তিরা যে কোনো অন্যায় আচরণের জন্য ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের হুঁশিয়ার করে দিলেও সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা সেসবের কোন তোয়াক্কা করছে না। ছাত্রলীগ কখন কী ঘটায়–তা নিয়ে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের (ভিসি) দুশ্চিন্তার শেষ নেই। শিক্ষাঙ্গনকে সন্ত্রাস ও দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার ঘোষণা আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল। ছাত্রলীগের ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্রে বলা আছে, শিক্ষা, শান্তি ও প্রগতির কথা। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শিক্ষাঙ্গনগুলোতে উল্টো সন্ত্রাস সৃষ্টি করছে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের সভাপতি এইচএম বদিউজ্জামান সোহাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে দাবি করে বলেন, ছাত্রলীগ নয়, বহিরাগতরা এসব ঘটনা ঘটিয়েছে। গত ১০ দিনে ছাত্রলীগের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অস্থির অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এই সময়ে সাধারণ ছাত্র এবং ছাত্রদলের ওপর একের পর এক হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগ। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃতি কর্মীদের ওপর হামলা, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ-বাণিজ্যের সুযোগ দাবিতে উপাচার্য-প্রক্টর অফিস ভাংচুরের ঘটনায় দেশের সাধারণ মানুষের কাছে ছাত্রলীগের সামপ্রতিক কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ। ২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে ছাত্রলীগ। ওই দিনই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে কঠোরভাবে সমালোচিত হন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। তারা আন্দোলনকারীদের মাইক ভাংচুর করে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা শান্ত থাকায় শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষ না বাধলেও ছাত্রলীগ বুয়েট প্রশাসনিক ভবনের দোতলার একটি দরজায় ভাংচুর চালায়। এছাড়া রংপুর, কুড়িগ্রাম, খুলনা, বগুড়া, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি প্রভৃতি স্থানে বেপরোয়া টেন্ডারবাজি ও দখলবাজির ঘটনা ছাত্রলীগের গৌরবের ইতিহাস ম্লান করে দিয়েছে। স্বর্ণযুগের ছাত্রনেতাসহ দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ছাত্রলীগকে নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘ছাত্রলীগকে এখনই থামান।’ গত ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের হামলায় ছাত্রদলের অন্তত ৯ নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নবগঠিত কমিটির নেতারা উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার আগে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালায়। ছাত্রদলকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে না দেয়ার পূর্বঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হলের নেতা-কর্মীরা একযোগে এ হামলা চালায়। ছাত্রদল হামলায় জড়িতদের শাস্তি দাবি করে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হলেও এখনও কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার পরদিন ১১ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের হামলায় ছাত্রদলের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়কসহ সাতজন আহত হয়েছেন। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চতুর্থ কারামুক্তি বার্ষিকী উপলক্ষে ক্যাম্পাসে শোভাযাত্রা বের করতে চাইলে এ হামলা চালিয়ে ছাত্রদলকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করা হয়। গত ১৫ জুলাই মধ্যরাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ কর্মীদের গোলাগুলির ঘটনায় আব্দুল্লাহ আল হাসান সোহেল নামে এক ছাত্রলীগ নেতা নিহত হন। এ ঘটনায় রাবি ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আখেরুজ্জামান তাকিম এবং সাংগঠনিক সম্পাদক তৌহিদ আল তুহিনকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। ১৪ জনকে আসামি করে একটি মামলাও করা হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্দ্বন্দ্বে ছাত্রলীগ কর্মী জুবায়ের আহমেদ নিহত হন। এ ছাড়া ছাত্রলীগের হামলা, সন্ত্রাস, অন্তর্কলহে প্রায় ৪০ ছাত্র পঙ্গু হয়ে গেছেন। মূলত সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবীরের আশীর্বাদপুষ্ট গ্রুপ এবং কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ন্ত্রিত গ্রুপে বিভক্ত জাবি ছাত্রলীগের সন্ত্রাসের কারণে গত সাড়ে তিন বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট বৃদ্ধিসহ সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। গত ৮ জুলাই সিলেটের এমসি কলেজে ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবির সংঘর্ষের পর কলেজ ছাত্রাবাসে আগুন দেয় ছাত্রলীগ। এর মাধ্যমে শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী কলেজ ছাত্রাবাস ধ্বংস হয়ে যায়। ছাত্রাবাস দেখতে গিয়ে কলেজের সাবেক ছাত্র শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ কেঁদে ফেলেন। তিনি ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি দাবি করেন। কলেজ কর্তৃপক্ষের তদন্তে ‘ছাত্রলীগের বহিরাগতরা’ এ হামলা চালিয়েছে বলে বেরিয়ে এসেছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের হামলা থেকে উপাচার্য, প্রক্টর কেউই রেহাই পাননি। গত ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসাইন ও সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান তুহিন তাদের দেয়া তালিকা অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ না দেয়ার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে তার কক্ষে গিয়ে হুমকি দেন। ব্যাপক ভাংচুর চালানো হয় প্রক্টর মেহের আলীর অফিসে। গত ৫ সেপ্টেম্বর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের আহ্বায়ক শামসুজ্জামান চৌধুরী সুমনের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগে বাধা দেয়। ছাত্রলীগের নেতাদের পছন্দের ব্যক্তিকে নিয়োগ না দেয়ায় এ ঘটনা ঘটে। ছাত্রলীগের পছন্দের ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। গত ৮ সেপ্টেম্বর ক্লাসে ঢুকে একজন অনলাইন সংবাদকর্মীকে মারধর করে ছাত্রলীগ কর্মীরা। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর সরকারি কলেজসহ আরো কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া দিনাজপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, পিরোজপুর, বগুড়া, পটুয়াখালী, সাতক্ষীরা, যশোর, ভোলা প্রভৃতি জেলা থেকে স্থানীয় প্রতিনিধিরা ছাত্রলীগের টেন্ডারবাজি, দখল ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের তথ্য দিয়েছেন।