আজ যেসব স্থান হানাদার মুক্ত হয়

আজ ৪ ডিসেম্বর। দেশের বিভিন্ন স্থান হানাদার মুক্ত হয়। এ উপলক্ষে এসব স্থানে মুক্তিযোদ্ধা ও এলাকাবাসী বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করে। খবর ইত্তেফাক প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের। লক্ষ্মীপুর দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধকালীন সময়ে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনারা এ দেশীয় দোসর রাজাকার আল বদরের সহায়তায় লক্ষ্মীপুর জেলার ৫টি উপজেলায় ব্যাপক অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ধর্ষণ ও শত শত নিরীহ জনসাধারণকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তখন লক্ষ্মীপুরের দামাল ছেলেরা ১৭ বার সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে হানাদারদের প্রতিহত করে লক্ষ্মীপুরকে এদিন মুক্ত করেন। এসব যুদ্ধে সৈয়দ আবদুল হালীম বাসু, মনছুর আহমদ, আবু ছায়েদ, আবুল খায়ের, নজরুল ইসলাম, জয়নাল আবেদীন, আতিক, মোস্তাফিজুর রহমান, আলী আহাম্মদ (ইপিআর)সহ ৩৫ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এছাড়াও পাকহানাদার বাহিনীর হাতে আরো জানা-অজানা অসংখ্য নর-নারী শহীদ হয়। ডিসেম্বরের এ দিন প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল হায়দার চৌধুরীর এবং সুবেদার প্রয়াত আবদুল মতিনের নেতৃত্বে দেড় শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা একত্রিত হয়ে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দালাল বাজার, দক্ষিণ হামছাদি, শাঁখারী পাড়ার মিঠানীয়া খালপাড়সহ বাগবাড়িস্থ রাজাকার ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে লক্ষ্মীপুরকে হানাদার মুক্ত করেন এবং প্রায় দেড় শতাধিক রাজাকারকে আটক করে ও বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করে। প্রকাশ্যে লক্ষ্মীপুর শহরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। সদর উপজেলার দালাল বাজারের মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আলী আজমের মা শাফিয়া খাতুন (৯০) মরার আগে বর্তমান সরকারের কাছে তার সন্তান ও স্বামীর হত্যাকারী রাজাকারদের বিচার দেখে যেতে চান। বকশীগঞ্জ (জামালপুর) ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের এই দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পরাজিত হয় পাকসেনা। শত্রুমুক্ত হয় ১১নং সেক্টরের কামালপুর রণাঙ্গন। স্বাধীন বাংলার আকাশে উড়ে বিজয় পতাকা। ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ১১নং সেক্টরের দায়িত্ব পালন করেন কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তম। কামালপুর থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরে ভারতের মহেন্দ্রগঞ্জে ১১নং সেক্টরের হেডকোয়ার্টাস। ১২ মে থেকে ২৮ নভেন্বর পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধার সাথে পাকসেনাদের বিভিন্ন সময়ে ৫২ বার সম্মুখ যুদ্ধ হয়েছে। ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিনসহ মোট ১৯৪ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন। নিহত হয়েছে ৪৯৭ জন পাকসেনা। কামালপুর থেকেই মিত্র বাহিনী বিজয়ের পতাকা নিয়ে বকশীগঞ্জ, শেরপুর, জামালপুর ও টাংগাইল শত্রুমুক্ত করে ব্রিগেডিয়ার হরদেব সিং ক্লেয়ার ও মেজর জেনারেল নাগরা প্রথম ঢাকায় প্রবেশ করেন। প্রতিবছর এ দিনে কামালপুরমুক্ত দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। ফুলবাড়ি (দিনাজপুর) মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এ দিনটি ফুলবাড়ির মানুষের কাছে অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ ও অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের এদিনে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনী যৌথভাবে চতুর্মুখী আক্রমণ চালিয়ে পাকিস্তানী খানসেনাসহ তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল-বদর, আল-সামস বাহিনীর হাতে অবরুদ্ধ ফুলবাড়িকে মুক্ত করে স্থানীয় সড়ক ও জনপথ ডাক বাংলো চত্বরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে। দিনটিকে স্মরণ করতে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের ইতিহাস জানাতে মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক মন্ত্রী আলহাজ্ব মোহাম্মদ মনসুর আলী সরকারের ব্যক্তিগত উদ্যোগে আজ মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় শোভাযাত্রাসহ স্থানীয় সড়ক ও জনপথ ডাকবাংলো চত্বরে মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্মিলনী ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। দেবীদ্বার (কুমিল্লা) ১৯৭১ সালের এদিনে দেবীদ্বার পাক হানাদার মুক্ত হয়েছিল। দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন করার লক্ষ্যে দেবীদ্বার উপজেলা প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাব ও দৃষ্টান্ত ফাউন্ডেশন’র যৌথ উদ্যোগে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। সকাল ৯টায় সর্বস্তরের জনতার উপস্থিতিতে উপজেলা কমপ্লেক্স থেকে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হবে। স্বাধীনতা সংগ্রামে শহীদদের স্মরণে দেবীদ্বার নিউমার্কেট মুক্তিযোদ্ধা চত্বর ও গণকবরে পুষ্পমাল্য অর্পণ, উপজেলা পরিষদ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আলোচনা সভা করা হবে। ফুলছড়ি (গাইবান্ধা) স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এদিন ১১ নং সেক্টরের অধীন মুক্তিযোদ্ধারা ফুলছড়ি থানা সদরের অদূরে ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্ব তীর গলনার চরে অবস্থান গ্রহণ করে। পরে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার গৌতম চন্দ্র মোদকের নেতৃত্বে ৩ ডিসেম্বর গভীর রাতে মুক্তিযোদ্ধা গেরিলা কমান্ডার সামছুল আলম, কমান্ডার নাজিম উদ্দিন, আ. জলিল তোতা, এনামুল হকের পরিচালনায় মুক্তিযোদ্ধারা ৪ দলে বিভক্ত হয়ে ব্রহ্মপুত্র পাড়ি দিয়ে ফুলছড়ি থানা সদরের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান গ্রহণ করে। সন্ধায় মূলদল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া পাকসেনাদের একটি দল বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের উপর দিয়ে উত্তর দিকে আসার সময় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এনামুলের দলের মুখোমুখি হলে উভয় দলের মধ্যে সম্মুখ যুদ্ধ হয়। লোমহর্ষক এ সম্মুখ যুদ্ধে ২২ পাকসেনা নিহত হয় এবং ৫ বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাদত বরণ করেন। তারা হলেন-আফজাল হোসেন, কবেজ আলী, যাহেদুর রহমান বাদল, ওসমান গনি এবং আব্দুল সোবহান। পরদিন তাদের খামার ধনারুহা স্কুল প্রাঙ্গণের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে সমাহিত করা হয়। স্বাধীনতা উত্তরকালে এ ৫ বীর শহীদের সম্মানার্থে সগুনা ইউনিয়নের নাম পরিবর্তন করে মুক্তিনগর ইউনিয়ন রাখা হয়। ৫ শহীদের সম্মানে কবরের পাশে নির্মিত হয়েছে স্মৃতিসৌধ ও মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স। প্রতিবছর এ স্থানে দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়।