গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ
প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:২৬
মেহেরপুর। বাংলাদেশের ক্ষুদ্রতম এই জেলাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক অনেক বেশি। এদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস লিখতে হলে মেহেরপুরের নাম প্রথমেই চলে আসবে। কারণ এই মেহেরপুরের বৈদ্যনাথপুরে এক আমবাগানে সর্বপ্রথম গঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার, আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠ করা হয় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার বলা হয় এই মেহেরপুরকেই। ইতিহাসের সেই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং পাক বাহিনীর হাত থেকে এই অঞ্চলকে মুক্ত করার কাহিনী বর্ণনা করেছেন ইত্তেফাকের মেহেরপুর প্রতিনিধি আবু লায়েছ লাবলু।
মেহেরপুর
মেহেরপুর মুক্ত দিবস ৬ ডিসেম্বর । ১৯৭১ সালের এই দিনে মেহেরপুর হানাদার মুক্ত হয় । মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা হামলায় বিপর্যস্ত পাক বাহিনী ১ ডিসেম্বর থেকেই মেহেরপুর ছেড়ে পালাতে শুরু করে। ৬ ডিসেম্বর সম্পূর্ণভাবে হানাদার মুক্ত হয় মেহেরপুর।
পাক বাহিনীর হামলা ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ: ১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল দুুপুরে পাক বাহিনী মেহেরপুরে প্রবেশ করে। সড়কপথে তারা চুয়াডাঙ্গা থেকে মেহেরপুরে আসার পথে আমঝুপিতে অতর্কিত হামলা চালিয়ে হত্যা করে ৮ জন গ্রামবাসীকে। এরপর তারা মেহেরপুরে প্রবেশ করে একের পর এক হামলা চালায় কাঁচাবাজার পট্টি, ,মহাকুমা প্রশাসকের কার্যালয় ও বড় বাজারের সবজি পট্টিতে। ক্যাপ্টেন মোঃ আব্দুল লতিবের নেতৃত্বে পাক বাহিনী শহরের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বাড়িতে লুটপাট চালায়। পাক বাহিনী ২০ এপ্রিল মেহেরপুরের থানা কাউন্সিলে স্থায়ী ক্যাম্প গড়ে তোলে। কিছুদিনের মধ্যেই তারা সৈন্য সংখ্যা আরো বাড়িয়ে মেহেরপুরের ভকেশনাল ট্রেনিং ইনষ্টিটিউট, কালাচাঁদপুর, কামদেবপুর ও সীমান্ত এলাকায় স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে। ১৯৭১ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই পাক বাহিনীর উপর মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা বিরামহীন আক্রমণ চালাতে থাকে।
১৯৭১ সালের ৩০ এপ্রিল রাতে মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটি থাকার অজুহাত এনে যাদবপুর গ্রাম আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় পাক নরপশুরা। রাজাকার ও পীস কমিটির সদস্যদের দিয়ে মেহেরপুর সরকারি কলেজে খোলা হয় অভ্যর্থনা কক্ষ নামধারী বাঙালি নির্যাতন কেন্দ্র। তবে মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধের মুখে পাক দোসররা সেখানে খুব একটা সুবিধা করতে পারে নি।
১৯৭১ সালের ২৫ নভেম্বর থেকে মুক্তিবাহিনী পাকহানাদার বাহিনীর ওপরে ম্যারাথন আক্রমণ চালাতে শুরু করলে অবস্থা বেগতিক দেখে তারা যুদ্ধ সরঞ্জাম গুটাতে থাকে। ওই দিন সকাল থেকেই মুক্তিবাহিনী মেহেরপুরে পাক বাহিনীর আস্তানা লক্ষ্য করে চারদিক থেকে অবিরাম গুলিবর্ষণ করতে থাকে। ২৮ এবং ২৯ নভেম্বর মুক্তিবাহিনীর একের পর এক হামলায় হানাদার বাহিনী মেহেরপুরে কোনঠাসা হয়ে পড়ে। পরাজয় নিশ্চিত বুঝতে পেরে পাক বাহিনী ৩০ নভেম্বর মধ্যরাত থেকে গোপনে পিছু হটতে থাকে । বিতাড়িত হয়ে যাওয়ার পথে হানাদার বাহিনী আমঝুপি ব্রিজ , দিনদত্ত ব্রিজের কিছু অংশ বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়ে যায়। পালানোর সময় মুক্তিবাহিনীর মর্টার হামলায় কুলপালা নামক স্থানে বেশ কয়েকজন পাকসেনা নিহত হয়।
মুক্ত হলো মেহেরপুর: ১৯৭১ সালের ২ ডিসেম্বর গাংনী হানাদার মুক্ত হলে শিকারপুরে অবস্থিত মুক্তিবাহিনীর অ্যাকশন ক্যাম্পের ক্যাপ্টেন তৌফিক এলাহী চৌধুরী হাটবোয়ালিয়ায় এসে মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটি স্থাপন করেন। মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী ৫ ডিসেম্বর মেহেরপুরে প্রবেশ করে। সীমান্তে পাক বাহিনীর পুঁতে রাখা অসংখ্য মাইন অপসারণের মধ্য দিয়ে মেহেরপুর পুরোপুরিভাবে হানাদার মুক্ত হয় ৬ ডিসেম্বর।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মুজিবনগর: ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল দিনটি স্বাধীনতা সংগ্রাম তথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। ৪২ বছর আগে এই দিনে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার শপথ নিয়েছিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার এক আমবাগানে। আর সেদিন থেকে ঐ জায়গার নাম বদলে রাখা হয় মুজিবনগর। প্রবাসী অস্থায়ী সরকারের রাজধানী। ১৭ এপ্রিল গঠিত মুজিবনগর সরকারই দীর্ঘ ৯ মাসের মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে । পরবর্তীতে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে । জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নামেই মুজিবনগরের নামকরণ। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর নতুন প্রজন্মের কাছে মুজিরনগর ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরতে এ এই অঞ্চলকে পর্যটকদের নিকট আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য সেখানে একটি কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হয়।
সেদিনের স্মৃতি: ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল দিনটি ছিল শনিবার । বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণের ব্যাপারে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়। পাক বাহিনীর বিমান হামলার আশংকায় এই গোপনীয়তা। শুধুমাত্র তখন কলকাতায় প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের হাজির থাকতে বলা হয়। সকাল ৬টার মধ্যেই কলকাতা প্রেসক্লাবে কয়েকশ বিদেশি ও ভারতীয় সাংবাদিক এবং টিভি ক্যামেরাম্যান ভিড় জমায়। বাংলাদেশের পক্ষে একজন কর্মকর্তা প্রেসক্লাবে হাজির হয়ে সাংবাদিকদের স্বাগত জানান। তিনি সাংবাদিকদের আগাম কোন কিছু না জানিয়ে শুধুমাত্র তাদের গাড়ি অনুসরণ করতে অনুরোধ করেন।
সাংবাদিকরা তখনও জানেন না, তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক দুর্লভ ঘটনার সংবাদ কাভার করতে যাচ্ছেন। কলকাতা শহর পার হয়ে গাড়ির বহর কৃষ্ণনগর শহর অভিমুখে রওনা হয়। তারপর কৃষ্ণনগর পার হয়ে বাংলাদেশের সীমান্তের দিকে এগুতে থাকে । এক সময়ে সীমান্ত পেরিয়ে সবাই হাজির হলেন তত্কালীন কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তবর্তী মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথ তলার বিশাল আমবাগানে। এই আমবাগানের নতুন নামকরণ হয় মুজিবনগর। সকাল হতেই সেখানে উত্সুক জনতার ভিড়। আম বাগানের চারিদিকে রাইফেল হাতে কড়া প্রহরা বসায় বীর মুক্তিযোদ্ধারা। টিভি ক্রু ও ফটো সাংবাদিকরা মন ভরে ছবি তুলছেন। খোলা আকাশের নিচে চৌকি পেতে তৈরি করা হয়েছে শপথ মঞ্চ। স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে নতুন রাষ্ট্রের নেতারা এলেন জীপে চড়ে। জনতা জয়বাংলা শ্লোগানে তাদের স্বাগত জানায় । মঞ্চে উঠে এলেন অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম । তার পিছনে তাজউদ্দিন আহমেদ ,খন্দকার মোশতাক আহমেদ ,এ এইচ এম কামরুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও জেনারেল এম এজি ওসমানি। আসন গ্রহণপর্ব শেষে অনুষ্ঠানসূচি ঘোষণা করলেন এম এ মান্নান । পবিত্র কোরআন তেলায়াতের মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের চীফ হুইপ ইউসুফ আলি ঐতিহাসিক দলিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন । এর সাথে সাথে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট নজরুল ইসলাম , প্রধানমন্ত্রী পদে তাজউদ্দিন আহমেদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে খন্দকার মোসতাক আহমেদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদে এইচ এম কামরুজ্জামান এবং অর্থমন্ত্রী হিসেবে ক্যাপ্টেন মনসুর আলির নাম ঘোষণা করেন। আর মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ও সেনাবাহিনীর চীফ অব স্টাফ পদে যথাক্রমে এম এজি ওসমানী ও জেনারেল আব্দুর রবের নিয়োগের ঘোষণা দেয়া হয়। এরপর নতুন সরকারের অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রীবর্গ ও সেনাবাহিনী প্রধানকে শপথ বাক্য পাঠ করান অধ্যাপক ইউসুফ আলি । এ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপস্থিত না থাকলেও বার বার উচ্চারিত হয় তার নাম। শপথ গ্রহণের পর অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রী পরিষদের সদস্যবর্গকে একদল মুক্তিযোদ্ধা আনসার গার্ড অব অনার প্রদান করে। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা যা কিছু করেছি সবই মুজিবের নির্দেশে। এ অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন মেহেরপুরের বাসিন্দা অধ্যাপক আসাদুল হক ,পিন্টু বিশ্বাস ,শাহাবদ্দিন সেন্টু প্রমুখ। এ অনুষ্ঠান থেকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী বিশ্ববাসীর কাছে নতুন রাষ্ট্রের কূটনৈতিক স্বীকৃতি দান ও সামরিক সাহায্যের আবেদন জানান। বাংলাদেশের ১৬৯ জন জাতীয় সংসদ সদস্যের মধ্যে ১৬৭ জন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। অস্থায়ী সরকার গঠনের পর সকলে ভারতে চলে যান।
স্বাধীনতার সূতিকাগার মেহেরপুর জেলার মুজিবনগর বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাজধানী হলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবসের মর্যাদা আজও পায়নি । এ দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয় না, যা এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ দিনের দাবি।