একটি ছবির গল্প
প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:১৬
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের সকালবেলা তখনো সম্পূর্ণ মুক্ত হয়নি দেশ, তখনো সারেন্ডার হয়নি, রাস্তাঘাটে পাকসেনা হাঁটছে। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে মুক্তিযোদ্ধারা এসে জমায়েত হচ্ছে। ভারতীয় ট্যাঙ্ক এসে জমা হচ্ছে। মৃত্যু ভয়ে নয়, আমার খুব খারাপ লাগছিল, তাই আমি দাঁড়াতে পারছিলাম না। শাহার শহীদ হয় ১৪ ডিসেম্বর রাতে। আমাদের ঢাকা গ্রুপের মানিক ভাই শহীদ হন ১৪ নভেম্বর। তারপর নাসির উদ্দীন ইউসুফ ছিলেন আমাদের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড। তিনি আমাদের কমান্ডার হলেন এবং ঢাকা শহরের দায়িত্ব ছিল আসাদের উপর। সাভারে আমাদের ট্রেনিং ক্যাম্প। সেখান থেকে ঢাকা এসেছিলাম ফিল্ম এবং ওষুধপত্র নিয়ে যেতে। সম্ভবত ডিসেম্বরের প্রথম দিকে অথবা নভেম্বরের শেষে। সব যোগাড়-যন্ত্র করে যখন আমাদের সাভারের ট্রনিং ক্যাম্পে ফিরব, হঠাত্ খবর পেলাম ঢাকার ভেতরে আমরা যারা আছি তারা যেন কোন অবস্থাতেই ঢাকা শহর থেকে বেরিয়ে না যাই। সামনেই ঢাকা শহরে শুরু হবে প্রচণ্ড আক্রমণ এবং আমরা ভেতরে যারা আছি তাদেরকে প্রয়োজনে জীবন দিয়ে হলেও শহরের ভেতরে যুদ্ধ করতে হবে। তাই প্রত্যেকের কাছে একটি করে অস্ত্র রেখে যার যার অবস্থানে থাকতে হবে। আগেও আমাদের অস্ত্র ধরা পড়ে, সবশেষে আমাদের অস্ত্র একসাথে জমা ছিল শাহারদের বাসায়, ফার্মগেটের খুব কাছে। সেদিন ১৫ ডিসেম্বর সকালবেলা বাবলু (যে বাবলুর সাথে আমি পালিয়েছিলাম এক কাপড়ে), আসাদ আর আমার দুলাভাই মাহবুব মোরশেদ রেলওয়েতে ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন (তিনি আজ নেই), প্রচণ্ডভাবে আমাদেরকে সাহায্য করতেন রেলওয়ের সমস্ত ম্যাপ থেকে শুরু করে যত কিছু আমাদের প্রয়োজন হয়েছে সব কিছুতেই। দুলাভাই বলেন— “সবার যাওয়ার দরকার নেই। স্বপন তুই থাক। Air Action কিছু হলে তুই ছবি তুলতে পারবি। বরং আমি গাড়ি নিয়ে আসাদকে আর বাবলুকে নিয়ে যাচ্ছি। শাহারের বাসা থেকে আমরা তোদের অস্ত্রগুলো নিয়ে আসি। বস্তায় ভরে, গাড়ির পেছনে করে নিয়ে আসি, কেউ টের পাবে না”। প্রচণ্ড সাহস করলেন দুলাভাই। আসাদ আর বাবলু দুলাভাইয়ের সাথে গাড়ি নিয়ে গেল। আমি বাসায় অপেক্ষায়। অনেকক্ষণ পর ফিরে এলেন দুলাভাই। সভার মুখ কালো, কেউ কিছু বলছে না। আমাকে শুধু বললেন-অস্ত্র আনতে পারিনি। পরে কখন যেন দুলাভাই আমাকে আস্তে আস্তে বুঝিয়ে বলেন যে, গতরাতে শাহারের বাসায় আর্মিরা হামলা করেছিল। শাহারের এক বন্ধু অথবা পরিচিত কেউ একজন গোপনে আর্মিকে খবর দেয়। শাহাররা চারজন একসাথে ছিল ওই রাতে। ওর বাবা-মা অন্য জায়গায় থাকতো। ওদেরকে মেরে ফেলে রেখে গেছে উঠানে। ওরা উঠানে পড়ে আছে এবং বাড়িতে কোন অস্ত্রশস্ত্র নেই। যা ছিল সব নিয়ে গেছে। দেখেই বুঝা যায় হয়তো বন্ধু বেশে ডাক দিয়েছে, শাহার একটু বাইরে আয়। সরল বিশ্বাসে হয়তো শাহার দরজা খুলেছিল এবং চারজনকেই ১৪ ডিসেম্বর রাতে একই সাথে শহীদ হতে হলো। ওই পাড়ার অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধা ছেলেরা অবশ্য সেই বিশ্বাসঘাতক রাজাকারকে ১৬ তারিখ সকালে ধরে নিয়ে এসেছিল। আমি এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে একটা ছবি তুলেই আবার চলে যাই অন্যদিকে। প্রচণ্ড কষ্ট পেয়েছিলাম বুকের ভেতরে। আজও সেই কষ্ট আমি ধারণ করে আছি, যা কোনোদিন ভুলবো না, ভোলা যায় না।
লেখক : চলচ্চিত্র গ্রাহক ও আলোকচিত্র শিল্পী