‘নছিমন পাওয়ার লুম’ বদলে দিতে পারে তাঁতীদের ভাগ্য

লোহার তৈরি ভারী পাওয়ার লুমের আদলে দেশীয় প্রযুক্তিতে কাঠ দিয়ে তৈরি বিদ্যুত্ চালিত পাওয়ার লুম এখন সিরাজগঞ্জের তাঁতীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এর নাম দেয়া হয়েছে নছিমন পাওয়ার লুম। স্থানীয়ভাবে তৈরি যাত্রী বহনকারী যান ‘নছিমন’ থেকেই এই নামকরণ। স্বল্প অর্থ ব্যয়ে নতুন উদ্ভাবিত এই তাঁতে শ্রমিকেরা এখন শারীরিক পরিশ্রম ছাড়াই কাজ করতে পারছেন একই সাথে ২টি তাঁতে। যে কারণে বিদেশি পাওয়ার লুমের ন্যায় উত্পাদন হচ্ছে দ্বিগুণ কাপড়। এর ফলে তারা পাচ্ছেন বাড়তি মজুরি এবং মালিকরাও লাভবান হচ্ছেন। সর্বত্র এই পাওয়ার লুম চালু করা গেলে দেশের শিল্প উদ্যোক্তাদের বিদেশ থেকে আর কষ্ট করে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে পাওয়ার লুম আনতে হবে না। তবে এজন্য সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সরকার এগিয়ে এলে দেশের লাখো দরিদ্র তাঁতীর ভাগ্য বদলে যাবে বলে মনে করেন জেলার তাঁতীরা। সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পের সুনাম সেই ব্রিটিশ আমল থেকে। বর্তমানে জেলার তিন উপজেলায় প্রায় লক্ষাধিক হস্তচালিত এবং বিদ্যুত্চালিত পাওয়ার লুম রয়েছে। বেশি কাপড় উত্পাদনের লক্ষ্যে ১০/১২ বছর আগে এ অঞ্চলে প্রথম বিদ্যুত্চালিত পাওয়ার লুম নিয়ে আসা হয়। এ তাঁত বিদ্যুতের সাহায্যে চলে বলে শ্রমিকদের তেমন পরিশ্রম করতে হয় না। আর দেশীয় হস্তচালিত তাঁতের চাইতে কাপড়ও হয় দ্বিগুণ। কিন্তু এ পাওয়ার লুম সম্পূর্ণ লোহা দিয়ে তৈরী বলে এর ওজন প্রায় ১ টন। আর এক একটি তাঁতের মূল্য প্রায় ১ থেকে দেড় লাখ টাকা। যা ক্ষুদ্র তাঁতীদের পক্ষে কেনা কোনভাবেই সম্ভব নয়। প্রায় ৪ বছর আগে এই ভাবনা থেকে এনায়েতপুর থানার গোপালপুর গ্রামের ক্ষুদ্র তাঁতী বাবুল হোসেন চেষ্টা শুরু করেন কিভাবে দেশীয় প্রযুক্তিতে কাঠের তৈরি হ্যান্ডলুম তাঁতকে বিদেশি পাওয়ার লুমে পরিণত করা যায়। বেশ কিছুদিন চেষ্টার পর তিনি সফল হন। কিভাবে কাজ করে নছিমন পাওয়ার লুম-এই প্রশ্নের জবাবে বাবুল জানান, হস্তচালিত কাঠের তাঁত পাওয়ার লুমে রূপান্তরের আগে তাঁতের ডান পাশের উপরে বসানো হয় একটি মটর। পরে নিচে লোহার চাকার সাথে একটি মোটা ফিতা দিয়ে ওই মটরের সাথে সংযুক্ত করা হয়। এরপর বিদ্যুতের কানেকশন দিয়ে সুঁইচ লাগালেই কাপড় উত্পাদনের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায় নছিমন পাওয়ার লুম। তিনি আরো জানান, নতুন উদ্ভাবিত পাওয়ার লুমের ওজন মাত্র ৮ থেকে ১০ মণ। আর এটা তৈরিতে খরচ হয় মাত্র ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। বাবুল হোসেনের উদ্ভাবিত কাঠের এই বিদ্যুত্চালিত পাওয়ার লুম এখন বেলকুচি, শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া ও সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা জুড়ে বিসতৃতি লাভ করেছে। এই তাঁত ব্যবহার করে দরিদ্র তাঁতীদের পাশাপাশি বড় ব্যবসায়ীরাও উপকৃত হচ্ছেন। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে উপকৃত হয়েছেন খুকনী গ্রামের হাজী সানোয়ার হোসেন, দৌলতপুর গ্রামের শহিদুল ইসলাম, গোপালপুর গ্রামের আব্দুস সামাদ ও গোপিনাথপুর গ্রামের মজনু মিয়া। তারা জানান, এ তাঁত দিয়ে কারখানা স্থাপন করে তারা ব্যবসায়িকভাবে বেশ লাভবান হয়েছেন। তবে নতুন বিদ্যুত্ সংযোগ না পাওয়ায় ব্যবসার পরিধি বাড়ানো যাচ্ছে না। নছিমন তাঁতে কাজ করে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন শ্রমিকেরাও। গোপালপুর গ্রামের শ্রমিক ইমদাদুল হক, আসাদুল ইসলাম, গোপিনাথপুর গ্রামের ধলাই মিয়া জানান, বিদেশি পাওয়ার লুম তাঁতে প্রচন্ড শব্দসহ শ্রমিকদের নানা সমস্যায় পড়তে হত। পাশাপাশি হস্ত- চালিত তাঁতে কাজ করে আয়ও বাড়ত না। এখন কাঠের তৈরি পাওয়ার লুমে কাজ করে এসব সমস্যা দূর হয়েছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই পাওয়ার লুম-এর সহায়তায় দেশকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে মনে করেন গার্মেন্ট ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সাবেক পরিচালক এবং রেডিয়েন্স গ্রুপের এমডি শেখ আব্দুস সালাম। তিনি জানান, এলাকার তাঁতীরা স্বল্প খরচে যে পাওয়ার লুম তৈরি করেছে, এতে করে বিদেশ থেকে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে আর পাওয়ার লুম আমদানি করতে হবে না। তবে এ শিল্পের প্রসার ঘটাতে ক্ষুদ্র তাঁতীদের সহায়তায় সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।