নুরুল ইসলাম হত্যা একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড
প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৩০
গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি নুরুল ইসলাম ও তার ছেলে তমোহর ইসলামের স্মরণ সভায় বক্তারা বলেছেন, নুরুল ইসলামের হত্যাকাণ্ড একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। দ্রুত তার হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণে নাগরিক কমিটির উদ্যোগে এ স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষাবিদ অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে স্মরণসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, এ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, মহিলা পরিষদের সভানেত্রী আয়শা খানম, রাজনীতিবিদ পঙ্কজ ভট্টাচার্য, সিপিপির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, আওয়ামী লীগ নেতা মোজাফফর হোসেন পল্টু, সংসদ সদস্য ইশরাফিল আলম এমপি প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। স্মরণসভা সঞ্চালনা করেন কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ।
জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ভদ্র ও মার্জিত স্বভাবের ছিল নুরুল ইসলাম। তাকে হত্যা করা হয়েছে। আর এই হত্যা কোন স্বাভাবিক হত্যাকাণ্ড নয়। এর পেছনে চক্রান্ত রয়েছে। যেভাবে তদন্ত হচ্ছে সেটা ভালো লাগছে না। তিনি বলেন, আমরা নুরুল ইসলামের হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে যে তদন্ত হচ্ছে, তাতে কোন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। আর বিলম্ব নয়।
মহীউদ্দীন খান আলমগীর বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নুরুল ইসলামের হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড হিসাবে বিবেচনায় আনা হয়েছে। তদন্তে অগ্রগতি বা শ্লথগতি যাই হোক না কেন তদন্তের স্বার্থে এ বিষয় বলা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, কেউ কেউ হত্যাকাণ্ডে বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ওখানে বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, তারা যে কামরায় ছিল সেখানে কারো হাতের বা পায়ের ছাপ উদ্বার করা সম্ভব হয়নি। দমকলের পানিতে হাতের বা পায়ের ছাপ মুছে যায় না বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরো বলেন, নুরুল ইসলাম গুরুতর আহত হবার পরও বেঁচে ছিলেন। অনেক অনুরোধ করা সত্ত্বেও তিনি হত্যাকাণ্ডের বিষয় কিছু বলে যাননি।
হাসানুল হক ইনু বলেন, নুরুল ইসলাম ছিলেন গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সামনের সারির মানুষ। দেশের উন্নতির দিকে নিয়ে যেতে তার যে স্বপ্ন ছিল তা আমাদের বাস্তবায়ন করতে হবে।
পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, হত্যাকাণ্ডের আগে নুরুল ইসলামকে টেলিফোনে হুমকি দেয়া হয়। বলা হয়েছে, কাফনের কাপড় তৈরি করে রাখো। নির্বাচন সম্পর্কীত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই হত্যাকাণ্ডের সাথে সম্পর্কিত বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ আরো বলেন, মোবাইল ফোনের কললিস্ট দেখলেও হত্যাকাণ্ডের পেছনের বিষয়টি বের হয়ে আসবে। তিনি বলেন, নুরুল ইসলামের হত্যাকারীদের বিচারের কাঠগড়ায় আনতে আন্তরিকভাবে জাতীয় উদ্যোগ দরকার। তিনি বলেন, রাষ্ট্র এখন মেহনতি পক্ষের হয়ে কাজ করছে না।
আয়শা খানম বলেন, নুরুল ইসলামে হক্যাকাণ্ড একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত তদন্তের জন্য সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে। আর তদন্ত করতে প্রয়োজন সর্বশেষ তদন্ত কৌশল।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, নুরুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা যখন ঘটে তখন দেশের জাতীয় নির্বাচন আসন্ন ছিল। অনেকের মনে সন্দেহ জাগে রাজনৈতিক কারণে তার প্রতিদ্বন্দ্বিরা কেউ এই হত্যার পেছনে জড়িত ছিল কি না। তিনি বলেন, এখন আর রেখে-ঢেকে কথা বলার প্রয়োজন নেই। নুরুল ইসলামকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন করেন, কেন এই ঘটনা ধামাচাপা দেয়া হচ্ছে।
এ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, নুরুল ইসলামের হত্যার বিচার দাবি করেও এখনও বিচার আমরা পাইনি। এ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, নুরুল ইসলামকে হত্যা করা হয়েছে। এ কারণে আমরা তার হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার দাবি করছি। কিন্তু আমরা কোন বিচার পাচ্ছি না। নুরুল ইসলামের সাথে তার পরিবারের বিভিন্ন স্মৃতিচারণ করে সুলতানা কামাল বলেন, নুরুল ইসলাম ছিলেন আমার ভাইয়ের মর্যাদার। আমার মা তাকে খুবই ভালোবাসতেন। আমার বাসার পাশে সোভিয়েত ইউনিয়নের অফিসে তিনি চাকরি করতেন। মা তাকে জানালা দিয়ে খাবার দিতেন। তিনি বলেন, নুরুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের বিচার চার বছর ধরেও পাওয়া যাচ্ছে না। একটি সমাজে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিতই গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের প্রধান মানদণ্ড বলে তিনি উল্লেখ করেন।
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, নুরুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের পর সেখানে কোন আগুনের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। পাশের বাসার লোকও কেউ আগুন দেখেননি। বাসার দারোয়ান ৮ থেকে সাড়ে ৮টার আগে বাড়িতে ঢোকেনি। তিনি প্রশ্ন করেন, যেখানে কোন আগুনই লাগেনি, সেখানে দমকল বাহিনীকে কে খবর দিল। দমকল বাহিনীর মাধ্যমে পানি দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হলো। তিনি বলেন, ওই ঘর বা সারা বাড়িতে কোন পোড়া অংশ ছিল না। একটি কাপড় বা কাপড়ের সুতাও পুড়ে যায়নি। অথচ যেখানে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে সেখানের ওপরের সিলিং ফ্যান দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। এটা সাধারণ আগুন হতে পারে না। তিন মাস পর সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, কেমিক্যালের উত্কট গন্ধ বের হচ্ছে। দেয়ালে কালো তৈলাক্ত দাগ দেখা গেছে। আলনাতে যে কাপড় ছিল তা পানিতে দিলে পানি কালো হয়ে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ বলছে এটা আগুন নয়, রাসায়নিক দ্রব্য। সাইন্স ল্যাবরেটরি বলছে বিষাক্ত গ্যাস। আসলে এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি যারা তদন্ত করছে তারাই আগুনের কথা বলছেন। তারা এখান থেকে সরে আসছেন না।