অনুসন্ধান শেষ, বিশ্বব্যাংকের সম্মতি পেলেই মামলা
প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৩৩
পদ্মা সেতু প্রকল্পের দুর্নীতির অনুসন্ধান শেষ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আজ মঙ্গলবার অনুসন্ধান প্রতিবেদন নিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করবে দুর্নীতি দমন কমিশন। ওই বৈঠকে অভিযুক্তদের ব্যাপারে বিশ্ব ব্যাংকের সম্মতি পেলেই মামলা দায়ের করা হবে। এ মামলায় সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া, পদ্মা সেতু প্রকল্পের সাবেক পরিচালক রফিকুল ইসলাম, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, নিক্সন চৌধুরী, গোলাম মোস্তফাসহ ৭ জনকে আসামি করা হচ্ছে বলে দুদকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেন, আমাদের দেশে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র করা অপরাধ। পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হয়েছে। এ অপরাধে মামলা দায়ের করা সম্ভব। এর আগে দুদক চেয়ারম্যান বলেছিলেন, দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে পদ্মা প্রকল্পে দুর্নীতিতে জড়িতদের শনাক্ত করতে পেরেছে। যার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তিনি যে-ই হোন না কেন তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
দুদকের নির্ভর যোগ্য একটি সূত্র জানায়, পদ্মা সেতু প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির প্রাথমিক অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ গতকাল সোমবার সম্পন্ন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। দুদকের অনুসন্ধান দলের সদস্যরা আজ মঙ্গলবার সকালে কমিশনের কাছে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন ও মামলার সুপারিশ জমা দেবে। এ প্রতিবেদনে সাবেক মন্ত্রী আবুল হোসেন ও সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়াসহ রমেশের ডায়েরিতে ঘুষের তালিকায় থাকা ৫ জনসহ আরো ৩ জনের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করা হচ্ছে। ওই প্রতিবেদন নিয়ে দুদক চেয়ারম্যানসহ দুদকের অনুসন্ধান দল মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর একটি হোটেলে বিশ্ব ব্যাংককের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সঙ্গে বৈঠক করবে। সেখানে বিশ্ব ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনার পর আজ মঙ্গলবার বিকালে অথবা আগামীকাল বুধবার অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। তবে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা মসিউর রহমান সন্দেহের তালিকায় থাকলেও মামলার আসামি হচ্ছেন না। পরবর্তীতে তার সংশ্লিষ্টা পাওয়া গেলে মামলায় আসামি করা হতে পারে। বিষয়টি বিশ্ব ব্যাংকে অবহিত করবে দুদক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলেন, তদন্ত কর্মকর্তারা কমিশনে প্রতিবেদন দেয়া মাত্রই এর সার সংক্ষেপ বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের কাছে দেয়া হবে এবং তারপরেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে মামলা দায়ের করা হবে। তিনি আরো জানান, রমেশের ডায়েরিতে ঘুষের তালিকায় থাকা ৫ ব্যক্তির বাইরেও একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তিনি আরো জানান, মামলা দায়ের পর বিশ্ব ব্যাংকের কাছে যারা ইমেল করে পদ্মা সেতু দুর্নীতির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। এবং তাদের দেয়া তথ্য মামলার নথীপত্রে যোগ করা হবে। এছাড়া পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির সঙ্গে যারা পরোক্ষ ভাবে জড়িত তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করা হবে।
সূত্র জানায়, পদ্মা সেতু প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতি হয়েছে, এমন অভিযোগ ওঠার পর সর্বপ্রথম কানাডিয়ান পুলিশ তদন্ত শুরু করে। তদন্তকালে কানাডায় এসএনসি-লাভালিনের অফিস থেকে পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজকর্ম সংক্রান্ত একটি গোপন ডায়েরি জব্দ করে। ওই ডায়েরিতে ঘুষের টাকা দাবি সংক্রান্ত একটি তালিকা পাওয়া যায়। ওই তালিকায় প্রথমেই লেখা হয়, ‘দাবি অনুযায়ী তাদের কিছু দিতে হবে’। পরে সিরিয়াল অনুযায়ী কয়েকজনের নাম লেখা হয়। ভারতীয় বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক রমেশ সাহার ডায়েরিতে দুর্নীতির তালিকায় প্রথমে সংক্ষিপ্তভাবে লেখা হয় তিন ব্যক্তির নাম। তারা হচ্ছেন, তত্কালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া ও পদ্মা সেতু প্রকল্পের সাবেক পরিচালক রফিকুল ইসলাম। এরপর সম্পূর্ণ রূপে লেখা হয় সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী ও হুইপ নূরে আলম চৌধুরী লিটনের ভাই নিক্সন চৌধুরীর নাম। প্রথমে কানাডিয়ান পুলিশ তদন্তের কিছু তথ্য-উপাত্তসহ নামের তালিকাটি বিশ্বব্যাংকে পাঠায়। বিশ্বব্যাংক এরই মধ্যে ওই তালিকা দুদকে পাঠিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের তিন সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল এর আগে ঢাকা সফর করে যাওয়ার সময় দুদক কর্মকর্তাদের বেশ কিছু পরামর্শ দেন। পদ্মা সেতু প্রকল্পের ইন্টিগ্রিটি এডভাইজার ও প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মসিউর রহমান ও সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনসহ আরো কয়েকজনকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজনীয়তা দেখান। বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী দুদক সেসব ব্যক্তিদের পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ সম্পন্ন করে। ওই জিজ্ঞাসাবাদে এসএনসি লাভালিনের বাংলাদেশের সাব-এজেন্ট গোলাম মোস্তফার সঙ্গে রমেশের যোগাযোগ থাকতে পারে বলে তদন্ত কর্মকর্তাদের জানান মসিউর রহমান। এরপর গোলাম মোস্তফাকে দুদকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য পাওয়া যায়। এরই ধারাবাহিকতায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় সাবেক সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়াসহ পাঁচজনকে। মোশাররফ হোসেন জিজ্ঞাসাবাদে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীর উপর ছেড়ে দিয়েছেন বলে জানা যায়। এরপর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় আবুল হোসেন ও আবুল হাসানকে।