গার্মেন্টস শ্রমিক নেতারা কী শ্রমিক বান্ধব!

দেশের তৈরি পোশাক শিল্পখাতে গত কয়েক বছর ধরে চলে বিশৃঙ্খলা ও নাশকতার ঘটনায় শ্রমিক নেতাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, আসলেই এসব শ্রমিক নেতারা কী শ্রমিক বান্ধব? সাভার, আশুলিয়াসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিক নেতা নামধারী একটি চক্র পোশাক কারখানায় আগুন আতংক সৃষ্টি, কারখানা মালিকদের উপর অন্যায় চাপ সৃষ্টি ও শ্রমিকদের উসকে দিয়ে ফায়দা লুটছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বৈদিশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধানতম এ খাতটি ধ্বংসে দেশি ও বিদেশি চক্রের ষড়যন্ত্রের কথা প্রায়ই শোনা যায়। এ চক্রটির সঙ্গে দেশের শ্রমিক নেতারাও জড়িত বলে অভিযোগ আছে। কথিত আছে তারা বিদেশি চক্র থেকে মোটা টাকা এবং সুযোগ সুবিধা পেয়ে আসছে। পুলিশ, গার্মেন্টস মালিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শ্রমিক নেতা নামধারী এক দম্পতি বহুদিন ধরে বিদেশি চক্রের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। এই দম্পতি কোন পোশাক কারখানায় চাকরি করে না। গোয়েন্দা সংস্থা পুরো চক্রটির বিস্তারিত উল্লেখ করে এ দম্পতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারের শীর্ষ মহলে রিপোর্ট দিয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, পোশাকখাত ধ্বংস করার এই চক্রের সদস্যদের বাসা গুলশান, বনানী, ডিওএইচএস, উত্তরাসহ অভিজাত এলাকায়। গতকাল সোমবার আশুলিয়ার পাঁচজন গার্মেন্টস মালিক ও সুইজারল্যান্ডের নাগরিক এক বায়িং হাউজের প্রধান ইত্তেফাককে জানান, জার্মানিতে সম্প্রতি একটি কারখানায় আগুনে ১৪ জন শ্রমিক পুড়ে মারা যায়। আহত হয়েছিল শতাধিক। কিন্তু সেখানে কোন শ্রমিক আন্দোলন কিংবা কোন ধরনের বিশৃংখলা হয়নি। সরকার এ ঘটনায় আইনগত যা যা করণীয় করেছে। কিন্তু এ দেশে একটি পোশাক কারখানার জন্য শত শত কারখানা বন্ধ থাকা দুঃখজনক বলে জানান ওই বিদেশি নাগরিক। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক পোশাক কারখানার মালিক বলেন, আতংকে কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। শ্রমিক নেতা নামধারী কিছু ব্যক্তি কারখানায় এসে নানা দাবি করছে। সুযোগ সুবিধা আদায়ের আন্দোলনের নামে শ্রমিকদের উসকে দিচ্ছে তারা। বিশৃঙ্খলা ও নাশকতার জন্য মূলত তারাই দায়ী। মালিকরা বলেন, এক শ্রমিক নেতা দম্পতি কোন গার্মেন্টসে কাজ করেন না। অথচ তাদের আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও ইউরোপের পাঁচ বছর মেয়াদী ভিসাযুক্ত পাসপোর্ট রয়েছে। ওই দম্পতি বিলাস বহুল গাড়িতে চড়েন। থাকেন বনানী এলাকায়। দিনের বেলায় আশুলিয়া ও সাভার গার্মেন্টস এলাকায় ঘুরাফেরা করে। গতকাল রাস্তার বিদ্যুত্ খুটির টিউবলাইট বিস্ফোরণ ঘটেছে। অথচ আগুন আগুন বলে প্রচার চালিয়ে ১৮টি গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে যায়। ঐ সময় চক্রের নেতানেত্রী এবং সহযোগী সেখানে নেতৃত্ব দেয় বলে মালিকরা জানান। গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, শ্রমিক নামধারী চক্রটি প্রতি মাসে ২-৩ বার বিদেশে যায়। তাদের কাজ হলো শ্রমিকদের আন্দোলন নামিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা। র্যাবের লিগ্যাল ও মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মোহাম্মদ সোহায়েল বলেন, গার্মেন্টস সেক্টরের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের সম্পর্কে র্যাব সজাগ। পোশাক শিল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের শনাক্তকরণে র্যাব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি জানান। অপর একটি গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা যায়, দেশের অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র কিংবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য গার্মেন্টস সেক্টরকে মাঝে মাঝে কাজে লাগানো হয়। দুইজন মালিক বলেন, সাত থেকে ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন ভাতা দেয়ার নির্ধারিত সময়। এ সময় পর্যন্ত শ্রমিকদের মধ্যে কিংবা কোন গার্মেন্টসে বিশৃঙ্খলা ও হামলা হবে না। শ্রমিক নামধারী নেতারা গার্মেন্টস এলাকায় আসবে না। বেতন ভাতা দেয়া শেষ হওয়ার পর থেকে কোন না কোন গার্মেন্টস সৃষ্টি হবে নানা অজুহাতে বিশৃঙ্খলা। নেপথ্যে বিদেশি চক্রের এজেন্ট শ্রমিক নামধারী নেতারাই জড়িত বলে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান। এ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলে গার্মেন্টস সেক্টরে বিশৃঙ্খলা হবে না এবং সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় থাকবে বলে মালিক পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। কিছুসংখ্যক গার্মেন্টস মালিক ও শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা না দিয়ে নিজে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ঐ সব গার্মেন্টসে শ্রমিকরাই ন্যায্য পাওনার জন্য আন্দোলন করেন। এটার প্রভাব অন্যান্য গার্মেন্টসে গিয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে ঐ সব গার্মেন্টস মালিককে শনাক্ত করে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা দিতে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে বিদেশি চক্র করা ষড়যন্ত্র কাজে লাগানোর সুযোগ পাবে না বলে মালিক পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান বলেন, সাভার-আশুলিয়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বিশৃঙ্খলা ও নাশকতার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে তিনি জানান।