দীদা এবং স্বপন

আমাদের পাড়ার বাসাটা একটু ভেতরে। বাসার পাশে একটা ছোট্ট ঘর মাটির। নির্জন আর নিশ্চুপ। সেখানে বাস করতো এক বৃদ্ধা। অনেক বয়স, বয়সের ভারে সে কুঁজো হয়ে হাঁটে। খুব প্রয়োজন হলে কথা বলেন। বেশী কথা বলেন না। আমরা সবাই তাকে দীদা বলে ডাকি। ঘরে আসবাব বলতে শুধু একটা চৌকি, ক’টা হাড়ি-পাতিল আর বড় করে বাঁধানো একটা ছবি। ছবিটি কিশোর বয়সের একটি ছেলের। মুখে মৃদু হাসি। চোখ দুটোতে স্বপ্ন বিরাজ করছে। পুরো মুখে যেন দ্বীপ্তি আর উচ্ছ্বাসের মিশেল। সন্ধে হলে কুপি জ্বালিয়ে ছবিটির পাশে বসে থাকেন। এখনোও চিড়া ভাঙ্গে, নাড়ু বানায়, মুড়ি তৈরি করে, ডালের বড়ি বানায়। আমি নির্মল কৌতূহল নিয়ে তিনি কী কী করতেন তা দেখতাম। পাড়ার সবাই তাকে খুব শ্রদ্ধা করেন। ১৬ ডিসেম্বর। নানা আয়োজনে দিনটি পালিত হচ্ছে। আমাদের স্কুলেও অনুষ্ঠান আছে। আমি স্কুলের ড্রেস পরে বাইরে বেরুতেই দেখা গেল বৃদ্ধাটিকে। বৃদ্ধা একটা পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। পাশে হেঁটে যাওয়া একজন লোককে বললেন— পতাকাটি তার বাড়ির সামনে খুঁটিতে টাঙিয়ে দিতে। পতাকা টাঙানোর পর পাড়ার সকল শিশুকে ডাক দিলেন। একটু দূরে দেখি শিশুরা বাটি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। শিশুদের বাটিতে করে পায়েস খেতে দিলেন দীদা। আমিও সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, দীদা আমাকেও পায়েস খেতে দিলেন। আজ তাকে বেশ হাসি-খুশী লাগছে। কীসের জন্য দীদার এতো পরিবর্তন তা বুঝতে পারছি না। দেখলাম দীদা একটা মোড়া এনে আমাদের পাশে বসলেন। তারপর বললেন, আজ ১৬ ডিসেম্বর। আমাদের বিজয় দিবস। এই দিন বাংলাদেশ নামে একটি দেশ মানচিত্রে স্থান পায়। বাংলাদেশ পায় তার নিজের সত্তা। ১৯৭১ সাল, ঠিক এই সময় বাঙালির সে কী আনন্দ। রেডিও, টিভি, বেতার সব জায়গায় বিজয়ের উচ্ছ্বাস। আমিও বা কম যাই কী সে, তখন আমিও যে কম বয়সের। আশপাশের সবাইকে নিয়ে আমিও বের হলাম। হাতে বাংলাদেশের পতাকা, মুখে বাংলার মুক্তির গান। আমি অবাক হয়ে যাই, এই দীদা এতো কথা বলতে পারেন। অথচ আমরা কেউ জানতাম না। জানবই বা কীভাবে সে কারও সাথে কোথাই বলেন না। আজ দীদার কথা শুনে মুগ্ধ হচ্ছি। তারপর দীদা বললেন, ঐ যে আমার ছেলের ছবি। তার ঘরে যে ছবিটা রাখা সেটা দেখালেন। পাকবাহিনী আমার ছোট ছেলেটাকেও ছাড়ল না। এপ্রিল এর মাঝামাঝি কোন এক বিকেলে এসে আমাকে বলল, “মা গো দেশে যুদ্ধ লাগছে। ওরা বলছে মানে পাকিস্তানীরা আমরা বাংলাভাষায় কথা বলতে পারব না। তাদের মতো চলতে হবে। আমরা সেটা মানি না, মানব না। আমি যাই। মা-গো দোয়া কইরো দেশটা যেন স্বাধীন হয়।” তখন আমি ওকে বাধা দেই নাই। আমার ছেলের নাম স্বপন। ওতো যুদ্ধে শহীদ হইছে। মনটা ভারী হয়, কিন্তু তবুও শান্তি এসে বিরাজ করে মনে ও ভাবনায়। সে দেশের জন্য জীবন দিছে, তার ক্ষয় নাই, ওরে ক্ষয় নাই।