শোভনের পতাকা
প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:১১
শোভনের বাবা অফিস থেকে বাসায় ফিরলেন সন্ধ্যার কিছুটা পর। এই সময় শোভন দৌড়ে এসে তার বাবার পাশে দাঁড়াল। তার বাবাকে কিছুক্ষণ দেখল। তার বাবার হাতে কিছু নেই। ব্যাগ নেই। খালি হাত। শোভনের মুখ কালো হয়ে গেল এবং কোনো কথা না বলে সরাসরি খাটের নীচে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল।
শোভনের মা-বাবা শোভনকে দেখতে না পেয়ে সব রুমে খুঁজলেন। কিন্তু কোথাও শোভনকে পাওয়া গেল না। এখন শোভনের মা-বাবা শোভনকে ডাকছেন, শোভন তুমি কোথায়? তুমি কোথায় বাবা? বাবা চানমানিক তুমি কোথায় গিয়েছো? তারা মুহূর্তের মধ্যে অস্থির হয়ে পড়লেন। তারা যখন অস্থির হয়ে এ রুম থেকে ও রুমে আবার ও রুম থেকে এ রুমে দৌড়াদৌড়ি করছেন তখন শোভন বলল, এখন তাহলে মজাটা বোঝো। আমি কোথায় কাউকেই বলব না।
শোভনের কথা শুনে তার মা-বাবা দৌড়ে এসে খাটের নীচে তাকিয়ে দেখেন শোভন শুয়ে আছে। শোভনের বাবা বললেন, তুমি এখানে লুকিয়ে আছো কেন?
শোভন বলল, আমি রাগ করেছি।
তার বাবা বলল, রাগ করেছো কেন?
শোভন বলল, তোমাকে শিক্ষা দিতে।
এই কথা শুনে শোভনের বাবা হেসে দিলেন। তখন শোভনের মা বললেন, ঠিক আছে রাগ করেছো তা বুঝতে পারলাম, কিন্তু কেন রাগ করেছো সেটা বলো। না হয় রাগ ভাঙাবো কীভাবে?
শোভন বলল, কাল যে স্বাধীনতা দিবস বাবা ভুলে গেছে কেন?
হঠাত্ শোভনের বাবার মনে পড়ল আগামীকাল স্বাধীনতা দিবস। শোভন বলেছিল একটা পতাকা কিনে আনতে। স্বাধীনতা দিবসে সে ভোর বেলায় বাসায় পতাকা টানাবে।
ডিসেম্বরে স্কুলের ছুটির পর গ্রামের বাড়িতে গিয়ে শোভন তার দাদার কাছে স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা শুনে এসেছে। বাঙালি বীরের জাতি। তারা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। শোভন বাড়িতে গিয়ে দাদার কাছে শুনেছে মুক্তিযুদ্ধের কথা। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনী অনেক নারী, পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করেছে। তখনকার দিনগুলো ছিল বড়ই ভয়ঙ্কর। মানুষের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিত। পুড়িয়ে মারত শিশুদেরকে।
এই জন্য ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে বাসায় পতাকা টানাতে হয়। আবার ২১ ফেব্রুয়ারিতেও পতাকা টানাতে হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি হলো শহীদ দিবস। তবে শহীদ দিবসে পতাকা অর্ধনমিত রাখতে হয়।
শোভনের বাবা শোভনকে খাটের নীচে থেকে টেনে আনলেন। শোভনের শরীর ধুলোবালি আর ঝুলকালিতে মেখে গেছে। তার বাবা তাকে আদর করলেন। তারপর বললেন, তুমি একটু অপেক্ষা করো আমি এখনই পতাকা কিনে নিয়ে আসছি।
কিছুক্ষণ পরই শোভনের বাবা গলির মোড় থেকে একটা দোকান থেকে একটা পতাকা কিনে আনলেন। পতাকা দেখে শোভন খুব খুশি। সে পতাকাটা বুকে জড়িয়েছে। ঘ্রাণ নিয়েছে।
পরদিন ভোর বেলায় শোভন জেগে উঠেছে। তার বাবাকেও ডেকে তুলল। শোভন বলল, বাবা চলো পতাকাটা টানিয়ে দিই।
শোভনের ডাক শুনে তার বাবা ও মা দু’জনেই তাড়াতাড়ি জেগে উঠলেন। তারা ছাদে গিয়ে পতাকাটা টানালেন।
শোভনের চোখ দু’টি আনন্দে ঝলমল করছে। শোভনের বাবা মনে মনে বললেন, আমি এতদিন কী করলাম? কোনো দিন আমাদের দেশের পতাকা টানায়নি। অথচ আজ শোভনের কাছে শিক্ষা পেলাম। শোভনের বাবাকে নিজের কাছে অপরাধী মনে হচ্ছে। আর মনে মনে ভাবছেন আহা যদি শোভনের মতো সারা দেশের শিশুরা আমাদের মতো বোকা মানুষগুলোকে দেশপ্রেমের শিক্ষা দিতে পারত। তিনি যেন এক কল্পনার জগতে চলে যান। তখন তিনি দেখতে পান সারা ঢাকা শহরে প্রতিটি বাসায় শিশুরা আজ স্বাধীনতা দিবসে পতাকা টানিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করছে। একাত্তরের যুদ্ধে শহীদ শিশুদের স্মরণ করছে। একাত্তরের যুদ্ধে শহীদ মা-বোনদেরকে। আর বাংলাদেশের পতাকাটি পতপত করে বাতাসে উড়ছে।