অশ্রু মিশেছে বাংলার মাটিতে

৮ ডিসেম্বর ১৯৭১। আমি কবির ভাইয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে ৯ নম্বর সেক্টরে আমাদের যুদ্ধের অগ্রগতি দেখার জন্য যাই। ততদিনে মুক্তিবাহিনী অনেক দূরে ঢুকে গেছে। আমি সাতক্ষীরা সাব-সেক্টর দিয়ে পূর্বদিকে এগুচ্ছি-লাম। তখন তালা’র কাছে প্রচণ্ড যুদ্ধ হচ্ছে। ঐ সাব-সেক্টরটিতে আমি আগেও গিয়েছি। ফলে ওদের সঙ্গে আমার বেশ ভাল সখ্য হয়ে গিয়েছিল। ৯ নম্বর সেক্টর ঘুরে আরও পাঁচ-ছয়টি যুদ্ধ শেষে বেশ কিছু যুদ্ধ প্রতিবেদন এবং সাক্ষাত্কার ধারণ করে আমি আমাদের বেতার ভবনে ফিরে এলাম। সেখানে ফিরে আসতে না আসতেই কবির ভাই বললেন, আমরা যুদ্ধ জয়ের দ্বারপ্রান্তে। অচিরেই যদি পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশে আত্মসমর্পণ করে তাহলে তাকে কয়েক মিনিটের নোটিসে মুজিবনগর সরকারের সব মন্ত্রী এবং গুরুত্বপূর্ণ কর্মচারীদের সাথে হেলিকপ্টার যোগে ঢাকা যেতে হবে। এই মুহূর্তে আমার কর্তব্য কী, জিজ্ঞেস করাতে তিনি বললেন, আমি যেন মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর পেছনে পেছনে যশোর রোড দিয়ে যশোরের দিকে যাই। পথে বিভিন্ন গ্রাম এবং জনপদ যখন স্বাধীন হবে, সেখানকার অধি-বাসীদের সাক্ষাত্কার আমাকে টেপ রেকর্ডারে ধারণ করতে হবে। তারপর সেগুলো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রচার করতে হবে। ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১। আমি আবার যুদ্ধক্ষেত্রের পথে পা বাড়ালাম। বেনাপোল পার হয়ে আমি বেশ কিছু গ্রামে আমার বরাদ্দকৃত কাজ শেষ করে যশোর রোডের ওপরে এসে দাঁড়িয়েছি। উদ্দেশ্য, ঐ রাস্তা ধরে যশোরের দিকে যাব। স্থানটির নাম নাভারণ। ১৫ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বরের অপরাহ্ন পর্যন্ত আমি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি। তারপর ঐ অপরাহ্নে প্রচণ্ড ক্লান্তি নিয়ে যশোর রোডের ওপরে টেপ রেকর্ডার হাতে পূব দিকে হেঁটে চলেছি। উদ্দেশ্য, যশোর রোডে যদি ভারতীয় সেনাবাহিনীর কোন গাড়ির দেখা মেলে তাহলে সেটাতে চেপে যশোর যাওয়া যাবে। গত দুই দিন ধরেই ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী প্রধান জেনারেল ম্যামেকশ, বাংলাদেশে নিয়োজিত পাকিস্তানি সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজীকে একের পর এক বার্তা দিয়ে চলেছেন—নানা সংবাদ মাধ্যমের মারফত এবং এ ছাড়াও ভারতীয় বিমান বাহিনীর মাধ্যমে সারা বাংলাদেশের আকাশ থেকে লিফলেট ছাড়নো হচ্ছে। এই ঘোষণাগুলোতে পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করতে বলা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ঢাকা শহরকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে মুক্তিবাহিনী ও মিত্র বাহিনী। ঘোষণায় এও বলা হচ্ছে যে, ঢাকা এখন ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনীর কামানের আওতার মধ্যে। পাকিস্তান বাহিনী যদি আত্মসমর্পণ না করে তাহলে ঢাকা শহরের ওপরে ভারী গোলাবর্ষণ শুরু হবে। সেই সঙ্গে চলবে ভারতীয় বিমান বাহিনীর অবিরাম বোমা বর্ষণ। এছাড়াও যদি আমাদের দিকের পদাতিক বাহিনী ঢাকা শহরে প্রবেশ করে—তখন ঢাকা শহরের রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ বেধে যাবে। তাতেও বিস্তর লোক মারা পড়বে। এই সকল ভাবছি আর মন আতংকে ভরে যাচ্ছে। ঐ শহরে বন্দী অবস্থায় রয়েছে আমার কত আপনজন। তাদেরকে গিয়ে দেখতে পাব তো? নাকি গোলার আঘাতে ঢাকা বিধ্বস্ত নগরী হয়ে যাবে? যদিও—এটা বুঝতে পারি স্বাধীনতা একেবারে দোরগোড়ায় এসে গেছে। তবুও কী এক অজানা আশঙ্কায় মন ভরে যায় বিষাদে। এমন সময় ঠিক উল্টো দিক থেকে একটি সেনাবাহিনীর জীপ এল। আমার কাছে এসে জীপটি গতি শ্লথ করল। চালক একজন ভারতীয় সেনা অফিসার। হাসতে হাসতে তিনি আমাকে বললেন, এই মাত্র ওয়ারলেসে খবর পেলাম ঢাকায় নিয়াজী আত্মসমর্পণ করেছে। Rejoice, You are free। বলেই জীপটি ভুস করে বেরিয়ে গেল। ‘Your are free! তোমরা স্বাধীন!’—কথাটি কানে ভাসতে লাগলো। করোটির ভেতরে ঢুকে গেল যেন। আমি স্থাণুর মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। টেপ রেকর্ডারটা আমার হাত থেকে খসে পড়ে গেল রাস্তার ওপরে। আমি শুয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম। আমার দুটি হাতের তালু দিয়ে বাংলার মাটিতে সস্নেহে স্পর্শ করলাম। তারপর আস্তে আস্তে সেই মাটিতে শুয়ে পড়লাম। গড়াতে শুরু করলাম আমার বাংলার মাটিতে। গড়াতে গড়াতে কখন যে রাস্তা থেকে ঢাল বেয়ে নেমে গেছি ধান ক্ষেতের মাঝে—লক্ষ্যই করিনি। চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় বয়ে চলেছে আনন্দাশ্রু। আমি হাঁপুস নয়নে কাঁদছি। সেই অশ্রু গিয়ে মিশেছে বাংলার মাটিতে। মনে হল, এত গাঢ় নীল আকাশ কখনও দেখিনি। এমন টকটকে অস্তগামী সূর্য কখনও দেখিনি যেন আগে। এমন সুখের অপরাহ্ন কখনও আসেনি জীবনে। এখন সুখ আর সুখ চারপাশে। ঘাসের উপর গজিয়ে ওঠা বনফুল সুখের রসে টুইটুম্বুর, ঘাসের ডগায় সুখ শিশিরের বিন্দু, শালিকের-দোয়েলের-ময়নার মুখে সুখের কল-কাকলী। হঠাত্ অবসাদে ছেয়ে গেল মন। আজ থেকে তবে আমার দায়িত্ব শেষ। নির্ধারিত কাজের সমাপ্তি। বড্ড ক্লান্ত মনে হল নিজেকে। সদ্য স্বাধীন বাংলার শিশির ভেজা সবুজ ঘাসে চিত্পাত হয়ে শুয়ে আছি আমি। টেপরেকর্ডার, ট্রানজিস্টার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে মহাসড়কে। এখন আর কী আসে যায়?