জামায়াতের গঠনতন্ত্রে
ব্যাপক পরিবর্তন
প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৩২
গঠনতন্ত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ইসলামের শাসন কায়েমের ধর্মীয় উদ্দেশ্যপূর্ণ এবং সংবি-ধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) পরিপন্থি মোট ৮টি ধারা পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন, বিয়োজন করে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) সংশোধিত গঠনতন্ত্র জমা দিয়েছে দলটি। এদিকে, জমা দেয়া নতুন গঠনতন্ত্রে সংশোধনীগুলো যথাযথভাবে এসেছে কিনা তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে কমিশন। রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্র যাচাই-বাছাই সংক্রান্ত কমিটির কাছে দলটির সংশোধিত গঠনতন্ত্র পেশ করা হচ্ছে। ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই আগামী বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।
নির্বাচন কমিশনার মেহাম্মদ আবু হাফিজ ইত্তেফাককে বলেন, ‘জামায়াত যে সংশোধিত গঠনতন্ত্র জমা দিয়েছে, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। যাচাই-বাচাই সংক্রান্ত কমিটির সুপারিশ পেলেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। যদি দলটির গঠনতন্ত্র কমিশনের সভায় অনুমোদিত না হয় তাহলে আইনানুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
ইসিতে জমা দেয়া গঠনতন্ত্র থেকে আল্লাহ প্রদত্ত ও রসুল প্রদর্শিত ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার কথা বাদ দিয়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার কথা বলেছে দলটি। একই সঙ্গে নতুন গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। ‘আল্লাহ ব্যতীত কাহাকেও সয়ংসম্পূর্ণ বিধানদাতা ও আইন প্রণেতা মানিয়া লইবে না এবং আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁহার দেয়া আইন পালনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নয় এমন সকল আনুগত্য মানিয়া লইতে অস্বীকার করিবে’ এ নীতিটিও গঠনতন্ত্র থেকে বাদ পড়েছে। এগুলো ছাড়াও বেশকিছু ভাষাগত ও তত্ত্বগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর অন্যতম হচ্ছে-‘সমাজের সর্বস্তরে খোদাভীরু নেতৃত্ব কায়েমের চেষ্টা’র বদলে ‘চরিত্রবান নেতৃত্ব’ কথাটি সংযোজন।
ইসি সূত্র জানিয়েছে, কমিশনের আইন শাখার যুগ্ম সচিব এন আই খানের নেতৃত্বে ৫ সদস্যর কমিটি রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্র যাচাই-বাচাই করছে। ওই কমিটি জামায়াতের সংশোধিত গঠনতন্ত্র যাচাই-বাচাই করবে। এ জন্য কমিশনের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে কার্যপত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে। ওই কমিটি জামায়াতের জমা দেয়া গঠনতন্ত্রে সন্তুষ্ট হলে ধন্যবাদপত্র আর অসন্তুষ্ঠ হলে আবারো আপত্তি পত্র দেয়ার জন্য কমিশনের কাছে সুপারিশ করবে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।
নির্বাচন কমিশন সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক জামায়াতের গঠনতন্ত্রের ২ ধারার ৫ উপধারা, ধারা ৩, ৫ ধারার ৩ উপধারা, ৬ ধারার ৪ উপধারা, ৭ ধারার ১ থেকে ৪ উপধারা, ১১ ধারার ২ উপধারা ও ১৮ ধারার ৪(চ) উপধারা সংশোধনের তাগাদা দেয়। গত ৪ নভেম্বর দলটির সেক্রেটারি জেনারেল বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ অনুসারে জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্র ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে সংশোধন করতে তাগিদ দেয়া হয়েছিল। তবে প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশের কথা উল্লেখ করে নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে দুই মাসের সময় চায় জামায়াত। তবে তাদেরকে সে সময় দেয়া হবে কিনা সে সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই দলটি গঠনতন্ত্র সংশোধন করে তার মুদ্রিত কপি দিয়েছে। এর আগে নির্বাচন কমিশনে ২০০৮ সালে নিবন্ধিত হওয়ার পর জামায়াতকে এ বিষয়ে তিনবার তাগিদ দেয়া হয়। পরবর্তীতে জামায়াত নেতা এডভোকেট জসীম উদ্দিন সরকার গঠনতন্ত্র থেকে কয়েকটি ধারা লাল কালি দিয়ে কেটে সেগুলো গঠনতন্ত্রের অংশ নয় মর্মে স্বাক্ষর করেন। তবে সংশোধিত গঠনতন্ত্রে সেগুলো স্থান পায়নি।
সংশোধিত গঠনতন্ত্রে যা আছে
গঠনতন্ত্রের ২ ধারার ৫ উপধারার একাংশে বলা ছিল, ‘(আল্লাহ ব্যতীত) কাহাকেও স্বয়ংসম্পূর্ণ বিধানদাতা ও আইন প্রণেতা মানিয়া লইবে না এবং আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁহার দেওয়া আইন পালনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নয়, এমন সকল আনুগত্য মানিয়া লইতে অস্বীকার করিবে।’ সংশোধিত গঠনতন্ত্রে এ অংশটি বাদ দেয়া হয়েছে।
৩ ধারায় দলের লক্ষ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভূমিকাসহ চারটি উপধারায় আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসুল (সা.) প্রদর্শিত দ্বীন (ইসলামী জীবনবিধান) কায়েমের প্রচেষ্টার কথা বলা ছিল। সেগুলো বাদ দিয়ে ‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং মহান আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন’ বাক্যটি সংযোজন করা হয়েছে।
৫ ধারার ৩ উপধারায় বলা ছিল, ‘সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলামের সুবিচারপূর্ণ শাসন কায়েম করিয়া সমাজ হইতে সকল প্রকার জুলুম, শোষণ, দুর্নীতি ও অবিচারের অবসান ঘটাইবার আহ্বান জানাইবে।’ এ অংশ থেকে ‘ইসলামের’ শব্দটি বাদ দিয়ে তার পরিবর্তে ‘গণতান্ত্রিক পদ্ধতি’ কথাটি সংযোজন করা হয়েছে।
৬ ধারার ৪ উপধারায় ‘ইসলামের পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠাকল্পে গোটা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাঞ্ছিত সংশোধন আনয়নের উদ্দেশ্যে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় সরকার পরিবর্তন এবং সমাজের সর্বস্তরে সত্ ও খোদাভীরু নেতৃত্ব কায়েমের চেষ্টা করা’ এই বাক্য থেকে ‘খোদাভীরু’ বাদ দিয়ে ‘চরিত্রবান’ শব্দটি যোগ করা হয়েছে।
৭ ধারার ১ থেকে ৪ উপধারায় জামায়াতের সদস্য হতে হলে ইসলামে বিশ্বাস ও শরিয়তের নির্ধারিত ফরজ ও ওয়াজিব আদায়ের শর্ত দেয়া ছিল। এগুলো এখন বিলুপ্ত করা হয়েছে।
১১ ধারার ২ উপধারায় যেকোনো অমুসলিম নাগরিক কয়েকটি শর্ত পূরণের মাধ্যমে জামায়াতের সদস্য হতে পারবে বলা ছিল। এ উপধারাটি দলের গঠনতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও স্ববিরোধী বলে জানায় কমিশন। জামায়াত এই উপধারা বিলুপ্ত করেছে।
১৮ ধারার ৪ (চ) উপধারায় বলা ছিল, ‘আমীরে জামায়াত কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরার সহিত পরামর্শ করিয়া প্রয়োজনীয়সংখ্যক সদস্যকে (রুকনকে) কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরার সদস্য মনোনীত করিতে পারিবেন।’ এটি আরপিও পরিপন্থি বলে উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশন। এ উপধারাও বিলুপ্ত করা হয়েছে। জামায়াতকে গঠনতন্ত্রের ৬৪ পৃষ্ঠার বিশেষ নোটের দফা ৩-এ সংশোধনী আনারও তাগিদ দিয়েছিল ইসি। দলের গঠনতন্ত্রে সব কমিটিতে আরপিও অনুসারে ২০২০ সালের মধ্যে ৩৩ শতাংশ মহিলা সদস্যের স্থলে বেশিরভাগ কমিটিতে ২৫ শতাংশ মহিলা সম্পৃক্ত করা হবে বলে জানানো হয়েছিল। সংশোধিত গঠনতন্ত্রে মহিলা সদস্য ৩৩ শতাংশ করেই ৬৯ ধারায় তা সন্নিবেশ করা হয়েছে।
গত ৪ নভেম্বর আট নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে ত্রুটি চিহ্নিত করে তা সংশোধনের জন্য চিঠি পাঠায় নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে কেবল জামায়াতে ইসলামীকে গঠনতন্ত্র সংশোধনের জন্য এক মাসের সময় দেয় কমিশন। গঠনতন্ত্রে ত্রুটি থাকা অন্য দলগুলো হলো-ইসলামী ঐক্যজোট, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, গণফোরাম, গণফ্রন্ট, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও জাতীয় পার্টি।