তেরো হাজার ফার্মাসিস্টের রেজিস্ট্রেশন
আটকে আছে দুই গ্রুপের মামলায়
প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৩৩
দুই গ্রুপের মামলার কারণে ফার্মেসি কাউন্সিলের রেজিস্ট্রেশন বন্ধ থাকায় ৫ সহস্রাধিক গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্ট এবং ৮ সহস্রাধিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্টের রেজিস্ট্রেশন প্রদান বিগত ৫ বছর ধরে ঝুলে আছে। ফলে এসব ফার্মাসিস্টের চাকরি ও পেশাগত জীবন হুমকির সম্মুখীন। গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের মধ্যে যারা বিদেশে অধ্যয়ন অথবা চাকরির জন্য যেতে চান অথবা সুযোগ পেয়েছেন তারাও রেজিস্ট্রেশনের অভাবে বিদেশে যেতে পারছেন না। এমনকি অনেকে দেশের বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানিতে রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট ছাড়াই চাকরি নিয়ে ওষুধ তৈরি করছেন। ফলে মানুষের জীবন রক্ষার কাজে নিয়োজিত ওষুধ শিল্পও পড়ছে বিপাকে। অনেক ক্ষেত্রে তারা মানবিক কারণে রেজিস্ট্রেশনবিহীন ফার্মাসিস্টদের চাকরি দিচ্ছেন। গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ ফার্মাসিস্ট সোসাইটির (বিপিএস) দ্বিধাবিভক্তি, ক্ষমতার আধিপত্যসহ নানা কারণে বিপিএসের কর্তৃত্ব নির্ধারণ উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। আদালত বিপিএসের যথাযথ প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে ফার্মাসিস্টদের রেজিস্ট্রেশনের কর্তৃত্ব প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ফার্মেসি কাউন্সিল গঠনের নির্দেশ দেয়। দ্বিধাবিভক্ত বিপিএস থাকায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এখনও আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ফার্মেসি কাউন্সিল পুনর্গঠন করেনি। পরবর্তীকালে ফার্মেসি কাউন্সিল পরীক্ষা ছাড়াই ফার্মেসি গ্রাজুয়েটদের রেজিস্ট্রেশন দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে ফার্মেসি কাউন্সিলের পরীক্ষা ছাড়াই রেজিস্ট্রেশন প্রদানের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে পিআইএল বা পাবলিক ইন্টারেস্ট পিটিগেশন দায়ের করেন একজন আইনজীবী। ফলে উচ্চ আদালত পুনরায় পরীক্ষার মাধ্যমেই ফার্মাসিস্টদের রেজিস্ট্রেশন প্রদানের নির্দেশ দেয়। এই নির্দেশও কার্যকর হয়নি বলে জানা যায়।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ফার্মেসি কাউন্সিল পুনর্গঠিত না হওয়ার কারণেই গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্ট ও সি ক্যাটাগরির ওষুধের দোকান পরিচালনার ফার্মাসিস্টদের পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে না। এটা ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের বিষয় নয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব পদাধিকার বলে ফার্মেসি কাউন্সিলের সভাপতি। এছাড়া ১৪ সদস্যের ফার্মেসি কাউন্সিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ফার্মাসিস্ট সুভাষ সিংহ রায়।
এদিকে, সি ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্টদের সংগঠন বাংলাদেশ কেমিস্ট এন্ড ড্রাগিস্ট সমিতি তাদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৮ হাজার ফার্মাসিস্টের অবিলম্বে পরীক্ষা নেয়া এবং বর্ধিত ড্রাগ লাইসেন্স ফি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। অন্যথায় তারা আগামী ১২ ডিসেম্বর সারাদেশের সকল ওষুধের দোকানে অর্ধদিবস ধর্মঘট পালন করবে। এ ব্যাপারে কেমিস্ট এন্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সভাপতি মো. সাদেকুর রহমান জানান, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্টদের পরীক্ষা নেয়ার দায়িত্ব ফার্মেসি কাউন্সিলের। বাংলাদেশ ফার্মাসিস্ট সোসাইটির আধিপত্য ও কর্তৃত্বের দ্বন্দ্বে ফার্মেসি কাউন্সিল অকেজো হয়ে পড়ছে। মামলা হয়েছে উচ্চ আদালতে। এই অজুহাতে ফার্মাসিস্টদের পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে না বলে জানানো হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা কোন সংগঠনের দ্বন্দ্ব বা রেষারেষির কারণে ফার্মাসিস্টদের পরীক্ষা বন্ধ হবে তা চাই না। স্বাস্থ্য সচিব ফার্মেসি কাউন্সিলের সভাপাতি। কাউন্সিল পরীক্ষা নিতে পারে। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে ফার্মেসি কাউন্সিলের সহ-সভাপতি সুভাষ সিংহ রায়ের সঙ্গেও কথা বলেছি। তিনি মামলা-মোকদ্দমার কারণে পরীক্ষা হচ্ছে না বলে জানান। সাদেকুর রহমান জানান, ফার্মেসি কাউন্সিলের সব কাজ অব্যাহত আছে। লক্ষ লক্ষ টাকার চেকও সই হচ্ছে। এখানে আদালতের প্রসঙ্গ আনা হচ্ছে না। শুধু ফার্মাসিস্টদের পরীক্ষা নেয়া বা রেজিস্ট্রেশন দেয়ার দাবি করলেই উচ্চ আদালতের কথা বলা যৌক্তিক হতে পারে না। তিনি অবিলম্বে ফার্মাসিস্টদের পরীক্ষা নেয়ার ও বর্ধিত ড্রাগ লাইসেন্স ফি প্রত্যাহারের দাবি জানান।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের ডিন বিপিএসের একাংশের সভাপতি এবিএম ফারুক বলেন, আদালতের একটি মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকায় তিনি বিপিএসের সভাপতি হিসাবে এখন পরিচয় দেন না। তবে তিনি বলেন, দেশের প্রায় ৫ হাজার গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্টের রেজিস্ট্রেশন বন্ধ রয়েছে। তিনি বলেন, চিকিত্সক ও নার্সদের এ ধরনের কোন রেজিস্ট্রেশন নিতে পরীক্ষা দিতে হয় না। ফার্মাসিস্টদেরও পরীক্ষা ছাড়াই রেজিস্ট্রেশন দেয়া উচিত। তিনি বলেন, অতীতে ফার্মাসিস্টদের পরীক্ষার নামে লক্ষ লক্ষ টাকার অনিয়ম হয়েছে। এ ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই রেজিস্ট্রেশন দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ফার্মাসিস্ট সোসাইটির অপর অংশের সভাপতি নাসের শাহরিয়ার জাহেদীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, দেশের প্রায় ৫ হাজার ফার্মেসি গ্রাজুয়েটের রেজিস্ট্রেশন না দেয়ার কারণে তাদের চাকরি জীবন বিপন্ন হতে চলেছে। এটা কারো কাম্য নয়। অবিলম্বে তিনি ফার্মেসি কাউন্সিল পুনর্গঠন করে গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্ট ও সি ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্টদের (কেমিস্ট এন্ড ড্রাগিস্ট) পরীক্ষা নেয়ার দাবি জানান। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিন বছর আগেই বিপিএসের ৩ সদস্যদের নাম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়েছে এবং ফার্মেসি কাউন্সিল পুনর্গঠনের ব্যাপারে স্বাস্থ্য সচিব ও মন্ত্রীর সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাত্ করে ফার্মেসি কাউন্সিল পুনর্গঠনের অনুরোধ করা হয়েছে। তিনি বলেন, যাদের বাধা ও দায়িত্বহীনতার কারণে যথাযথভাবে ফার্মেসি কাউন্সিল গঠন করা হচ্ছে না, তারাই দেশের হাজার হাজার গ্রাজুয়েট ও অন্যান্য ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্টদের পেশাগত জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার জন্য দায়ী থাকবেন। তবে অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ফার্মেসি কাউন্সিল গঠন-পুনর্গঠন কোন দ্বন্দ্বের বিষয় নয়। আইনানুযায়ী সব কিছু চললে এ ধরনের সমস্যা হতো না।
এ ব্যাপারে ফার্মেসি কাউন্সিলের সহ- সভাপতি সুভাষ সিংহ রায় ইত্তেফাককে জানান, আড়াই বছর ধরে ফার্মেসি কাউন্সিলের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন অথচ ফার্মাসিস্টদের রেজিস্ট্রেশন দিতে পারছেন না। এটা বেদনাদায়ক। তিনি বলেন, ফার্মাসিস্টদের দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বে কারণে ফার্মেসি কাউন্সিল পুনর্গঠন করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, পরীক্ষা নিয়ে হোক আর পরীক্ষা ছাড়াই হোক ফার্মাসিস্টদের রেজিস্ট্রেশন দেয়া জরুরি। কাউন্সিলের সহ-সভাপতি হিসেবে রেজিস্ট্রেশন প্রদান সংক্রান্ত এক্রিডিটেশন কমিটির সভাপতি তিনি। আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে এই কমিটি দায়িত্ব পালন করতে পারছে না বলে তিনি জানান। ফলে ফার্মাসিস্টদের পরীক্ষা নেয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, বিপিএসের দুই গ্রুপের এ ধরনের ইগো বছরের পর বছর ধরে চলতে পারে না এবং এর একটা সুরাহা হওয়া উচিত।
এদিকে, রেজিস্ট্রেশন বঞ্চিত ফার্মাসিস্টদের একাধিক সূত্র ইত্তেফাককে জানায়, কি কারণে গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের রেজিস্ট্রেশন দেয়া হচ্ছে না তা তারা জানতে চান। ফার্মাসিস্টদের দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বের কারণে ফার্মাসিস্টদের চাকরি জীবন অন্ধকারাচ্ছন্ন হতে পারে না। এমনকি অনেক পাস করা ফার্মাসিস্ট রেজিস্ট্রেশন না পাওয়ায় বিদেশে পড়তে ও চাকরি করতে যেতে পারছেন না। তারা গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের অবিলম্বে রেজিস্ট্রেশন প্রদানের জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এসব নবীন ফার্মাসিস্টের স্পষ্ট বক্তব্য:বিষয়টি নিয়ে আর কোন রাজনীতি হোক, তারা তা দেখতে চান না। তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিষ্ক্রিয়তার ব্যাপারেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এব্যাপারে ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধ নীতি প্রণেতাদের অন্যতম গণস্বাস্থ্য ট্রাস্টের প্রধান নির্বাহী ডা. জাফর উল্লাহ চৌধুরী বলেন, সরকারের উচিত নিরপেক্ষ পেশাজীবীদের সমন্বয়ে ফার্মেসি কাউন্সিল গঠন করা। এক্ষেত্রে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের চেয়ারম্যানগণ অথবা তাদের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কাউন্সিল গঠিত হবে এবং তাদের মধ্যে একজন সভাপতি হবেন। তাহলে দলাদলি, উপদল, কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার বন্ধ হবে। কারণ সর্বক্ষেত্রে ন্যায়নীতি আইন ভঙ্গের প্রতিযোগিতা চলছে। এমনকি উচ্চ আদালতের নির্দেশও মানা হচ্ছে না। এটা চলতে দেয়া যায় না।
এ ব্যাপারে ফার্মেসি কাউন্সিলের সভাপতি স্বাস্থ্য সচিব মুহাম্মদ হুমায়ুন কবির ইত্তেফাককে বলেন, ফার্মাসিস্টদের বিবদমান দুই গ্রুপের মামলা-মোকদ্দমার কারণে গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের পরীক্ষা নেয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, তিনি উচ্চ আদালতের সর্বশেষ রায়ের কপি এখনও পাননি। রায়ের কপি পেলে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ফার্মেসি কাউন্সিল পুনর্গঠন করা হবে বলে তিনি জানান। তখন ফার্মাসিস্টদের পরীক্ষা নেয়া ও রেজিস্ট্রেশন প্রদানে আর কোন বাধা থাকবে না।