নয়মাসে গ্রিন ব্যাংকিংয়ে লক্ষ্যমাত্রার ১৬ শতাংশ অর্জন

গ্রিন ব্যাংকিং বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে সচেতন করতে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সচেতনতামূলক কাজ শেষ হয়েছে। ব্যাংকগুলো এখন তা বাস্তবায়ন করছে। তবে এ বিষয়ে ব্যাংকগুলোর পরিকল্পনা অনেক বড় হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গ্রিন ব্যাংকিং ইন বাংলাদেশ শীষর্ক এক প্রকাশনায় এ তথ্য দেখা গেছে। ওই প্রকাশনীতে দেখা গেছে, চলতি বছরের জন্য পরিপূর্ণ গ্রিন ব্যাংকিংয়ের ৩৫টি ব্যাংক ২ হাজার ৩ কোটি টাকা অর্থায়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বছরের নয় মাস (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) পার হয়ে গেলেও এ খাতে মাত্র ৩২৭ কোটি টাকা অর্থায়ন করেছে ব্যাংকগুলো। অর্থাত্ এ সময়ে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১৬ শতাংশ গ্রিন অর্থায়ন হয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো লক্ষ্যমাত্রার শূন্য দশমিক ৪১ শতাংশ, বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ২৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ, বিদেশি ব্যাংকগুলো ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং রাষ্ট্রীয় বিশেষায়িত উন্নয়ন ব্যাংকগুলো ২৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ গ্রিন অর্থায়ন করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জানা গেছে, গ্রিন ব্যাংকিংয়ের আওতায় তিন ধরনের অর্থায়ন করা হয়। যা হলো- গ্রিন ফাইন্যান্স, ক্লাইমেট রিস্ক ফান্ড এবং মার্কেটিং অ্যান্ড ক্যাপাসিটি বিল্ডিং ফর গ্রিন ব্যাংকিং। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে একটি অংশ গ্রিন ব্যাংকিংয়ের জন্য বরাদ্দ রাখতে হয়। তা অনুসরণ করে ব্যাংকগুলো চলতি বছরের জন্য বাজেট নির্ধারণ করেছিল। প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের জন্য গ্রিন ব্যাংকিংয়ে দুই হাজার ৩০১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা বার্ষিক বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরমধ্যে গ্রিন অর্থায়নে দুই হাজার তিন কোটি টাকা, জলবায়ু ঝুঁকি তহবিলে ২১৪ কোটি টাকা এবং গ্রিন ব্যাংকিংয়ের বাজারজাতকরণ ও সক্ষমতা গঠনে ৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। চলতি বছরে পরিপূর্ণ গ্রিন ব্যাংকিংয়ের ৩৫টি ব্যাংক গড়ে ৬৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। ওই প্রকাশনীতে দেখা গেছে, গ্রিন ব্যাংকিং এ অর্থায়নের বেশি লক্ষ্যমাত্রার নির্ধারণ করেছিল রূপালী ব্যাংক। এর পরে পর্যায়ক্রমে রয়েছে আইএফআইসি, এক্সিম, এসআইবিএল, বেসিক, সোনালী, ব্যাংক এশিয়া, জনতা, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক। এ শীর্ষ ১০ ব্যাংকের মধ্যে রূপালী ব্যাংক ৪০০ কোটি টাকা এবং ইসলামী শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ১০০ কোটি টাকা খরচের লক্ষ্যমাত্রা ধরেছিল। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শীর্ষ ১০ ব্যাংক গ্রিন অর্থায়ন করেছে। এ তালিকায় এক্সিম ব্যাংক সর্বোচ্চ ২৭ কোটি ২২ লাখ, ব্যাংক এশিয়া ২২ কোটি ৭৩ লাখ, ইসলামী ব্যাংক ১৭ কোটি ৩ লাখ, ওয়ান ব্যাংক ৯ কোটি ৯৮ লাখ, প্রাইম ব্যাংক ৮ কোটি, বাংলাদেশ উন্নয়ন ব্যাংক ৭ কোটি ৮৮ লাখ, মিউচ্যুায়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ৬ কোটি, বেসিক ব্যাংক ৪ কোটি ৪৫ লাখ, ন্যাশনাল ব্যাংক ৪ কোটি ২ লাখ এবং ট্রাস্ট ব্যাংক ৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা গ্রিন অর্থায়ন করেছে। আর তৃতীয় প্রান্তিকে জলবায়ু ঝুঁকি তহবিলে ৮ ব্যাংক এগিয়ে রয়েছে। ব্যাংকগুলো হলো-রূপালী, ইউসিবিএল, পূবালী, এইচএসবিসি, ইসলামী, এসআইবিএল, আইসিবি ইসলামী এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক। পরিবেশগত ঝুঁকি হারের বিবেচনায় এবি ব্যাংক ৬৮ কোটি ৯ লাখ, আইএফআইসি ব্যাংক ৩৯ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ৩৫ কোটি ৬০ লাখ, ব্যাংক এশিয়া ২৭ কোটি, এসআইবিএল ১১ কোটি ১০ লাখ, যমুনা ব্যাংক ১১ কোটি ১০ লাখ, বেসিক ব্যাংক ১০ কোটি ৫০ লাখ, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ১০ কোটি ৪০ লাখ, এক্সিম ব্যাংক ৯ কোটি ৭০ লাখ এবং ঢাকা ব্যাংক সাত কোটি ১০ লাখ টাকা বিতরণ করেছে। গ্রিন ব্যাংকিং কার্যক্রমের মধ্যে কাগজের ব্যবহার কমানোর লক্ষ্যে পুরোপুরি অনলাইন কার্যক্রম শুরু, নিজস্ব শাখায় সোলার প্যানেল প্লান্ট, পরিবেশবান্ধব খাতে বিনিয়োগ ও ভবিষ্যত্ বিনিয়োগ পরিকল্পনায় পরিবেশকে অগ্রাধিকার, পরিবেশ ঝুঁকির রেটিং খাত দেখে বিনিয়োগ, মোবাইল ও এসএমএস ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের ব্যাংকগুলোর আট হাজার ১৯৯ টি শাখার মধ্যে অনলাইন সেবার আওতায় তিন হাজার ২২৬টি শাখা এসেছে। সে হিসেবে মোট শাখার ৩৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ গ্রাহকদের অনলাইন সেবা দিচ্ছে। তবে অনলাইন সেবায় অনেক পিছিয়ে আছে সরকার মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ৩ হাজার ৪৬৯টি শাখার মধ্যে মাত্র ১৬৮টি শাখায় অনলাইন সেবা রয়েছে, যা মোট শাখার চার দশমিক ৮৪ শতাংশ। আর বিশেষায়িত উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর এক হাজার ৪৩৩টি শাখার মধ্যে ৬০টি শাখা বা ৪ দশমিক ১৯ শতাংশ অনলাইন সেবা দিচ্ছে। আর বেসরকারি খাতের তিন হাজার ২২৪টি শাখার মধ্যে দুই হাজার ৯২৫টি শাখায় অনলাইন সেবা রয়েছে, যা মোট শাখার ৯০ দশমিক ৭৩ শতাংশ। বিদেশি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মোট ৭৩টি শাখাতেই অনলাইন সেবা রয়েছে। জানা গেছে, গ্রিন ব্যাংকিংয়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে ব্যাংকগুলো এটিএম বুথের মাধ্যমে ২৪ ঘন্টা গ্রাহক সেবা প্রদান করে আসছে। বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংকের চার হাজার ৩৩২টি এটিএম বুথ রয়েছে, এরমধ্যে শুধু ডাচ-বাংলা ব্যাংকের দুই হাজার ১৭০টি এটিএম বুথ রয়েছে। আর সোলার ইনার্জির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ১৫টি শাখা ও আটটি এসএমই বা এটিএম বুথ পরিচালিত হয়। বেসরকারি খাতের ১৭০টি শাখা ও ১৩৯টি বুথ, বিশেষায়িত উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর ২৪টি শাখা এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোর ৩টি শাখা এবং ৩টি বুথে সোলার এনার্জিতে চলছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩৭টি ব্যাংক পুরোপুরি অনলাইন কার্যক্রম শুরু করেছে, ৪৬টি ব্যাংক গ্রিন ব্যাংকিং ইউনিট গঠন করেছে, ৪১টি ব্যাংক গ্রিন অফিস গাইড প্রকাশ করেছে। পরিবেশবান্ধব তথা গ্রিন ব্যাংকিং কার্যক্রম বাস্তবায়নে বেশিরভাগ ব্যাংকের অগ্রগতি হয়েছে। পরিবেশবান্ধব খাতে ব্যাংকের ঋণ বিতরণও বেশ ভালো অবস্থায় রয়েছে। তবে গ্রিন ব্যাংকিংয়ে কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও বলা হয়েছে। তা হলো- গ্রিন অর্থনীতিতে দেশের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, গ্রিন ব্যাংকিংয়ে ব্যাংকের পরিচালক, ব্যবস্থাপনা সকল পর্যায় কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গ্রাহকের মধ্যে সচেতনতা গড়ে উঠছে না, খাতভিত্তিক জরুরি অর্থায়ন নীতি ও প্রক্রিয়া হাতে নেয়া হয়নি, শিল্পকারখানা ক্যাটাগরি অনুযায়ী সঠিক স্থানে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। বিশেষ করে গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, ট্যানারি শিল্পের স্থানান্তর করা প্রয়োজন।