আবার নারিন-রহস্য!
প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:২৬
শেন ওয়ার্ন থেকে শুরু করে আজকের মন্টি পানেসার; অ-উপমহাদেশীয় স্পিনার মাত্রেই উপমহাদেশকে তীর্থস্থান বলে মনে করেন। স্পিনারদের সেরাটা বের করে আসার সেরা জায়গাই হল এই উপমহাদেশের টার্নিং, স্লো ও লো বাউন্সের উইকেট। কিন্তু সেখানে এসেই কিনা নিজেকে খুঁজে ফিরছিলেন সুনিল নারিন। অবশেষে হারিয়ে যাওয়া পারফরম্যান্সটা যেন ফিরে পেলেন ক্যারিবীয় এই তরুণ স্পিনার। আর তাতেই শেষ বাংলাদেশের ব্যাটিং।
নারিন কাল ৩৭ রানে নিলেন ৪ উইকেট। চার উইকেট বললেও নারিনের কালকের পারফরম্যান্সটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। প্রথম স্পেল বল করতে এসেছিলেন ইনিংসের নবম ওভারে। নিজের তৃতীয় ওভারে তুলে নেন তামিম ইকবাল ও নাঈম ইসলামের দুই উইকেট। এর পরের ওভারে পরপর দুই বলে এনামুল হক বিজয় লাইফ পান। শেষ পর্যন্ত তৃতীয় বলে একেবারে নিশ্চিত এলবিডব্লিউ করে ফেরান বাংলাদেশের সিরিজের সফলতম ব্যাটসম্যান বিজয়কে। এই শিকারের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের টপ অর্ডারের তিন ব্যাটসম্যানকেই ফিরিয়ে ইনিংসটা ধসিয়ে দেয়ায় নেতৃত্ব দেন নারিন।
নারিনের কাছ থেকে এই বাংলাদেশ সফরে এমন পারফরম্যান্স নিশ্চয়ই শুরু থেকেই আশা করছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এই উপমহাদেশেরই, বাংলাদেশের বাড়ির কাছের কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে নিজেকে প্রথম মেলে ধরেছিলেন সুনিল নারিন। কলকাতার শিরোপা জয়ে অন্যতম বড় ভূমিকাও রেখেছিলেন।
নারিনের কলকাতায় আসাটাও বেশ মজার একটা গল্প। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ত্রিনিদাদ ও টোব্যাগোর নির্বাচকদের নজর কেড়েছিলেন। সে সময় ছোট-খাটো কিছু সুযোগ পেয়েছিলেন। পরে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ঠাই হলেও খুব ভালো কিছু করতে পারেননি। অবশেষে ২০০৯ সালের প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগ টি-টোয়েন্টিতে টিঅ্যান্ডটির হয়ে খেলতে নামেন। সঙ্গে সঙ্গে তার অ্যাকশন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। মনে করা হয়েছিল, সম্ভাবনাময় এক স্পিনার অংকুরেই শেষ হয়ে গেলেন।
কিন্তু নারিন হাল ছাড়েননি। বায়োমেকানিকস বিশেষজ্ঞর সঙ্গে প্রায় এক বছর ধরে বোলিং স্টাইল বদল নিয়ে কাজ করে গেছেন। ফল যে পেয়েছেন, সেটা বোঝা গেল ২০১১ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগে এসে। টিঅ্যান্ডটির হয়ে খেলতে নেমে বাজিমাত করে দিলেন। ১০.৫০ গড়ে এবং ওভার প্রতি মাত্র ৪.৩৭ রান দিয়ে টুর্নামেন্টে ১০ উইকেট নিয়ে চমকে দিলেন সবাইকে। তখনই আসলে আলোচনাটা শুরু হল-বিশ্ব পেয়ে গেছে নতুন রহস্য স্পিনার!
এই তকমা গায়ে লাগিয়েই আরেকটা বাজিমাত করলেন পঞ্চম আইপিএলের নিলামে। ৭ লাখ মার্কিন ডলারে তাকে কিনে নিল কলকাতা। এই বিপুল ব্যয়টা অনেকেই বাড়াবাড়ি বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু নারিনকে নেটে দেখে কলকাতার ব্যাটসম্যানরা অন্তত প্রকাশ্যেই বললেন, ব্যয়টা বৃথা যায়নি। আর টুর্নামেন্ট শুরু হতে সারা পৃথিবী দেখল, কলকাতা আসলে ‘কম দামে’ কিনে নিয়েছে এক রত্ন।
এই বাংলাদেশ সফরে আসার আগে ৩টি টেস্ট খেলেছেন। তাতে একবার ইনিংসে ৫ উইকেটসহ মোট ১২ উইকেট। আর এখানে আসার আগে ১৫ ওয়ানডেতে তার শিকার ছিল ২৯ উইকেট। দুরন্ত এই পারফরম্যান্স বাংলাদেশ সফরের শুরুতেও মোটামুটি ধরে রেখেছিলেন। প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে পেয়েছিলেন ৩ উইকেট। কিন্তু এরপর থেকেই নারিন যেন হারিয়ে গেলেন। বলা হচ্ছিল, বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা অন্তত নারিনের রহস্য ভেদ করে ফেলেছেন।
পরের ৩টি টেস্ট ইনিংস ও ২টি ওয়ানডেতে উইকেটশূন্য ছিলেন নারিন। তাহলে কী আরও অনেক প্রতিশ্রুতির মতো জ্বলে ওঠার আগে শেষ হলে গেলেন নারিন?
না, কাল অন্তত তিনি পারফরম্যান্স দিয়েই বলে দিলেন; তিনি থাকতে এসেছেন। বল টার্ন করালেন, ফ্লাইটের ফাঁদে ফেললেন ব্যাটসম্যানকে, মরা উইকেটে বাড়তি বাউন্স আদায় করে নাচালেন ব্যাটসম্যানদের। সবমিলিয়ে দিনটা যেন নারিনের।
আরেকটু বড় করে বললে বলা যায়, দিনটা আসলে ক্যারিবীয় স্পিনারদের ছিল। বাংলাদেশের ৭টি উইকেট তুলে নিলেন ক্যারিবীয় স্পিনাররা; নারিন ৪টি, পেরমল ২টি এবং গেইল ১টি। ব্যাটিং ফর্মে না থাকার দুঃখ কি ঘুচছে গেইলের।
গেইলের যাই হোক, নারিন যে স্বস্তিতে আছেন; তাতে সন্দেহ নেই।