আজ যেসব এলাকা হানাদার মুক্ত হয়
প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৪০
আজ ৬ ডিসেম্বর। দেশের বিভিন্ন স্থান হানাদারমুক্ত হয়। এ উপলক্ষে এ সব স্থানে বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে। খবর ইত্তেফাক প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের।
লালমনিরহাট
১৯৭১ সালের এই দিনে লালমনিরহাট জেলা হানাদার মুক্ত হয়েছিল। বীরমুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমনের মুখে হানাদার পাকিস্তানী সৈন্য বিপর্যস্ত ও ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। হানাদার বাহিনীর স্বাধীনতা বিরোধী, রাজাকার, আলবদর ও অবাঙ্গালীরা লালমনিরহাট ছেড়ে রংপুর ও সৈয়দপুরে পালিয়ে যায়। তিস্তা ব্রিজে হানাদার বাহিনীর সাথে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এতে হানাদার বাহিনীর কমান্ডার মেজর এজাজসহ কয়েকজন সৈন্য নিহত হয়। হানাদারেরা পরাজয়ের মুর্হুতে তিস্তা সেতুর দক্ষিন পার্শ্বের দুটি স্প্যান ধ্বংস করে। প্রতিবারের ন্যায় এবারেও দিবসটি পালনে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। সকালে বর্নাঢ্য শোভাযাত্রা, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ডিসপ্লে প্রদর্শন, স্বেচ্ছায় রক্তদান, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি চারণ ও আলোচনা সভা, আলোক সজ্জা । ৬ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত শহরের গুরুত্বপূর্ন স্থানে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তোরণ নির্মান সহ অন্যান্য কর্মসূচি পালন করবে।
হবিগঞ্জ
১৯৭১ সালের এ দিনে হবিগঞ্জ জেলা হানাদার মুক্ত হয়েছিল। বিজয়ের ৪১ বছর অতিবাহিত হলেও উপযুক্ত সম্মনটুকুও পাননি বীর মুক্তিযোদ্ধারা। ভূমিহীনদের অনেকেরই এখনও মাথাগোঁজার ঠাঁই হয়নি। ৭১’-এর এদিনে বাংলার বীর যোদ্ধারা মিছিলে মিছিলে মুখরিত করে তুলেন হবিগঞ্জ শহরসহ সর্বত্র। তখন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক মিয়া মোহাম্মদ শাহজাহান সদর থানা চত্ত্বরে পতাকা উত্তোলন করে এ এলাকাকে হানাদার মুক্ত ঘোষণা করেন।
সুনামগঞ্জ
একাত্তরের এই দিনে সুনামগঞ্জ মুুক্ত হয়েছিল। এ দিবস উপলক্ষে সুনামগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্টানের উদ্যোগ নিয়েছে। সুনামগঞ্জকে হানাদারমুক্ত করতে যুদ্ধকালীন কমান্ডার মেজর মোতালিব, ক্যাপ্টেন যাদব ও ক্যাপ্টেন রঘুনাথ ভাটনগর একটি বিশেষ পরিকল্পনা নেন। তাদের যৌথ পরিকল্পনা অনুয়ায়ি দখলদার বাহিনীর উপর আঘাত হানতে কয়েকটি কোম্পানিকে কয়েকটি গ্রুপে ভাগ করে আক্রমণের দায়িত্ব দেয়া হয়। সারারাত কাদা পানিতে ভিজে, নৌকায় ভাসমান অবস্থায় মেজর মোতালিব, ক্যাপ্টেন ভাটনগর প¬াটুনসহ ভোর রাতে সুনামগঞ্জ শহরে প্রবেশ করেন। এদিকে মুক্তিযোদ্ধারা প্রবেশ করার আগেই খবর পেয়ে পাক হানাদাররা শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়। মুক্তিবাহিনী সুনামগঞ্জে প্রবশে করেছে এ খবর জানতে সাধারণ মানুষের কণ্ঠ জয়বাংলা ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে।
কলারোয়া (সাতক্ষীরা)
একাত্তরের আগুনঝরা এই দিনে কলারোয়া এলাকা পাক হানাদার মুক্ত হয়। কলারোয়ার আকাশে ওড়ে স্বাধীন দেশের পতাকা। মুক্তিকামী মানুষের উল্ল¬াসে মুখরিত হয় পাকবাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞে ক্ষত-বিক্ষত কলারোয়া। ঐতিহাসিক ও গৌরবোজ্জ্বল এদিনটি এবারও পালিত হচ্ছে যথাযোগ্য মর্যাদায়। সূত্রমতে, মহান মুক্তিযুদ্ধে কলারোয়ার ৩৪৩ জন বীরসন্তান অংশ নেন। এরমধ্যে শহীদ হন ২৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। কলারোয়া অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে প্রবাসী সংগ্রাম পরিষদ। কলারোয়া এলাকায় পাক-বাহিনীর আক্রমণে সর্বপ্রথমে শহীদ হন মাহমুদপুর গ্রামের আফছার সরদার। দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালন করার জন্য উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে: মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়ে জাতীয় ও সংগঠনের পতাকা উত্তোলন, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ, গণকবরে পুষ্পমাল্য অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ, সকাল ৮ টায় একাত্তরের বেশে মুক্তিযোদ্ধা-জনতার বিজয় র্যালি, উপজেলা পরিষদ চত্ত্বরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন, কেন্দ ীয় শহীদ মিনার চত্ত্বরে আলোচনা সভা। সভাপতিত্ব করবেন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার গোলাম মোস্তফা।
দাগনভূঞা (ফেনী)
১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী চর্তুদিক থেকে সাঁড়াসী আক্রমন চালিয়ে ফেনী দখল করে। সর্বস্তরের মানুষ স্বল্প সময়ের ট্রেনিং নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। এ’ কয়েক মাসে বিভিন্ন যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাজার হাজার সৈন্য ও অফিসার বিলোনীয়া সেক্টরে মারা যায়। ফেনী অঞ্চলে ৮ মাসের যুদ্ধ শেষে ৫ ডিসেম্বর পাকিস্তানী হানাদারেরা রাতের অন্ধকারে নোয়াখালী এবং কুমিল্লা দিয়ে পালিয়ে যায়। ৬ ডিসেম্বর প্রত্যুসে ১০ম ইষ্ট বেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসার জাফর ইমামের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী ফেনী দখল করে নেয়। মুক্তিবাহিনীর আগমনে অবরুদ্ধ ফেনীবাসী স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা হাতে নিয়ে উল্লোসে রাস্তায় নেমে আসে। ফেনী জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ দিবসটি স্মরণে র্যালি ও আলোচনা সভা সহ বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করেছে।
ঝিকরগাছা (যশোর)
মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর প্রতিরোধের মুখে ১৯৭১ সালে এই দিনে ঝিকরগাছা মুক্ত হয়। মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর যৌথ প্রচেষ্টায় এ দিন পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে প্রথম ঝিকরগাছা মাটিতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো হয়। ৫ ডিসেম্বর নিশ্চিত পরাজয় ভেবে পাক হানাদার বাহিনী পিছু হাটতে শুরু করে। তারা ৫ ডিসেম্বর রাতে কপোতাক্ষ নদের উপর প্রতিষ্ঠিত যশোর-বেনাপোল রেল ব্রিজ ও সড়ক ব্রিজ দুটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে রাতেই পরাজিত বাহিনী পালায়। বীর শ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ও আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম মোত্বাছিম বিল্লাহার নেতৃত্বে একদল মুক্তিবাহিনী ও মুজিব বাহিনী ঝিকরগাছাকে আনুষ্ঠানিক-ভাবে হানাদার মুক্ত ঘোষণা করেন।
ফরিদপুর (পাবনা)
দেশের অন্যান্য এলাকার মত পাবনার ফরিদপুরে পাকবাহিনীও তাদের দোসররা তৈরী করেছিল এক রক্তাক্ত অধ্যায়। অবশেষে ৬ ডিসেম্বর মুক্ত হয় ফরিদপুর থানা। এদিন ভোরে মুক্তিবাহিনী চার দিক থেকে ফরিদপুর থানা ঘিরে ফেলে। থানায় তখন অবস্থান করছিল প্রায় দেড়’শ পাকবাহিনী। মুক্তিবাহিনীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১’শ । প্রায় ৩ ঘণ্টা উভয় পক্ষে গোলাগুলি হয়। এ যুদ্ধে ১৭ জন পাকবাহিনী নিহত হয়। অপরদিকে ৩ জন মুক্তিযোদ্ধাও শহিদ হন। পরে মুক্তিবাহিনী ফরিদপুর থানায় গিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দেয়।
কুলাউড়া (মৌলভীবাজার)
একাত্তরের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া এই দিনে শত্রুমুক্ত হয়। এই সংবাদে ঐ দিন শহর ও শহরতলিতে ছাত্র জনতার শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠে পুরো শহর। এরপর থেকে ঐ দিনটিকে কুলাউড়াবাসী শত্রুমুক্ত দিবস হিসাবে পালন করে আসছে। একাত্তরের ৭ মে পাকিস্তানী ক্যাপ্টেন দাউদ ও মেজর ওয়াহিদ মোগলের নেতৃত্বে হানাদার বাহিনীর দুটি দল চুপিসারে কুলাউড়ায় প্রবেশ করে। এই সময় শহরের অদুরে কাপুয়া সেতুর কাছে তাদের হাতে প্রথম শহীদ হন জয়চন্ডী ইউনিয়নের মোজাহিদ কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা আছকির আলী ও হাবিব উদ্দিন। ঐদিন সন্ধ্যায় হানাদার বাহিনীর দোসররা বিছরাকান্দি গ্রামের ছলিম উল্ল্যাহ (৪০) এবং সোনাপুর গ্রামের আর্শদ উল্ল্যাহ (৪২) কে হত্যা করে। ৬ ডিসেম্বর ভোরে কুলাউড়ায় মিত্র বাহিনীর দুটি জঙ্গি বিমান আকাশ থেকে কয়েক দফা পাক সেনাদের ঘাটিতে গোলা বর্ষন করে তাদেরকে ছত্র ভঙ্গ করে দেয়।