বহু পরিশ্রমে অর্জিত পোশাক শিল্পের সুনাম যেন নষ্ট না হয় :প্রধানমন্ত্রী
প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৪৫
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা দেয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, সরকারি-বেসরকারি প্রচেষ্টার ফলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প আজ বিশ্বজুড়ে সুনাম কুড়িয়েছে। বহুদিনের পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত সুনাম সামান্য ভুল বা অবহেলার কারণে যাতে নষ্ট না হয়, সে দায়িত্ব আমাদের সকলের। এ ব্যাপারে সামান্যতম ছাড় দেয়ার কোন সুযোগ নেই। সম্প্রতি আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে গার্মেন্টস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে মর্মান্তিক প্রাণহানির মত ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় সে ব্যাপারে শ্রমিক, মালিক ও কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে সজাগ ও সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।
গতকাল বুধবার সকালে হোটেল সোনারগাঁওয়ে দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্মেলন উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বিদেশে বাংলাদেশের ব্যবসা সম্ভাবনাকে আরো প্রসারিত করতে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তিকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তিকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার মতো অনেক সম্পদই আমাদের আছে। তবে ব্যবসা-বাণিজ্য খাতের উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং আমার মতে সবচে কার্যকর উদ্যোগ। ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ৯১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি দেশের সার্বিক অগ্রগতির জন্য ইতিবাচক ভাবমূর্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য এটি নির্ভর করে পারস্পরিক সম্পর্ক, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ডের ওপর। চীনসহ বিশ্বের অনেক দেশে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য নতুন এক সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার জন্য আগ্রহী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বহুপাক্ষিক সংযোগ রক্ষা করা গেলে এ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরো গতিশীলতা আসবে। এজন্য বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে।
বক্তব্যের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ চার জাতীয় নেতা, মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ এবং নির্যাতিত দুই লাখ মা-বোনকে স্মরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। আজকের যে পশ্চাত্পদতা তার অন্যতম কারণ দেশে দীর্ঘদিন গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার অনুপস্থিতি এবং অতীতের সরকারগুলোর অদূরদর্শিতা বা ভুল পদক্ষেপ। এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠে দেশকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটা সময় ছিল, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আমরা এই অপবাদ অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছি। ঐক্যবদ্ধভাবে কীভাবে দ্রুততম সময়ে দুর্যোগ মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়াতে হয়, বাংলাদেশের জনগণ বিশ্বকে তা দেখাতে সক্ষম হয়েছে। দেশের সৃজনশীল ব্যবসায়ী উদ্যোক্তাদের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের রয়েছে ১৬ কোটি জনশক্তি, যাদের প্রায় ৬০ শতাংশের বয়স ৪০ বছরের নিচে। এরা বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ অগ্রগতির শক্তভিত্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও গণতন্ত্রকামী মানুষকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করতে ব্র্যান্ডিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের হাজার বছরের ঐতিহ্যমণ্ডিত সংস্কৃতি এবং সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে হবে। তিনি বলেন, যে জাতি রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, সে জাতি পিছিয়ে থাকতে পারে না। দেশের সম্ভাবনাগুলোকে সঠিকভাবে নিরূপণ এবং উপস্থাপনের জন্য গবেষণা কার্যক্রমের উপর আরো বেশি জোর দেয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার লক্ষ্য অর্জনে বেসরকারি খাতের ভূমিকার ওপরও গুরুত্বারোপ করে বলেন, আমি মনে করি, শিল্পায়ন এবং ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় আরো নতুন ৬০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তা অর্জনে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প স্থাপন করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ। তিনি বলেন, তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকার পাশাপাশি এ দেশের ফার্মাসিউটিক্যালসও আন্তর্জাতিক মান অর্জন করেছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে পৃথিবীর প্রায় ৯২টি দেশে বাংলাদেশি ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। এ দেশের প্রায় আট মিলিয়ন জনশক্তি বিভিন্ন দেশে কর্মরত রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে বিশ্ব ব্যাংকের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ২০তম। এক্ষেত্রে ভারত, চীন ও ভিয়েতনামের অবস্থান বাংলাদেশের পেছনে। যোগাযোগ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়নে সরকারের নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
‘ব্র্যান্ডিং ফর বিজনেস’ শীর্ষক এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করায় ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট, ক্যাটালিস্ট ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত উরস হেরেন, বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রী ফারুক খান, বাণিজ্য মন্ত্রী জিএম কাদের, শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রী দীপু মনি, ঢাকা চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ডিসিসিআই) সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
ডেনমার্কের মন্ত্রীর সাক্ষাত্
এদিকে বাসস জানায়, ডেনমার্কের সফররত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ মন্ত্রী পিয়ে ওসলে জের গতকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার কার্যালয়ে সাক্ষাত্ করেছেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ বলেন, তাদের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন, নদী খনন, জ্বালানি এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগসহ দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে এ্যাম্বাসেডর অ্যাট লার্জ এম জিয়াউদ্দিন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মোল্লা ওয়াহেদুজ্জামান ও প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ উপস্থিত ছিলেন।