শ্রীলঙ্কায় ইস্টার সানডেতে আত্মঘাতী হামলাকারীরা কিভাবে বেশ কয়েকটি হোটেল ও গির্জাতে হামলা চালিয়েছিল তার বিস্তারিত বিবরণ ধীরে ধীরে বের হয়ে আসছে। আটটি জায়গায় প্রায় একই সময়ে চালানো এসব হামলায় আড়াইশ’র বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরো পাঁচশো জনের মতো।
রবিবারের হামলার পর গত এক সপ্তাহে সিসিটিভির কয়েকটিও ভিডিও ফুটেজও প্রকাশিত হয়েছে। এতে তিন জঙ্গিকে দেখা গেছে একদম ‘ঠাণ্ডা মাথায়’ ধীরে ধীরে টার্গেটের দিকে এগিয়ে যেতে। এভাবে নিজেকে বিস্ফোরিত করে নিরপরাধ মানুষ মারতে যাচ্ছে, অথচ কারো মধ্যে কোনো ইতস্তত ভাব লক্ষ্য করা যায়নি।
একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, একজন জঙ্গি তার পিঠে একটি বড় র্যাকস্যাক নিয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে নেগোম্বো শহরের সেন্ট সেবাস্টিয়ান গির্জায় ঢুকছে। জনাকীর্ণ ওই গির্জার ভেতর তখন ইস্টার সানডের প্রার্থনা চলছিল। হেঁটে আসার সময় তাকে গির্জার বাইরে এক জায়গা কিছুক্ষণ থেমে একটি শিশুকে মাথায় হাত দিয়ে আদর করতেও দেখা গেল। তারপর গির্জার বারান্দা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে ওই ভবনের ভেতরে ঢুকে মোটামুটি সামনের একটি আসনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ভিড়ের মধ্যে ঢোকার কিছুক্ষণ পরই সেখানে বিস্ফোরণ ঘটে।
গির্জায় প্রার্থনা করতে গিয়েছিলেন দিলিপ ফারনান্দো। তিনি পরে এই ভিডিও ফুটেজ দেখে বলেন, জঙ্গিটি যে শিশুটিকে আদর করছে সে তারই নাতনি। তারা গির্জা থেকে বের হয়ে যাচ্ছিলেন, আর হামলাকারি তাদের পাশ কেটে ভেতরে ঢুকছিল। তার ছোট্ট নাতিকে দেখে সে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে রক্তবন্যা বয়ে যায়। আর মাত্র কয়েকটা মিনিট গির্জায় থাকলেই তারাও হয়তো হতাহতের তালিকায় ঢুকে যেতে পারতেন!
আরেকটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে আরো একজন হামলাকারী রাজধানী কলম্বোর সিনামন গ্র্যান্ড হোটেলে কিভাবে হামলা চালিয়েছিল। সেখানে দেখা যায়, হোটেলের যেখানে লোকজন সকালের নাস্তা খাচ্ছে সেরকম একটি জায়গায় একটি টেবিলের আশেপাশে সে ঘোরাঘুরি করছে। তার পিঠেও ছিল একটি র্যাকস্যাক। হোটেলের ম্যানেজার রোহান কর বলেন, সন্দেহভাজন ওই বোমারু তাদের হোটেলে চেক-ইন করেছিলো হামলার আগের দিন অর্থাত্ শনিবার সন্ধ্যায়। জঙ্গির সেই চেক-ইনের ভিডিওতেও দেখা গেল, পিঠে ও হাতে বিস্ফোরকবোঝাই র্যাকস্যাক নিয়ে রিসেপশনে এসে দাঁড়ালো। একজন কাস্টমার কেয়ার অফিসার তার কাছ থেকে হাসিমুখে একটা কাগজ নিলেন, এরপর কম্পিউটারে কিছু এন্ট্রি করলেন। পরে তাকে একটি রুম বরাদ্দ দিয়ে সেই রুমের চাবি তার হাতে তুলে দিয়ে রুম কোনদিকে তা দেখিয়ে দিলেন। এরপর সে ধীরপায়ে লিফটের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। এরপর লিফটে চড়ে নিজের রুমে গিয়ে ঢুকল।
হামলার দিন সকালে সে নিচে নেমে আসে। তার পিঠে তখনও সেই ব্যাগ ছিল। ধীরে ধীরে সে হোটেলের রেস্টুরেন্টে চলে যায়। সেখানে অনেক লোকজন সকালের নাস্তা করছিল। ছেলেটি চেয়ার-টেবিলের ফাঁক দিয়ে ভীড়ের একেবারে মাঝখানে চলে গেল। এরপর একটি টেবিলে বসলো এবং খাওয়া দাওয়া করলো। এরপর লোকজন বুফেতে আসার জন্য সে অপেক্ষা করছিল। যখন সে দেখলো রেস্তোরাঁটি লোকজনে ভরে গেছে তখনই সে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিল, যাতে নিহতের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়।
আরেকটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, এক জঙ্গিকে একটু দূর থেকে পথ চিনিয়ে দিচ্ছে লাল শার্ট পরা এক সহযোগী। একপর্যায়ে সে হাতের ইশারায় তাকে ভেতরে ঢুকতে বলল। এরপর দ্রুত মোবাইল ফোনে কাদের সঙ্গে যেন কথা বলল। বিস্ফোরণ ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে সে হনহন করে সেখান থেকে হেটে চলে গেল।
শ্রীলঙ্কার পুলিশ বলছে, এটা পরিস্কার হয়ে গেছে যে যারা হামলায় আত্মঘাতী হয়েছে এরাই সব নয়। বাইরে জীবিত অবস্থায় অনেক সহযোগি হামলা পরিচালনায় সহায়তা করেছে। এর আপনার কিংবা আমার আশেপাশে ভালো মানুষ সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই লোকগুলো ভবিষ্যতের জন্যও হুমকি। এটা বিশাল একটি সংঘবদ্ধ চক্র।